বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬

ইয়াবার টানে ঘর ছাড়ে তরুণীরা

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৯, মঙ্গলবার ০১:০০ পিএম

ইয়াবার টানে ঘর ছাড়ে তরুণীরা

ঢাকা : রাজধানীর অভিজাত এলাকার অনেক তরুণী প্রতিদিন সন্ধ্যায় ইয়াবার টানে ঘর ছাড়ে। বয়ফ্রেন্ড এমনকি থ্রিস্টার বা ফাইভস্টার হোটেলের লবিতে সদ্য পরিচয় হওয়া যুবকের সঙ্গে রাতও কাটায়।

এরা কোনো পেশাদার প্রমোদবালা নয়, অধিকাংশই ধনীর দুলালি ও উচ্চ শিক্ষিত। বিত্তবান বাবা-মা একসময় প্রচুর টাকা দিত। কিন্তু নেশায় আসক্ত হওয়ায় এখন বন্ধ হয়ে গেছে সেই টাকার উৎস।

অবাধ্য এবং বখে যাওয়া মেয়েটি টাকা ছাড়াই বের হয়। টার্গেট কোনো বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ইয়াবা খাওয়া। এমনকি হোটেলের লবিতে কারো সঙ্গে পরিচয় হলে তার সঙ্গে ইয়াবা খেয়ে রাত কাটানো। সন্ধ্যা থেকে রাত ১১-১২টা পর্যন্ত এদের দেখা যায় গুলশানের ফুয়াং ক্লাব ও এর আশপাশে। পুলিশ প্লাজার আশপাশে। থ্রিস্টার ও ফাইভস্টার হোটেলগুলোর বার ও লবিতে।

গুলশান, বনানী, বারিধারার বেশ কিছু আবাসিক ভবন, গেস্ট হাউসে এদের নিয়মিত আড্ডা দিতে দেখা যায়। রাত ১২টার পর আর দেখা যায় না। ততক্ষণে তারা বয়ফ্রেন্ড বা সদ্য পরিচয় হওয়া যুবকের সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে অবলীলায় হারিয়ে যায়।

ধনীর দুলালিরা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার ফাঁকে এই মরণ নেশায় আসক্ত হয়। সেদিকে অভিভাবকদের দৃষ্টি নেই। সন্তানরা চাওয়া মাত্র দুই হাতে টাকা দেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবায় আসক্ত তরুণীরা জীবিত থেকেও মৃত। ইয়াবা আর সিসার নীলদংশনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এসব ধনীর দুলালিরা। ঢাকার গুলশান, বনানী এবং ধানমন্ডির অভিজাত এলাকায় এরা নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে তুলছে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ ক্লাব।

সন্ধ্যা হলেই এসব এলাকায় এদের চলাফেরা নজর কাড়ে পথচারীদের। দামি গাড়িতে উচ্চস্বরে মিউজিক বাজিয়ে এরা ছুটে চলে। এদের গাড়ির শব্দও একটু ভিন্ন। গভীর রাত পর্যন্ত এরা ক্লাবগুলোতে আড্ডা দেয়। সুইমিং পুলে সময় কাটায়। ইন্টারনেটে চ্যাট করে অশ্লীল ছবি দেখে। ধনীর দুলালিদের বেপরোয়া জীবনযাপন নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও।

এ ব্যাপারে গুলশান কূটনৈতিক জোনের এডিসি ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘এসব আমরা খুব একটা আমলে নেই না। বাপের টাকা আছে ছেলেমেয়েরা উড়াবে-উড়াক। এটা তারা আর তাদের মা-বাবারা বুঝবে। আমরা দেখি আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটল কি না। কোনো ধর্তব্য অপরাধের ঘটনা ঘটল কি না।

আমরা পুলিশ সদস্যরা নগরবাসীর নিরাপত্তা আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত আছি এবং সে কাজটাই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করছি। কার মেয়ে রাতের আঁধারে কোথায় গেল, সিসা খেল না ইয়াবা খেল এসব আমাদের না দেখলেও চলে।’

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এসব আড্ডায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীরাও অংশ নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। নেশা করে ধনীর দুলালিরা বাসায় ফিরছে ভোর রাতে। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্যতার একপর্যায়ে তারা জড়িয়ে পড়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। টাকার অভাব না থাকলেও সঙ্গ দোষে ছিনতাই অথবা ডাকাতির মতো গুরুতর অপরাধ করতেও তারা দ্বিধাবোধ করছে না।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, বাবা-মায়ের ব্যস্ততার কারণে ছোটবেলা থেকে ধনী পরিবারের অনেক সন্তান এক ধরনের একাকিত্বে ভোগে। বড় হওয়ার পর ওই একাকিত্ব ঘুচাতেই তারা বন্ধু-বান্ধবী নিয়ে হৈ-হুল্লোড়ে মেতে ওঠে। দেশের নামি-দামি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ধনীর দুলালিরা পাল্লায় পড়ে এই অন্ধকার পথে পা বাড়ায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট এক যুবক জানান, ক্লাব, বার, হোটেলগুলোতে বখে যাওয়া ছেলেমেয়েদের অবাধ যাতায়াত রয়েছে। গুলশান, বনানী, বারিধারার অনেক বাড়িতেও প্রতি রাতে এ ধরনের আসর বসে। আবার ১৫-২০ জন আলাদা বাসা ভাড়া করে এ ধরনের ক্লাব-বার তৈরি করে।

বাড়ির ১ম তলায় সুইমিং পুল, ২য় তলায়  টেবিল  টেনিস  কোর্ট ও বিলিয়ার্ড বোর্ড, ৩য় তলায় জিম, ৪র্থ তলায় বার ও ৫ম তলায় ওপেন এয়ার উডেন ফ্লোরে ড্যান্সের ব্যবস্থা করা হয়। এসব আসরে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে মদ্যপান করে ফুর্তি করে। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও ধূমপান করে।

উচ্চবিত্ত এসব ধনীর দুলালিদের বেশিরভাগ বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। অনেকে বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে ভিন্ন পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বাবার অঢেল টাকা খরচ করে ডিগ্রি নিলেও দেশে ফিরে ওই ডিগ্রি কোনো কাজে আসে না।

সোনালীনিউজ/এমটিআই