রবিবার, ১৯ মে, ২০১৯, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

প্রধানমন্ত্রীর অনুদান

আহমেদ শরীফকে নিয়ে বিতর্কের ঝড়

এন ডি আকাশ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০১৯, মঙ্গলবার ০৪:৪৬ পিএম

আহমেদ শরীফকে নিয়ে বিতর্কের ঝড়

ঢাকা:  প্রখ্যাত অভিনেতা আহমেদ শরীফকে ৩৫ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে। গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশিত হয়েছে, আহমদ শরীফ ও তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য এই অনুদান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কী অসুখের জন্য স্বামী-স্ত্রী এই অনুদান পেলেন সেটা জানা যায়নি। ১৮ এপ্রিল দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ে তার কাছ থেকে অনুদানের চেক গ্রহণ করেন আহমেদ শরীফ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে একটি ছবি। 

কিন্তু গণমাধ্যমে এ সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। বলা যায়, ফেসবুকে ভাইরাল নামটি এখন ‘আহমেদ শরীফ’। এই অভিনেতার অনুদান পাওয়ায় অনেকেই নানা প্রশ্ন সামনে তুলে আনছেন। সেখানে তার মজবুত অর্থনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি তার গোপন অসুখ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তিনি নিজের রোগ ও চিকিৎসার বিষয়ে কোথাও মুখ খোলেননি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেশকিছু কলামও প্রকাশ হয়েছে আহমেদ শরীফকে অনুদান দেয়া প্রসঙ্গে। সেই সব লেখায় একদিকে যেমন আহমেদ শরীফের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা ফুটে উঠেছে তেমনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার নেতিবাচক ধারণার কথাও উঠে এসেছে।
 
জানা গেছে, আহমেদ শরীফের বড় ভাই বিজিএমই’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। ডেনিম গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আহমেদ শরীফ। উত্তরায় তার হাউজিং ব্যবসা আছে। এমন একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষের কেন প্রধানমন্ত্রীর অনুদান দরকার পড়লো? তবে বিতর্কের বড় কারণটা ‘বঙ্গবন্ধু’ বিষয়ক। বঙ্গবন্ধুবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত আহমেদ শরীফ। বিভিন্ন সময় তিনি জাতির পিতাকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দিয়েছেন।

পাশাপাশি অভিনেতা আহমেদ শরীফের অসুখ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। জানতে চেয়েছেন কী অসুখে তিনি ও তার স্ত্রী ভুগছেন যার চিকিৎসার জন্য ৩৫ লাখ টাকা অনুদান নিতে হলো। জানা গেছে, অনুদান গ্রহণের দিনই তিনি একজন প্রযোজক-পরিচালকের মেয়ের বিয়েতে হাজির হন সস্ত্রীক। তেমন গুরুতর অসুস্থ হলে জমকালো আয়োজন করে বিয়ে খাওয়ার সুযোগ তিনি কী করে সেই প্রশ্ন ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে। অনেকেই দাবি করছেন, ঠিকমতো খোঁজখবর না নিয়েই কতিপয় অসচেতন মধ্যস্থকারীর সৌজন্যে যার তার হাতে উঠছে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান। এতে সত্যিকারের অসহায় শিল্পীরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও মনে করেন তারা।
 
এদিকে ফেসবুকে জাহিদুল ইসলাম তুষার , সাইয়েদ লুৎফুন নাহারসহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি একটি লেখা শেয়ার করেছেন। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ‘সালটা ২০০৩। ওই সময় খুলনা সরকারি মহিলা কলেজে ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায় যায় ছাত্রদল। ছাত্রদলের অভিষেক অনুষ্ঠানে তৎকালীন সেলিব্রেটি চলচ্চিত্র খল অভিনেতা আহমেদ শরীফকে অতিথি হিসেবে নিয়ে আসা হয়।  অতিথি স্টেজে উঠে তার ভাষণের প্রথম লাইন ছিল ‘মুজিব যদি জাতির পিতা হয় আমি কার সন্তান? ’৭১ এ মুজিব ছিল পাকিস্তানের এয়ারকন্ডিশন ঘরে। উনি ওখানে বসে আপেল ও আঙুর খাইছেন আর আমার নেতা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন।’

জ্বি আমি গতকাল প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ৩৫ হাজার লাখ টাকা অনুদান নেয়া আহমেদ শরীফের কথাই বলছি। আমার জানা নেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই মানুষগুলোকে কারা নিয়ে যাচ্ছে এবং কেন নিয়ে যাচ্ছে। মানুষকে সাহায্য করা নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু মানুষরূপি কিছু দাঁতালকে সহায়তা করা কি আমাদের অনেক বেশি প্রয়োজন? আহমেদ শরীফ ঠিক কোন ক্যাটাগরিতে অসহায় হিসাবে প্রমাণিত?

আমার জাতির পিতাকে যে সম্মান দেখাতে পারে না, আমার দেশের স্বাধীনতাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যে প্রহসনের আশ্রয় নেয়, তার জন্য আমার এক গাল থুতু ছাড়া কোন আবেগই আসে না। আহমেদ শরীফ আপদমস্তক থুতু পাওয়ার মতোই একজন যোগ্য মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে কথা বলা আহমেদ শরীফকে শিল্পী হিসেবে তুলে দেয় সরকারি অনুদান। তাও জাতির জনকের কন্যার হাত দিয়ে। কিছুই বলার নেই। জাস্ট তাকিয়ে দেখা ছাড়া আমার আর কিছু বলার নেই ! শুধু বলবো গণভবনে নেত্রীর পাশে ওরা কারা? আওয়ামী লীগের, যুবলীগের, ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন, তাদের দেখার কেউ নেই ! আফসোস…!’

এদিকে শুধু প্রধানমন্ত্রীর অনুদানই নয়, কট্টর বিএনপিকর্মী আহমেদ শরীফ ২০১৭ সালে অনেকটা গোপনেই সরকারি খরচে পবিত্র হজ পালন করেছেন। এদিকে গত বছরের ২ এপ্রিল চেক জালিয়াতির একটি মামলায় তিন মাসের কারাদণ্ডও হয়েছিল ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় এই অভিনেতার। কারাদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ ৬৭ হাজার টাকা জরিমানাও করে ২০১৮ সালের ২ এপ্রিল ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক ইমান আলী শেখ রায় ঘোষণা করেছিলেন।


অনুদান নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে আহমেদ শরীফের বক্তব্য হল - ‘বার্ধক্যজনিত কারণে আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ঠিক মতো হাঁটাচলা করতে পারি না। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, প্রস্টেটের অসুবিধাসহ নানা অসুখে ভুগছি। কিছুদিন আগে, পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ার কারণে অস্ত্রোপচারও করেছি। আমি ঠিকমতো হাটতে পারি না। অনেক আগে শুটিং করতে গিয়ে, পড়ে পা ভেঙে গিয়েছিল। সেসময় অস্ত্রোপচার করে পায়ে রড বসানো হয়েছে। ১৮ বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছি। 

আমার বয়স এখন ৭৪ বছর। এই বয়সে একজন মানুষ কতটুকুই সুস্থ থাকে। শরীরও এখন আগের মতো সাড়া দেয় না। দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরে শুয়ে-বসে কাটাতে হয়। চিকিৎসার অভাবে আমার স্ত্রীর চোখটাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ওর চোখের রেটিনায় সমস্যা। আমার একটি মেয়ে আফিয়া মোবাসসিরা মৌরি। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিনগুলো কাটছে আমার।’

কথা উঠেছে, গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর থেকে অনুদানের চেক নিয়ে ওই দিন রাতেই চলচ্চিত্র প্রযোজক শফি বিক্রমপুরীর ৫০তম বিয়েবার্ষিকীর আনন্দ অনুষ্ঠানে যোগ দেন আহমেদ শরীফ। ওই অনুষ্ঠানে তিনি মেতে ছিলেন আনন্দ-আড্ডায়, এ নিয়েও ফেসবুকে চলছে তুমুল সমালোচনা।এ প্রসঙ্গে আহমেদ শরীফ বলেন, ‘চলচ্চিত্র প্রযোজক শফি বিক্রমপুরীর সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তার অনেক ছবিতে আমি অভিনয় করেছি। তাদের বিয়েবার্ষিকী অনুষ্ঠানে গিয়েছি, এটা সত্য। কিন্তু আনন্দ-আড্ডায় তো আর মাতিনি। উপস্থিত অতিথিরা নিশ্চয়ই দেখেছেন, আমি সেখানেও অসুস্থবোধ করছিলাম। তাই দেরি না করে বাসায় চলে এসেছি।’


 
হাউজিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকা প্রসঙ্গে এই অভিনেতা বলেন, ‘এসব কথা শুধুই মিথ্যাচার। অভিনয়ের বাইরে আমি আর কোনো পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, এখনো নেই। যারা বলছে, আমি হাউজিং ব্যবসা করি, তাদের উদ্দেশে বলব, তারা প্রমাণ করুক। অভিনয়কেই একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম, এর বাইরে আর কিছুই না। আমি ৪৮টি বছর দেশের মানুষের জন্য কাজ করেছি, তাদের বিনোদন দিয়েছি।’

উত্তরায় বাসা নিয়ে আহমেদ শরীফ বলেন, ‘না, আমার নিজেস্ব কোনো বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট নেই। আমি উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টেরের একটি বাড়িতে থাকি। ওখানে আমি প্রায় ২০ বছর ধরে ভাড়া থাকছি। চাইলে আপনারা এসে খোঁজ নিতে পারেন। আমার বাড়িওয়ালা আছে কিংবা আশপাশের মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন।’

অনেকেই বলছেন, আপনি বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রদলের নেতাও ছিলেন? ২০০৩ সালে খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের একটি অনুষ্ঠানে ইতিহাস বিকৃত ও বঙ্গবন্ধুবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়েছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তরে আহমেদ শরীফ বলেন, ‘এসব কথা আমার কানেও এসেছে। যে সময়টার কথা বলা হচ্ছে, ২০০৩ সাল। ওই সময় আমি অসুস্থ হয়ে দীর্ঘ দেড় বছর বিছানায় পড়েছিলাম। তখনই হায়দ্রাবাদে শুটিং করতে গিয়ে আমার পা ভেঙেছিল। ওই সময় আমি টোটালি বিছানায়। আমার কাছে দলিল-প্রমাণ আছে। চাইলে আপনারা এসে দেখতে পারেন।’

এই অভিনেতা আরও বলেন, ‘আমি কখনও বিএনপির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। রমনা- রেসকোর্স ময়দানে, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের দিন আমিও উপস্থিত ছিলাম। তখন ছাত্রবস্থায় বন্ধুদের সঙ্গে বসে আমিও সেই ভাষণ শুনেছি। সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে, আমরা নিশ্চিত ছিলাম এবার আমরা স্বাধীন হবো। বঙ্গবন্ধু ছাড়া এই দেশ কোনোভাবেই স্বাধীন হতো না। তার নেতৃত্ব না থাকলে, দেশের মানুষ স্বাধীনতা পেতো না। আমি কিংবা আমার পরিবারের কেউই বিএনপির রাজনীতি করেনি।’

নিজের পরিবার সম্পর্কে আহমেদ শরীফ বলেন, ‘আমার পরিবার সম্পর্কে একটু বলতে চাই, আমার দাদা প্রয়াত মৌলভী সামছুদ্দিন আহমেদ অবিভক্ত বাংলার একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সময় পরপর তিনবার মন্ত্রী ছিলেন উনি। আমি তার নাতি। আমার দাদারা ছয় ভাই। সবাই সে সময়ের নামিদামি মানুষ ছিলেন। আমাদের পরিবার হচ্ছে কুষ্টিয়ার আহমেদ পরিবার। সবাই আমাদের এক নামে চেনেন। আমি আপনাদের এইটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমি ও আমার পরিবার লোকজন না খেয়ে থাকব, তবুও মিথ্যাচার করব না। দয়া করে আমাকে নিয়ে কেউ মিথ্যাচার করবেন না।’

সবশেষে বরেণ্য এই অভিনেতা বলেন, ‘আমি এই সরকারের আমলেই হজ করেছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেই ২০১৬ সালে আমি হজে যাই। সে কথা আমি মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি। তিনিও আমার সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। জেনে-শুনেই তিনি আমাকে ও আমার পরিবারকে সাহয্য করেছেন। একজন দুস্থ ও অসুস্থ শিল্পীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এজন্য তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। দোয়া করি, তিনি দীর্ঘজীবী হোন।’

উল্লেখ্য, অভিনেতা আহমেদ শরীফ প্রায় আট শতাধিক বাংলা ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত প্রথম ছবির ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। সুভাষ দত্ত পরিচালিত এই ছবিতে তিনি অভিনয় করেন নায়ক চরিত্রে। খলনায়ক হিসেবে প্রথম অভিনয় করেন দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর পরিচালনায় ‘বন্দুক’ ছবিতে, যা মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালে। তার অভিনীত সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি মনতাজুর রহমান আকবর পরিচালিত ‘দুলাভাই জিন্দাবাদ’। ছবিটি মুক্তি পায় ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর। আর মুক্তি অপেক্ষায় আছে শামীম আহমেদ রনি পরিচালিত ‘শাহেনশাহ’ ছবিটি। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়।

সোনালীনিউজ/বিএইচ