বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

উত্তপ্ত বরগুনা, রিফাত হত্যাকাণ্ডের ‘খলনায়িকা’ মিন্নি!

বিশেষ প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ জুলাই ২০১৯, সোমবার ০৪:৩১ পিএম

উত্তপ্ত বরগুনা, রিফাত হত্যাকাণ্ডের ‘খলনায়িকা’ মিন্নি!

ঢাকা : বরগুনায় প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নায়িকা বনে যাওয়া তার স্ত্রী আয়েশা মিন্নিই এখন এই হত্যার মূল ‘খল নায়িকা’। তাকে গ্রেফতারের দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে অত্র এলাকার বাসিন্দারা।

এই হত্যাকাণ্ডের প্রথম ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে 'স্বামীকে বাঁচানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেছিল স্ত্রী মিন্নি' এমন আলোচনায় অনেকটা সিনেমার ঘটনার মতো নায়িকা বনে যান তিনি।

প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজ থেকে একে একে আসামিদের নাম প্রকাশ পেতে থাকে। হত্যার নেপথ্যে উঠে আসে বরগুনার অন্যতম সন্ত্রাসী নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর নাম। প্রকাশ পায় এই দুই সন্ত্রাসীর নেতৃত্বাধীন জিরো জিরো সেভেন নামক গ্রুপের নাম।

শুধু তাই নয়ন ও রিফাত ফরাজীকে বরগুনায় শেল্টার দেয়া রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের নামও প্রকাশ পায় এই এক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। এসব আলোচনার মধ্যেই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রসফায়ারে নিহত হন হত্যার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড। গ্রেফতার করা হয় রিফাত ফরাজীকেও। হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরও আসামিরাও একে একে গ্রেফতার হন।

তবে এসবের মধ্যেও যেন থলের বিড়াল তখনও আড়াল! তবে ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয় প্রকাশিত আরেক ভিডিও। সেই ভিডিওতে নায়িকা বনে যাওয়া নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নির আচরণে সন্দেহের সমালোচনা উঠে। শুধু তাই নয় এর আগে প্রকাশ পায় নয়নের সঙ্গে তার পরকীয়া সম্পর্কেরও। কিন্তু সব অভিযোগই ভেস্তে দেন মিন্নি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে কান্নার আহাজারি আর স্বামী হারানো বেদনার আবেগাপ্লুত চিত্রই ফুটে উঠে।

তারপরও যেন মিন্নির অপরাধ ঢাকা পরছিল না কোনোভাবেই। আর সেই আগুনে ঘি ঢালেন ক্রসফায়ারে নিহত নয়ন বন্ডের মা হালিমা বেগম। মিডিয়ায় প্রকাশ্যে এসে ফাঁস করেন হত্যাকাণ্ডের খল নায়িকা মিন্নির আসল চরিত্র!

তিনি বলেন, মিন্নি কোনোভাবেই দোষ এড়াতে পারে না। নয়ন বন্ড হত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে মিন্নির পরোক্ষ মদদেই। রিফাতের স্ত্রী হলেও মিন্নি অধিকাংশ সময় নয়নকেই দিয়েছে, সেটা সশরীরে সাক্ষাতে কিংবা মুঠোফোনে।

মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে বরগুনায় মানববন্ধন

নয়নের মা বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বুধবার (২৬ জুন)। কিন্তু আগের দিন মঙ্গলবারও মিন্নি আমাদের বাড়িতে এসেছিল। সে আমার ছেলে নয়নের সঙ্গে দেখা করেছে। ছেলে তো মারাই গেল, এখন আর মিথ্যা কথা বলে কী লাভ? মিন্নি যে ঘটনার আগের দিনও আমাদের বাড়িতে এসেছিল; সেটি আমাদের প্রতিবেশীরাও দেখেছে। আমার ছেলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।            

এরপর গতকাল ১৩ জুলাই রাত ৮টায় বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। সংবাদ সম্মেলনে ১০টি কারণ দেখিয়ে গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি। পরে আজ রবিবার সকালে বরগুনার সর্বসাধারণ জনতা প্রেসক্লাবের সামনে আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এক নম্বর সাক্ষী ও নিহত রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।

রবিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বরগুনা প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে বরগুনার সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।

মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ, চাচা আবদুল আজীজ শরীফ, জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক অ্যাভোকেট সুনাম দেবনাথ, সদর উপজেল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মারুফ মৃধা প্রমুখ। এতে নিহত রিফাতের বন্ধুরাও উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধন চলাকালে সমাবেশে বক্তারা মিন্নিকে রিফাত হত্যার ‘নেপথ্যের খল নায়িকা’ উল্লেখ করে তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

পুত্রবধূ মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবি শ্বশুরের  

শনিবার সংবাদ সম্মেলনে রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বলেন, মিন্নি আগে নয়ন বন্ডকে বিয়ে করেছিল। ওই বিয়ে গোপন করে আমার ছেলে রিফাতকে বিয়ে করেছে। মিন্নি ও তার পরিবার এটি গোপন করেছে। আমার ছেলেকে হত্যার পেছনে মিন্নির মদত আছে। তাকে গ্রেফতার করলে সব বিষয় পরিষ্কার হবে।

হালিম দুলাল শরীফ বলেন, আমার ছেলেকে হত্যা নিয়ে কিছু বিষয় জানাতে আপনাদের সামনে এসেছি। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি ও সাংবাদিক ভাইদের সহযোগিতায় রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত এ পর্যন্ত ১৪ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে খুবই দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে; এই হত্যার ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের কেউ কেউ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কীভাবে তারা বাইরে তা বলার জন্যই আমি আজ এখানে আসতে বাধ্য হয়েছি।

তিনি বলেন, নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির বিয়ের বিষয়টি মিন্নি ও তার পরিবার সুকৌশলে গোপন করে। নয়নের স্ত্রী থাকা অবস্থায় আমার ছেলেকে বিয়ে করে মিন্নি। রিফাতের সঙ্গে বিয়ের পরও মিন্নি নয়নের বাসায় যাওয়া-আসা করত। নিয়মিতভাবে নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করত সে।

দুলাল শরীফ বলেন, এরই মধ্যে নয়নের মা একাধিক গণমাধ্যমকে এ ব্যাপারে আরও অনেক তথ্য দিয়েছেন। নয়নের মা মিন্নির আগের বিয়ের কথা পরিষ্কারভাবে বলেছেন।

রিফাতের বাবা বলেন, রিফাত হত্যাকাণ্ডের আগের দিন সকালে নয়ন বন্ডের সঙ্গে দেখা করতে যায় মিন্নি। ওই দিন সন্ধ্যায়ও নয়নের বাসায় যায় সে। রিফাত শরীফের সঙ্গে বিয়ের পরও নয়নের বাসায় মিন্নির নিয়মিত যাতায়াত ছিল।

তিনি বলেন, ঘটনার দিন রিফাতকে ছাড়া কলেজে গেলেও ঘটনার কিছু সময় আগে রিফাতকে বাসা থেকে কলেজে ডেকে নিয়ে যায় মিন্নি। কারণ হত্যাকারীদের সঙ্গে মিন্নির আগে থেকে যোগাযোগ ছিল। মোটরসাইকেলে কলেজ থেকে মিন্নিকে নিয়ে আসার জন্য রিফাত গেলে হত্যাকারীদের না দেখে আবার কলেজে ঢুকে যায় মিন্নি। সেই সঙ্গে সময় কাটাতে থাকে। পরে হত্যাকারীদের উপস্থিতি দেখে মিন্নি কলেজ থেকে বের হয়। ওই সময় মিন্নিকে নিয়ে আসতে গেলে আমার ছেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হত্যাকারীরা।

তিনি আরও বলেন, মিডিয়ায় প্রকাশিত নতুন ভিডিওতে বিষয়টি পরিষ্কার দেখা যায়। আমার ছেলেকে রিফাত ফরাজী ও অন্যরা যখন মারধর করতে করতে নিয়ে যায় তখন স্বাভাবিকভাবে পেছনে পেছনে হাঁটছিল মিন্নি। যা কোনোভাবেই আমি মেনে নিতে পারিনি। এটি দেখে পরিষ্কার বুঝা যায় আমার ছেলে হত্যার পেছনে মিন্নির হাত রয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায় রিফাতকে কোপানোর সময় মিন্নি খুনিদের জাপটে ধরেছে। কিন্তু খুনিরা কেউ মিন্নির ওপর চড়াও হয়নি এমনকি মিন্নিকে একটা টোকাও দেয়নি। যখন রিফাত আহত এবং রক্তাক্ত অবস্থায় একা একা রিকশাযোগে হাসপাতাল যাচ্ছিল তখন মিন্নি তার ব্যাগ ও স্যান্ডেল গোছানোর কাজে বেশি ব্যস্ত ছিল। খুনিদের একজন রাস্তা থেকে ব্যাগ তুলে মিন্নির হাতে দিয়েছে। মিন্নি ওই ব্যাগ নিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটছিল। এছাড়া আমার ছেলে রিফাত শরীফকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার সময়ও যায়নি মিন্নি। আসলে সবই ছিল মিন্নির অভিনয়।

এ সময় রিফাতের বাবা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ইতোমধ্যে এসব নিয়ে একাধিক সংবাদ ও ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। আপনারা সবাই অবগত আছেন। তাহলে কেন এখন পর্যন্ত মিন্নিকে গ্রেফতার করছে না পুলিশ। তাকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে না কেন পুলিশ? আমার বিশ্বাস মিন্নিকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আমার ছেলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে। এ হত্যার পেছনে মিন্নির হাত আছে।

গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজ গেটে স্ত্রী মিন্নির সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার একটি ভিডিও ওই দিনই ফেসবুকে ভাইরাল হয়।

রিফাত শরীফের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার ৬ নম্বর বুড়িরচর ইউনিয়নের বড় লবণগোলা গ্রামে। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কয়েকজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গ্রেফতার কেউ কেউ বর্তমানেও রিমান্ডে।

আমার শ্বশুর অসুস্থ তার কিছুই মনে থাকে না : মিন্নি

বরগুনায় চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি বলেছেন, আমার শ্বশুর দুলাল শরীফ অসুস্থ। তার একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বর্তমানে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। যখন যা খুশি বলেন, পরে তা মনে থাকে না। গতকাল রোববার দুপুর ১২টায় নিজ বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

মিন্নি আরো বলেন, গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে আমার স্বামীকে নয়ন বন্ডসহ কতিপয় সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে। সেই হত্যার ভিডিওতে আপনারা সবাই দেখেছেন, স্বামীকে বাঁচানোর জন্য আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অস্ত্রের মুখে প্রতিবাদ করেছি। তা দেখে সারা দেশের মানুষ আমার সাহসের প্রশংসা করেছেন। পরবর্তী সময়ে আমার শ্বশুর নয়ন বন্ডসহ ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন। সেই মামলায় কোথাও উল্লেখ নেই, আমি স্বামী হত্যার সঙ্গে জড়িত। বরং ওই মামলায় আমি ১ নম্বর সাক্ষী। ছেলেকে হারিয়ে আমার শ্বশুর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তিনি যা বলেন পরে তা মনে থাকে না।

রিফাত হত্যাকারীরা বিচারকে অন্যদিকে প্রবাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাকে হয়রানির চেষ্টা করেছে। ফেসবুকে বিভিন্ন ছবি এডিট করে তারা পোস্ট করেছে যা সত্য নয়। বরগুনায় ‘০০৭’ নামের গ্রুপটি যারা সৃষ্টি করেছেন তারা খুবই ক্ষমতাবান ও বিত্তশালী। তারাই এই বিচারের আওতা থেকে দূরে থাকার জন্য আমার শ্বশুরকে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করছে।

রিফাত হত্যার বিচারকে অন্যদিকে প্রবাহিত করতেই তারা গত শনিবার আমার শ্বশুরকে দিয়ে বরগুনা প্রেস ক্লাবে আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করিয়ে সম্পূর্ণ মনগড়া ও বানোয়াট কথা বলিয়েছে। আমি সেসব বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমার স্বামীকে কোপানোর পরে তাকে নিয়ে আমি বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে যাই। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে রেফার করার কথা শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।

নিহত রিফাতের স্ত্রী আরো বলেন, আমার নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বরগুনার পুলিশ সুপারকে ধন্যবাদ জানাই। আমি এক স্বামীহারা অসহায় নারী। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানাচ্ছি।

সোনালীনিউজ/এমটিআই