বুধবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৯, ৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধায় আবারো স্থিতাবস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৫ জুন ২০১৯, মঙ্গলবার ০২:৪০ পিএম

ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধায় আবারো স্থিতাবস্থা

ঢাকা : খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ সুযোগ আরো দুই মাস কার্যকর করা যাবে না। এর কারণ, জারি করা সার্কুলারের ওপর স্থিতাবস্থার মেয়াদ আরো দুই মাস বাড়িয়েছেন উচ্চ আদালত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবমতে, দেশের ব্যাংকিং খাতে মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। গত শনিবার জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনিয়ন্ত্রিত কারণে যেমন লোকসানে পড়ছেন, অন্যদিকে ব্যবসায় ভালো মুনাফা করলেও অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকের দায় পরিশোধ করছেন না।

বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার (২৪ জুন) এ সংক্রান্ত রিট মামলার শুনানিতে স্থিতাবস্থা আরো দুই মাস বাড়ানোর আদেশ দেন।

জানা গেছে, প্রভাবশালীদের চাপে ঋণখেলাপিদের জন্য এই সুবিধা দেওয়া হয়। তবে এতে ভালো ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনা ছিল না বললেই চলে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরে খেলাপি ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়ে যে সার্কুলার জারি করেছিল, হাইকোর্টের এই আদেশের ফলে আগামী ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তার কোনো কার্যকারিতা থাকবে না। সার্কুলার স্থগিত চেয়ে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আবেদনটি করেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে মনজিল মোরসেদ নিজেই শুনানি করেন।

তফসিলি ব্যাংকগুলোর ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রজ্ঞাপন জারি করলেও তাতে শুভংকরের ফাঁকি বেরিয়ে আসছে। অথচ দেশের বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসাকে চাঙা করতে ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সহায়তা দেওয়ার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল এই উদ্যোগ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে তা পর্যালোচনা করে অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি পাওয়া গেছে।

এমন পর্যালোচনার মধ্যেই ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা সার্কুলারের ওপর গত মে মাসের ২৪ তারিখ প্রথমবারের মতো এক মাসের স্থিতাবস্থা জারি করেন উচ্চ আদালত।

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখানে ঋণখেলাপিদের বিশেষ সহায়তা দেওয়া হলেও টানাটানি ও ব্যবসায়িক লোকসানের মধ্যে যেসব বিনিয়োগকারী ঋণ নিয়মিত করেছেন তাদের জন্য নেই ভালো খবর। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, ডিসেম্বর শেষে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার পুরনো ঋণ নিয়মিত করে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করতে অনেকে ধার করেছেন। অনেকে সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেছেন। ফলে তাদের সরকারের এই বিশেষ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রজ্ঞাপনে অনেক ত্রুটি ছিল। এখানে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে যেসব ঋণখেলাপি হয়েছে তারাই কেবল আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ওপর এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করে পুরনো ঋণ নিয়মিত করতে কিংবা পরিশোধ করতে। ফলে অনেক গ্রাহক নতুন করে ঋণ করেন কিংবা সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেন অথবা নিয়মিত করে নেন। ফলে সেসব ঋণ আর খেলাপি হিসেবে শনাক্ত হবে না। এমন ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা। যার বড় অংশই হয়তো ব্যবসায়িক লোকসানের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে মেয়াদ বলা হয়েছে ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে এরপর মার্চ প্রান্তিক শেষে যারা খেলাপি হবেন তারাও এই প্রজ্ঞাপনের সুফল পাবেন না। তবে একটি গোষ্ঠী হয়তো ব্যবসায়ী প্রজ্ঞাপনের সুফল পেতেন। এতে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে মূলধন জোগানও বাড়বে। তবে তাতে সরকারের উচ্চ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য তা অর্জন হবে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রজ্ঞাপনে ঋণ নিয়মিতকরণের যে প্রক্রিয়া দেওয়া হয়েছে তাতেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হবে। ব্যাংকের এক শ্রেণির অসাধু পরিচালক সক্রিয় হয়ে অনেক গ্রাহকের কাছ থেকে অবৈধভাবে ফায়দা দিতে চেষ্টা করবেন।

আর্থিক খাতের দুর্নীতি বন্ধের বিষয়ে হাইকোর্ট এর আগে যে রুল জারি করেছিলেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা আকারে তার জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিবাদীদের।

আর ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-বিএবি এ মামলায় পক্ষভুক্ত হতে পারবে কি না সে আবেদনের ওপর আগামী রোববার শুনানির দিন রেখেছেন আদালত।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ এই রিট আবেদন করার পর গত ৩০ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ঋণখেলাপিদের তালিকা চেয়েছিলেন।

গত ২০ বছরে কোটি টাকার ওপরে ঋণখেলাপিদের তালিকা, কী পরিমাণ ঋণের সুদ মওকুফ করা হয়েছে, ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে যে অনিয়ম চলছে, তা বন্ধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেসব তথ্য ২৪ জুনের মধ্যে দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংককে। সে অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী হিসেবে আদালতে সিলগালা অবস্থায় ওই প্রতিবেদন জমা দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আদালতে জানানো হয়, এ পর্যন্ত ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণসহ মোট ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণের হিসাব দেওয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue