শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬

নির্বাচন বিশ্লেষক-বিশেষজ্ঞদের অভিমত

ইমেজ উদ্ধারে শেষ সুযোগ ইসির

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২০, বৃহস্পতিবার ০৩:৪২ পিএম

ইমেজ উদ্ধারে শেষ সুযোগ ইসির

ঢাকা : জমে উঠেছে ঢাকার দুই সিটি (উত্তর-দক্ষিণ) নির্বাচন। নগরজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। এবারই প্রথম ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রহণ করা হবে সব কেন্দ্রের ভোট। আগামী ৩০ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ।

প্রতিযোগীদের তরফ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে সংশয়, সন্দেহ এবং সংঘর্ষের শঙ্কাও। হামলা, ভাঙচুর, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াসহ ইতোমধ্যে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। ভোটগ্রহণের দিন যত এগিয়ে আসছে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তত বাড়ছে। ক্ষমতাসীন দল মনোনীত প্রার্থী শঙ্কাবোধ না করলেও তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্নসহ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সরকারবিরোধীরা।

এই পরিস্থিতির মধ্যে আসন্ন নির্বাচন কেমন হতে পারে? নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশন এবং প্রতিযোগীদের ভূমিকা কেমন, সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা কী, এ নিয়ে কথা বলেছেন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা।

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তারা। গুরুত্ব দিয়েছেন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ইমেজ প্রসঙ্গে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন আশা করেন প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়বে। কারণ ভোট বেশি আর ভোটার উপস্থিতি কম হলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ইভিএম প্রশ্নে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, কোনো পদ্ধতিই শতভাগ নির্ভুল নয়। অনিয়মের সুযোগ তৈরি করা হয়। নির্বাচনে যদি কোনো কারচুপি হয় তাহলে যতটা না মেশিনের দায় হয় তার চেয়ে বেশি দায়ী হতে হবে মেশিন ব্যবহারে দায়িত্বপ্রাপ্তদের। অতীতের ঘাটতিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে এবারের নির্বাচনে অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে বলে আশা ড. ইফতেখারের।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাই মুখ্য। জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান ইসি যতটা সমালোচিত হয়েছে, ইমেজ হারিয়েছে কিছুটা হলেও ফিরে পেতে পারে যদি দুই সিটিতে দক্ষ রেফারির পরিচয় দেন।

আর পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিকারী ড. তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, নির্বাচন প্রশ্নহীন করতে আগে নির্বাচন ব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। নয়তো সব নির্বাচনে যা হয়েছে বা ঘটেছে তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে, তাতে সন্দেহ নেই। নিন্দার সিঁড়ি ভাঙতে অন্তত দুই সিটি নির্বাচনে ইসিকে অর্পিত দায়িত্ব পালন করা উচিত বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে ২০২২ সালে।

দেশের অন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারলেও রাজধানী ঢাকা সিটি নির্বাচনই হবে এই কমিশনের শেষ নির্বাচন। আসন্ন সিটি নির্বাচনে প্রচারণায় আইনের প্রয়োগ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন বর্তমান কমিশনেরই একজন (মাহবুব তালুকদার)।

ইতোমধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ এবং কয়টি উপনির্বাচন করেছে এই কমিশন। কমিশনের ভূমিকা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সরকারবিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছে। তারা কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। আর অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছে টিআইবিসহ বিভিন্ন সংগঠন।

অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ : স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, নির্বাচন প্রশ্নহীন করতে আগে নির্বাচন ব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার চান তিনি।

আসন্ন ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন নিয়ে এ প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যা হয়েছে তা-ই হবে, যা ঘটেছে তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। সোমবার চট্টগ্রামে যা হলো, তা-ই। কারণ নির্বাচন ব্যবস্থার তো কোনো পরিবর্তন নেই।

আমরা দেখছি, প্রার্থীরা নানা ধরনের অভিযোগ দিচ্ছেন। এমনকি নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার চিঠি দিলেন। তার তো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বরং বিধি লঙ্ঘিত হচ্ছেই।

আচরণ বিধিমালা-২০১৬ বিধান সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার ইসিতে চিঠি দিয়েছেন। তিনি (মাহবুব তালুকদার) বলেছেন, ‘সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এই বিধিমালা যারা প্রণয়ন করেছেন, তারাই এখন এর বিরোধিতা করছেন।’      

ড. তোফায়েল বলেন, নির্বাচনের বাকি ১৩ দিন। এখনো শেষ বলা যাবে না। কারণ নির্বাচনের ঘণ্টাখানেক আগেও পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে। তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন অনেকটাই সমালোচিত। নিন্দার সিঁড়ি ভাঙতে অন্তত দুই সিটি নির্বাচনে ইসিকে অর্পিত দায়িত্ব পালন করা উচিত বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।

মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন : সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন বলেন, নির্বাচনের বাকি আছে দুই সপ্তাহ, এখনই চূড়ান্ত কিছু বলা যাবে না।

প্রার্থীদের প্রচারে এখন পর্যন্ত যা দেখছি তাতে আমি আশা করছি, দুই সিটি নির্বাচনে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে। মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলেই নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হবে।

শুধু ভোট বাড়ালে হবে না, ভোটকেন্দ্রে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ভোট বাড়লে, মানুষ কমলে তো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না।

নির্বাচন কমিশনের প্রতি পরামর্শ দিয়ে সাবেক এই আইন সচিব ছহুল হোসাইন বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে নির্বাচন কমিশনের নতুন করে কোনো বিধিমালা করার প্রয়োজন নাই, যা আছে তা কঠোর প্রয়োগ করা হলেই যথেষ্ট।

নির্বাচনে ইসিতে নিজেদের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় আমরা মন্ত্রীকেও প্রচারে যেতে দেইনি। যেখানে প্রচারে যাবেন তার আগের থানার ওসি দিয়ে আটকিয়ে দিয়েছি। বলা হয়েছে বিধি মোতাবেক ফিরে যেতে হবে, হয়েছেও। তাই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য দুটি কাজ করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনকে কঠোরভাবে বিধিবিধান প্রয়োগ করতে হবে, আর প্রতিদ্বন্দ্বী ও সংশ্লিষ্ট দলের লোকজনকে নির্বাচনী আইন মানতে হবে। তাহলেই প্রত্যাশিত নির্বাচন হবে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার  বলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু দেখছি না। আশাবাদী হতে চাই। তবে গোয়াল পোড়া গরু সিঁদুর দেখলেই ভয় পায়। বর্তমান নির্বাচন অতীতে নিরপেক্ষ রেফারির ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়নি। এখনো অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি।

আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংঘাত-সহিংসতাপ্রবণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী এবং মনোনয়নদাতা দল ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি রয়েছে। যার কারণে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের মধ্যে গণসংযোগ থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণের পরও সংঘাত-সংঘর্ষ দেখা যায়।

তিনি বলেন, নির্বাচন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাই মুখ্য। আমার জানামতে নির্বাচন কমিশনের কাঁধে অনেক দায়িত্ব এবং হাতে অনেক ক্ষমতা।

নির্বাচন কমিশনকে তার প্রাপ্ত ক্ষমতা পুরোপুরি প্রয়োগ করতে দেখিনি, এখনো দেখছি না। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ করলেই নগরবাসীর প্রত্যাশিত ভোট হবে বলে মনে করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি আরো বলেন, জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান ইসি যতটা সমালোচিত হয়েছে, ইমেজ হারিয়েছে, কিছুটা হলেও ফিরে পেতে পারে যদি দুই সিটিতে দক্ষ রেফারির দায়িত্ব পালন করেন। 

ড. ইফতেখারুজ্জামান : টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে দেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ অন্যরা অংশগ্রহণ করায় নির্বাচন উৎসবমুখর ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটা ইতিবাচক। একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী অভিযোগ ও অঘটনের কারণে কিছুটা উত্তাপও ছড়িয়েছে।

প্রচারণায় বাধা, পোস্টার ছেঁড়া, আঘাত-পাল্টা আঘাত এটাও আমাদের দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু স্থানীয় নয়, অতীতে সব ধরনের নির্বাচনেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও কিছুটা ঘাটতি ছিল।

ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, প্রথমত প্রতিদ্বন্দ্বীরা যদি সুষ্ঠু নির্বাচন চান, যদি নিজের পক্ষে ফলাফল আনার প্রতিযোগিতায় না নামেন, দ্বিতীয়ত নির্বাচন কমিশন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন, যাতে নির্বিঘ্নে ভোটাররা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করেন তাহলেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। নগরবাসীর মতো তিনিও এবার সুষ্ঠু নির্বাচনে আশাবাদী।

ইভিএম প্রসঙ্গে টিআইবির এই কর্মকর্তার মন্তব্য, মেশিনের কোনো দোষ নেই। কোনো পদ্ধতিই শতভাগ নির্ভুল নয়। অনিয়মের সুযোগ তৈরি করা হয়। নির্বাচনে যদি কোনো কারচুপি হয় তাহলে যতটা না মেশিনের দায় হয় তার চেয়ে বেশি দায়ী হতে হবে মেশিন ব্যবহারে দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাইকে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই