মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬

ইলিশশূন্য মেঘনায় জেলেদের হাহাকার

নিউজ ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৩ জুন ২০১৯, বৃহস্পতিবার ১২:২৬ পিএম

ইলিশশূন্য মেঘনায় জেলেদের হাহাকার

ঢাকা : মেঘনা ইলিশশূন্য। এর মাঝে চলছে জেলেদের হাহাকার। ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় পার হতে চললেও মেঘনা নদী থেকে তেমন ইলিশের দেখা মিলছে না। এতে চরম হতাশা আর দুশ্চিন্তা বয়ে বেড়াচ্ছেন মেঘনার জেলেরা।

মেঘনাকে ঘিরে গড়ে ওঠা লক্ষ্মীপুর ও ভোলার জেলে সম্প্রদায়ের কষ্ট খুব স্পষ্ট। নদীতে ইলিশের তেমন দেখা না মেলায় অনেকেই লোকসান গোনার ভয়ে কূলেই বেকার দিন পার করছেন। ধার-দেনা করে কোনোমতে সংসার চললেও ভবিষ্যৎ কেবলই অন্ধকার দেখছেন এসব জেলে। ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় যেমন ধার-দেনা করে জেলেরা চলেছেন, সে অবস্থা বদলায়নি এখনো।

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের মেঘনাতীরের মতিরহাট। বাজারের দক্ষিণে নদীপাড়ে বেশ কয়েকটি নৌকায় চার জেলে জাল বুনছেন আর বাকি দুজন অন্য কাজে ব্যস্ত। কাছে গিয়ে জানা যায়, তাদের বাড়ি দ্বীপ জেলা ভোলার পশ্চিম ইলিশায়। ওখানে ইলিশের দেখা না পেয়ে তারা এসেছেন লক্ষ্মীপুরের মেঘনায়। কিন্তু এখানেও ইলিশের দেখা না মেলায় যেন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।

জেলে আবদুর রহমান সাবরাশি বলেন, কোনো মাছ নেই নদীতে। আমরা আজ নদীতে যাইনি। মাছ না পেলে আমাদের কোনো উপায় থাকে না। অনেক কষ্ট করে চলতে হয়। আমাদের অন্য কোনো পেশা নেই।

সামনে দেখা মেলে বেশ কিছু মানতা সম্প্রদায়ের নৌকার। নৌকাগুলো দুলছে আর ভাসছে নদীর জোয়ারে। চোখ ফেরালেই দেখা মেলে নৌকার ভেতর এক নারী শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। তার স্বামী জাল মেরামত করছেন। আরেক নৌকায় একজন নারীকে দেখা গেল অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতে। তাদের কারো চুলায় তখনো আগুন জ্বলছিল না।

মতিরহাট ইলিশ ঘাটে দেখা গেল এক আজব দৃশ্য! ইলিশ ঘাটের আড়তদাররা ইলিশ বিক্রির ধুম না থাকায় ঘুমাচ্ছেন! সামনে এগোতেই চোখ মেললেন আবদুল ওহাব ও নুরুল ইসলাম মুন্সি। তারা বললেন, দ্যাখেন না ভাই ঘাটের অবস্থা কী? কোনো মাছ তো নাই। ঘুমানো ছাড়া আর উপায় কী?

নদীতীরে হঠাৎ দেখা মেলে দুই কিশোরের। একটি বাক্সে করে তারা মাছ আনছে। খুব কৌতূহল জাগল মাছগুলো দেখার। দেখা মিলল, তিনটি ইলিশ আর কয়েকটি পোয়া মাছ। কিন্তু এতে যে তেলের খরচ ওঠেনি, তা তাদের দিকে তাকানোর পরই স্পষ্ট। আগামী দিনগুলো নদীতে ইলিশের দেখা না মিললে এসব মানুষের জীবন হয়ে উঠবে আরো কষ্টদায়ক।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চর বংশী গ্রামের জেলে শাহাজালাল দেওয়ান বলেন, জেলেদের মজুরি বাদে ইঞ্জিনচালিত নৌকার জ্বালানিসহ পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু ধরা পড়া চারটি ইলিশ বিক্রি হয় এক হাজার টাকায়। এতে ব্যয়ের চার হাজার টাকাই ওঠেনি।

লক্ষ্মীপুর জেলায় ৫০ হাজার ২৫২ জন জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে নদীতে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত ৪৯ হাজার জেলে। তাদের একমাত্র পেশাই মাছ ধরা। তারা বর্তমানে ইলিশ না ধরতে পেরে কষ্টে আছেন।

স্থানীয় জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞা থাকায় দুই মাস সব ধরনের মাছ শিকার থেকে বিরত ছিলেন তারা। মাছ ধরাই একমাত্র পেশা হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার দিনগুলোতে অলস সময় পার করতে হয়েছে তাদের। ফের মাছ ধরা শুরু হয়েছে; আশা করছেন এবারও প্রচুর মাছ ধরা পড়বে। কিন্তু তারা নদীতে নেমে হতাশ হয়েছেন।

সদর উপজেলার চর রমনী গ্রামের জেলে মহিউদ্দিন বলেন, নদীতে তেমন ইলিশ মিলছে না। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত জাল ফেলে ২-১ হাজার টাকার বেশি ইলিশ উঠছে না জালে। এতে তাদের লাভের চেয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে বেশি।

রায়পুর উপজেলার হাজীমারা মাছ ঘটে গিয়ে আড়তদার মো. লিটন ও জেলে সুলতান মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছর দুই মাস বন্ধের পর লক্ষ্মীপুরের মেঘনায় জেলেদের মাছ শিকারের উৎসব শুরু হয়। শত শত নৌকায় জেলেরা ছোটেন মেঘনায়। ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ধরতে জেলেরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ঘাটে বেড়ে যায় ক্রেতা-বিক্রেতা। জেলেপল্লিতে শুরু হয় আনন্দ উৎসব। কিন্তু এবারের চিত্র উল্টো। নদীতে মাছ পাচ্ছেন না তারা।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চর রমনী গ্রামের মাছের আড়তদার নজরুল ইসলাম বলেন, বিগত বছর মাছের ঘাটগুলো থেকে এ সময়ে প্রতিদিন ২০-৩০ টন ইলিশ দেশের বাজারে সরবরাহ করা হতো। অথচ গত সাত দিনে ১ টন ইলিশও সরবরাহ করতে পারেননি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম মহিব উল্লাহ বলেন, অর্ধলক্ষাধিক জেলে দুই মাস বেকার ছিলেন। তারা নদীতে নেমে মাছ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। তবে নদীতে পানি বাড়লে ও ভারী বৃষ্টি হলে ইলিশ বেশি ধরা পড়বে বলে তিনি আশাবাদী।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue