বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

কালের বয়ান

এই ধর্ষণ উপত্যকা আমার বাংলাদেশ নয়

সেলিম আহমেদ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১০ জুলাই ২০১৯, বুধবার ০১:৪৬ পিএম

এই ধর্ষণ উপত্যকা আমার বাংলাদেশ নয়

ধর্ষণ। প্রতিদিন কাগজের পাতা বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলেন আর টিভির পর্দাই বলেন, ঢু মারলেই চোখের সামনে ভাসে ধর্ষণের খবর। দেশে চরম বললে ভুল হবে মহা চরম আকারে বাড়ছে ধর্ষণ। ছোট্ট শিশু থেকে বৃদ্ধা, কেউই রেহাই পাচ্ছে না ধর্ষণের কবল থেকে। ভোট না দেয়ায় গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রীকে ধর্ষণ, চাকরিরর প্রলোভনে ধর্ষণ, প্রেমিকাকে ধর্ষণ, ভাবিকে ধর্ষণ, ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ, যাত্রীকে র্ধষণ, চারদিকে শুধু ধর্ষণ, ধর্ষণ, ধর্ষণ। একেকটি ধর্ষণের সংবাদ পড়লে গা শিউরে উঠে। নাড়া দেয় বিবেককে। 

এ নিয়ে মনের অনুভূতিগুলো বেশ কয়েকদিন লিখব বলে কম্পিউটারে বসি। কিন্তু লিখতে গেলে কী-বোর্ডে হাত চলে না। চিন্তা করি কী হবে এসব লেখে? কে পড়বে আমার লেখা? আমার লেখাপড়েতো আর জ্রাগত হবে না নরপশুদের বিবেক। তারপর আবার চিন্তা করি নিজ অবস্থান থেকে আমাকেই রুখে দাড়াতে হবে। কারন আমার বোন আছে, আমার মা আছে। তারাতো নিরাপদ নয় এই নষ্ট সমাজে। আজ যদি আমি রুখে না দাড়াই তাহলে তার খেসারত দিতে হবে আমার বোনকেও। 

আমার রক্তভেজা বাংলার মাটি আবারো লাল হচ্ছে ধর্ষিতাদের রক্তে। ছোট্ট শিশু থেকে শতবর্ষী নারী কেউই রক্ষা পাচ্ছে না নরপশুদের লেলুপ দৃষ্টি থেকে। ধর্ষনের পর বর্বরভাবে হত্যা করা হচ্ছে। গ্রামের অক্ষরজ্ঞানহীন কৃষক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে হুজুর কারো কাছেই নিরাপদ নয় নারী। নিজ ঘরে, বাইরে এমনকি মজসিদ-মন্দির, স্কুল-কলেজ কোথাও নিরাপত্তা বোধ করতে পারে না নারীরা। 

এইতো তনু হত্যার দাগ কিছুটা হলেও আমাদের  কাটতে শুরু করেছিল আমাদের হৃদয় থেকে। কিন্তু তার আগে ধানের শীষে ভোট দেয়ায় নোয়াখালির সুবর্ণচরে গৃহবধুকে গণধর্ষণ করে আওয়ামী লীগ নামদারি অতি উৎসাহী কিছু কর্মীরা। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানীর অভিযোগ আনায় ফেনীর সোনাগাজিতে মাদ্রায় কলেজছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, নারায়নগঞ্জে মাদরাসা সুপারের বিরুদ্ধে ১২ শিক্ষার্থী ধর্ষণের অভিযোগ, রাজধানীর ওয়ারীতে ৭ বছরের শিশু সায়মাকে ধর্ষণ করে হত্যা নাড়িয়ে দিয়েছে দেশবাসীর বিবেক। 

নেত্রকোনার আঠারবাড়ির এক মাদরাসার শিক্ষক আবুল খায়ের। যার বয়ান শোনতে নামাজের এক ঘন্টা আগে মুসল্লিরা হাজির হতেন। সেই হুজুর গত ১ বছরে ধর্ষণ করেছে ৬ শিশুকে। যাদের বয়স ৮ থেকে ১১ বছর। ধর্ষনের পর অপবিত্র অবস্থায় ধর্ষিতা শিশুকে পবিত্র কোরআন শরীফ স্পর্শ করিয়ে প্রতিজ্ঞা করাতো যেনো এই লোমহর্ষক ঘটনা কাউকে না বলে! মানুষের কতটা অধঃপতন হলে এ কাণ্ড করতে পারে একটু চিন্তা করুন।

এসব বললাম আলোচিত ধর্ষণের কথা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের হিসেবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৩৯৯ জন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর একজন ছেলে শিশুসহ মোট ১৬জন শিশু মারা গেছে। ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি এই তথ্য পেয়েছে।

অপরদিকে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের হত্যা ও নির্যাতনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক বেড়েছে। গত ছয় মাসে ৮৯৫ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে যৌন হয়রানিসহ নানা কারণে ১০৪ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, ৪০ জন আত্মহত্যা করেছে। গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৯ জন শিশু। গত দুই সপ্তাহে দেশে কমপক্ষে ১৫টি যৌন অপরাধ ঘটেছে যার বেশিরভাগ ঘটনার শিকার শিশুরা।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে দুই হাজারের বেশি নারী ও মেয়েশিশু নির্যাতনের শিকার হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩১ জন। গণধর্ষণ, ধর্ষণের পরে হত্যাসহ অন্যান্য নির্যাতনের হারও অন্য সময়ের চেয়ে বেশি। 

এসব ধর্ষণের খবর উঠে এসেছে পত্রিকার পাতায় কিংবা আইনের শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ পর্যন্ত। কিন্তু আরও অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা কেবল ধর্ষকের সামাজিক ও রাজনৈতিক দাপটের জোরে প্রকাশিত হয় না। ধর্ষণের মামলা হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে  নারী ও শিশু ধর্ষণ সংক্রান্ত ১৭ হাজার ২৮৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ভিকটিমের সংখ্যা ১৭ হাজার ৩৮৯ জন। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জন নারী ও তিন হাজার ৫২৮জন শিশু। তিন হাজার ৪৩০টি ধর্ষণ মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় ১৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৮০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫৭৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাসহ ৬৭৩ জনকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। 

এ পরিসংখ্যান মতে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার ধর্ষণ মামলার ঘটনায় সাজা পেয়েছেন মাত্র এক হাজার ৩৪৬ জন। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি মামলা ধোপে টেকেনি। ধর্ষিতা প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি ধর্ষিত হয়েছিলেন। সুতরাং সাজা হয়নি আসামির।

আসামি ধর্ষণ করেনি এমন প্রমাণের ভিত্তিতেই ছাড়া পেয়ে গেছে। ধর্ষিতা কিন্তু সমাজ ও সংসারের চোখে ধর্ষিতা হয়েই বেঁচে আছেন। কোথায় কেমন আছেন সেই তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে যতগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তার প্রায় ৭০ শতাংশ বিচারের দ্বার পর্যন্ত আসে না। আমাদের সমাজের বিভিষীকাময় আচরণের কাছে বেশিরভাগ পিতামাতা ও স্বজন লুকিয়ে ফেলেন ধর্ষণের ঘটনা। এমনটাই ঘটে এসেছে। প্রকাশ্য কোনও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে হয়তো এভাবেই লুকিয়ে থাকতে হবে ধর্ষিতাকে।

আইনের মারপ্যাচে খালাস পেয়ে যান অপরাধীরা। যেমনটা পেয়েছে শরীয়তপুরের কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণ মামলার একমাত্র আসামী পৌরসভার মেয়র পূত্র মাসুদ বেপারী। ধর্ষণের মাত্র ৮দিনের ব্যবধানে আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পায় সে। আসামীর জামিন প্রাপ্তির পর আতংকিত হয়ে পরেছে ধর্ষিতা মেয়েটির দরিদ্র পরিবার।

ফেসবুকে দেখলাম নিজেদের নিরাপত্তার দাবিতে মঙ্গলবার রাজপথে নেমেছিল শিশুরা। তাদের হাতে প্লেকার্ডে লেখা ‘শিশু সামিয়া আফরিন হত্যকারীদের ফাঁসি চাই’, ‘আঙ্কেল প্লিজ ডোন্ট রেপ মি’ এরকম অনেক স্লোগান। আমরা কতটা অসহায়, কতটা ভোঁতা আমাদের বিবেক, কতটা অকার্যকর আমাদের শাসনব্যবস্থা তা এসব দৃশ্য দেখলেই বুঝা যায়। 

ধর্ষণ বন্ধ করতে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নানা মন্তব্য করেছেন। তবে আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগে শিক্ষামন্ত্রী দিপু মনির মন্তব্য। তিনি বলেন, যে দেশে ধর্ষকের পক্ষে উকিল পাওয়া যায়! সেই দেশ ধর্ষণ মুক্ত হবে কি করে। হ্যা, যতদিন ধর্ষকের পক্ষে আদালতে উকিল পাওয়া যাবে ততদিন দেশ ধর্ষকমুক্ত হবে না। যতদিন ধর্ষকদের বিচারে প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোরতম না হবে, বিচার প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা আনা না হবে ততদিন ধর্ষণ বন্ধ হবে না। 
 
এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকে অজ্ঞতা আর সামাজিক মর্যাদা হানির আশঙ্কায় আদালত বা পুলিশের দোড়গোড়ায় পৌঁছাচ্ছেন না। ফলে এসব অপরাধ ঘটছেই। এছাড়াও শিশু নির্যাতন বা নিপীড়ন বা ধর্ষনের মতো অপরাধ করে সহজে জামিন পাওয়া গেলে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। পাশাপাশি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধের যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেটাও যথার্থ নয়। তাই আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি দরকার সামাজিক সচেতনতা ও মূল্যবোধ বৃদ্ধি।

পৃথিবীর নানা দেশে ধর্ষণের নানা মাত্রার শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে দেখা যাচ্ছে যে, যেসব দেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড সে সব দেশে ধর্ষণের হার অনেকাংশে কমে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তি সুনির্দিষ্ট নয় এবং ধর্ষিতাকে হত্যা করা না হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও নেই। ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ বন্ধ করতে হলে অবশ্যই ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান চালু করা দরকার। আসুন সবাই নিজের বোনের জন্য, নিজের মেয়ের, স্ত্রী কিংবা মায়ের নিরাপত্তার জন্য এক কাতারে দাড়াই। রুখে দাড়াই ধর্ষণের বিরুদ্ধে। কারন এ ধর্ষণের উপত্যকা আমার বাংলাদেশ নয়। 

লেখক: সাংবাদিক
ই-মেইল : selimnews18@gmail.com


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।