বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬

বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের টুপি

ঈদে সরগরম টুপির বাজার

ফিচার ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৩ জুন ২০১৯, সোমবার ০১:৫৭ পিএম

ঈদে সরগরম টুপির বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক: মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে টুপির বাজার বারো মাসের। তারপরও ধর্মীয় রীতি ও দিবসে- হজ, রোজা ও ঈদের সময় টুপির চাহিদা বেড়ে যায়। এছাড়া বিশ্ববাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশের টুপির। ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয়ে দেশের টুপি ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। জানা গেছে, কেবল টুপি রপ্তানি করেই বছরে আয় হয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। দেশের বাজারে টুপির চাহিদা রয়েছে বছরজুড়ে। তবে ঈদ সামনে রেখে অনেকেই কেনেন নতুন টুপি। তাই পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে জমে উঠেছে ঈদবাজার। জামা-কাপড়ের পাশাপাশি চলছে শেষ সময়ের আতর, টুপি ও সুরমার কেনাকাটা।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকার মার্কেট, অন্যান্য মার্কেটসহ দেশের সব স্থানে ঈদের আতর, টুপি ও সুরমা কেনাকাটা শুরু হয়ে গেছে। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মার্কেটের মতো বিভিন্ন মসজিদের পাশে যেমন আছে স্থায়ী টুপির দোকান, তেমনি ভ্রাম্যমাণ টুপির দোকানও কম নয়। দোকানদারদের বাইরে আছে পাইকারি বিক্রেতারা। আর এ সুবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন টুপি তৈরির কারিগররা।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, আদিকাল থেকেই মানুষ গাছের পাতা দিয়ে টুপি বানিয়ে রোদ, বৃষ্টি থেকে মাথা সুরক্ষার চেষ্টা করেছেন। তবে টুপির কদর বাড়ে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর টুপি ব্যবহারের কারণে। নবীজি টুপি ব্যবহারের ফলে এই টুপি হয়েছে সম্মান ও মর্যাদার বস্তু।

এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলমান বছরে গড়ে তিনটি করে টুপি কিনলে ৪৫ কোটি টুপির প্রয়োজন। আশার খবর হলো, টুপির এ বিশাল চাহিদা পূরণ করছে দেশের তৈরি টুপি। শুধু দেশের চাহিদা পূরণ নয়, বাংলাদেশের তৈরি টুপি বিশ্ববাজার দখল করছে। বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোয় মুুসলমানদের মাথায় মাথায় শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশের টুপি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোসহ বিভিন্ন দেশে ক্রমেই বাড়ছে বাংলাদেশের টুপির চাহিদা। আরো ভালো খবর হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের হাজিরা মক্কা-মদিনায় খোঁজেন বাংলাদেশি টুপি। টুপির মান এবং ডিজাইন আকৃষ্ট করে বলেই হজের মৌসুমে সৌদি আরবে যাওয়া হাজিরা বাংলাদেশের টুপি কেনেন। জানা গেছে, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, ইরান, থাইল্যান্ড, কাতার, ওমান, মালয়েশিয়া, দুবাইয়ের হাজিরা বাংলাদেশি টুপি সবচেয়ে বড় ক্রেতা।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশি টুপি তুলনামূলক দামে সস্তা, বিক্রয়ে লাভ ভালো। এ কারণেই বাংলাদেশের টুপির এ বিশ্বযাত্রা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। বলা যায়, টুপি এখন সম্ভাবনাময় শিল্প। যাকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান। আয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

জানা যায়, শুধু টুপি রপ্তানি করেই দেশের আয় হচ্ছে ৫০০ কোটি টাকা। আবার টুপি তৈরির কাঁচামালের চাহিদাও বাড়ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, টুপিশিল্পের গোড়াপত্তন হয় ফেনী জেলায়। এরপর এ শিল্প ছড়িয়ে পড়ে ভোলা, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরের রামগতি, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর, ময়মনসিংহ, সিলেট, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। আশার কথা, রাজধানীর পুরান ঢাকার হরনাথ ঘোষ রোডে ‘আলিফ ক্যাপ গার্মেন্টস’-এর এসব টুপি রপ্তানি হচ্ছে শ্রীলঙ্কা, মরক্কো, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি দেশে। আলিফ টুপির কারখানায় ২৫০ জন শ্রমিক ও ছোট-বড় ৪০০ মেশিনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৬ লাখ টুপি রপ্তানি করছে। তবে চাহিদা প্রায় ১২ লাখ টুপির।

টুপিশিল্পের কল্যাণে ভিন্নধর্মী বিকল্প পেশার খোঁজ পেয়েছেন গ্রামবাংলার লাখো নারী। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা হরাগাছ পৌর এলাকা ও এর আশপাশের নারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিড়ি তৈরি কারখানায় কাজ করতেন। কিন্তু টুপি তাদের স্বাস্থ্যকর কর্মসংস্থানের সন্ধান দিয়েছে। টুপি তৈরিতে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি লাখ লাখ টুপি ব্যবসায়ীরও জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম টুপি।

বাংলাদেশের টুপি রপ্তানির গল্পটি শুরু হয় ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের পূর্ব জয় নারায়ণপুর গ্রামের বেলায়েত হোসেনের হাত ধরে। ১৯৮১ সালে ভাগ্যের অন্বেষণে ওমানের রাজধানী মাস্কাটে চাকরি করতে গিয়ে সেখানকার পুরুষদের মাথায় সুন্দর নকশা করা টুপি দেখে তারও টুপি বানানোর ইচ্ছে জাগে। টুপি তৈরির কৌশল অনুসন্ধানে বেলায়েত একদিন মাস্কাট থেকে ওমানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সালালায় যান। সেখানেই সন্ধান মেলে নকশি টুপি তৈরির কারখানার। সেখানে এক পাকিস্তানি নাগরিকের সহকারী হিসেবে ছয় মাস নকশি টুপির কাজ শেখেন। তারপর সালালায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের ৭০ থেকে ৮০ জন কর্মীকে এ কাজ শিখিয়ে শুরু করেন টুপি তৈরির ব্যবসা। এরপর ১৯৯০ সালে তিনি সালালা ছেড়ে আবার মাস্কাটে গিয়ে নকশি টুপির শোরুম খোলেন। টুপি তৈরি হয় সালালায় বিক্রি হয় মাস্কাটে। তারও তিন বছর পর ওমানে দুটো শোরুম। এভাবে নকশি টুপির বড় রকমের বাণিজ্যের স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরে আসেন বেলায়েত। ১৯৯৩ সালে ফেনীতে গড়ে তোলেন ‘সেভেন স্টার হস্তশিল্প কারখানা’। দেশি কাপড় দিয়ে বিদেশি টুপির নকশা অবলম্বনে বাংলাদেশের তৈরি টুপি বিক্রি করেন ওমানে। এই পথ ধরেই বেলায়েতের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে দাগনভূঞা ও আশপাশের অঞ্চলে গড়ে উঠেছে প্রায় ৩০টি টুপি তৈরির কারখানা। এসব কারখানায় কাজ করছেন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক।

আশা জাগাচ্ছেন টুপিকন্যারা : ভালো খবরটি হলো, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রংপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ফেনী, রংপুর, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, নওগাঁ, তেঁতুলিয়া, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় টুপি তৈরি হচ্ছে। ছোট ছোট কারখানায় হাতে এবং মেশিনে টুপি তৈরি করা হয়। গ্রামে টুপি তৈরির কারখানায় নারীশ্রমিকই বেশি। গ্রামে টুপি তৈরির কারখানায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও কাজ করে স্বাবলম্ব্বী হচ্ছে। টুপিতে নকশি বা গুটির কাজ করে কুমিল্লার দাগনভূঞা, সেনবাগ, নাঙ্গলকোট, কোম্পানীগঞ্জ, সোনাগাজী, ফেনী সদর, ছাগলনাইয়াসহ আশপাশের কয়েক উপজেলায় প্রায় অর্ধলাখ নারী বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বগুড়ার জালি টুপি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দখল করেছে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার। প্রতি মাসে ১০ লক্ষাধিক পিস জালি টুপি তৈরি হয়। বিক্রি হয় প্রায় আড়াই কোটি টাকা। মঙ্গাপীড়িত এলাকা কুড়িগ্রামের পাশাপাশি ১০টি গ্রামের গৃহবধূ, তরুণী সবাই বছরে গড়ে ৬০ হাজার টুপি তৈরি করেন। মধ্যপ্রাচ্যে এসব টুপির গড় মূল্য এক হাজার টাকা হিসাবে এসব গ্রামে বছরে প্রায় ৬ কোটি টাকার টুপি তৈরি হয়। রংপুরে কাউনিয়া উপজেলায়, রংপুর সদর, লালমনিরহাটের তিস্তাচর, কড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন গ্রামের নারীরা টুপি বানিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। দুই দশক ধরে এই টুপি তৈরি করে আসছেন হোমনার ৬টি গ্রামের তিনশর বেশি কারিগর। নওগাঁর নিয়ামতপুর ও মহাদেবপুর উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামে টুপি তৈরি হচ্ছে। বগুড়ার ধুনট উপজেলার বিলকাজুলি, অলোয়া, শ্যামগাতী, পিরহাটি, খাদুলী, হিজুলী, সাগাটিয়া, কাশিয়াহাটা, ভুবনগাতী, শাকদহ, পেঁচিবাড়ী, জালশুকা, বিশ্বহরিগাছা, বহালগাছা, বেলকুচি, মথুরাপুর ও মাটিকোড়সহ প্রায় শতাধিক গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে টুপি তৈরির কাজ। তেঁতুলিয়ার আজিজনগর, মাথাফাটা, ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক নারী ও পুরুষ টুপি তৈরির কাজের সম্পৃক্ত। ফরিদপুর শহরের বায়তুল আমান এলাকার পদ্মা নদীর ভাঙনে সর্বস্ব হারানো শতাধিক পরিবারের নারী সদস্যরা টুপি তৈরি করেন। এভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রামাঞ্চলের নারীরা তাদের হাতের সুনিপুণ দক্ষতায় টুপি তৈরিতে এনেছে আধুনিক মাত্রা। নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন এবং অর্জন করেছেন ‘টুপিকন্যা’র খেতাব। চট্টগ্রামের দেশ বিদেশ মিডিয়া, চাঁদনী অ্যান্ড ব্রাদার্স, ছাকিনা মঞ্জিল, ফেনীর হস্তশিল্প, জনসেবা হস্তশিল্পসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টুপি রপ্তানি করছে।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/এসআই