শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

নেপথ্যে অবজ্ঞা, টোপ আর সুবিধাবাদ

একে একে খসে পড়ছে বিএনপির অলংকার

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার ০৪:৫০ পিএম

একে একে খসে পড়ছে বিএনপির অলংকার

ঢাকা : বহুদলীয় রাজনীতির বন্ধ কপাট খুলেছিলেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালের জাগদল থেকে যাত্রা শুরু করেছিল বিএনপি। নতুন দল অলংকৃত করতে সংগ্রহ করা হয়েছিল দেশের সেরা মেধাবীদের।

সে তালিকায় ছিলেন সুশীল, শিক্ষক, আমলা, চিকিৎসক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী নেতাসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। দিনে দিনে মেধাবীর সারি বেড়েছিল। মেধালংকারে সজ্জিত হয়েছিল ডান-বাম মিলে মধ্যপন্থি এ দলটি। কালের আবর্তে শাসকদের টোপ, শীর্ষ নেতার অনাদর-অবজ্ঞা আর ব্যক্তি সুবিধার প্রাধান্য-এই তিন কারণে খসে পড়ছে বিএনপির সেই অলংকার।

জিয়াউর রহমানের সংগ্রহ করা এবং নিজগুণে গুণান্বিত ডজন খানেক নেতা ইতোমধ্যে বিএনপি থেকে সরে গেছেন বা দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বিএনপির বটগাছ খালেদা জিয়ার অবর্তমানে আরো ডজন খানেক ওই সহকর্মীর পথ অনুসরণ করছেন।

কেউ দলত্যাগ করেছেন, কেউ সিদ্ধান্ত নিয়েছে অনেকেই ভাবছেন। চূড়ান্তে যাওয়ার আগে তারা হিসাব-নিকাশ করছেন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে। বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনার ঝড় বইছে।

রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে না পারলে দলটির অবস্থা করুণতর হতে পারে। নিজেকে সামলে নিতে জৌঁলুসপূর্ণ রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের দিকে তাকানোর জন্য বিএনপির প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বিএনপির জন্য এখন দুঃসময় যাচ্ছে। নেতাদের দু-একজন চলেও যাচ্ছে। এটা অবশ্যই ভালো দিক না। বিষয়টি নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে বলে জানান তিনি।  

এদিকে খ্যাতনামা নেতারা একে একে দলত্যাগে বিএনপিকে ভাবিয়ে তুলেছে। দলের ভাইস-চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তবে দু-একের মধ্যে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে।

পদত্যাগকারী একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা ঘরে-বাইরের কথা কাছে বলেছেন অকপটে। তারা বলেন, জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ডাকা সাড়া দিয়েছিলেন। ডানের বাম, বামের ডানপন্থি মতাদর্শের নেতাদের নিয়ে গঠন করেছিলেন বিএনপি।

তাতে মতামত দেওয়া, প্রতিবাদ করা এমনকি ভিন্নমত গ্রহণ করতেন জিয়াউর রহমান। দুনিয়া থেকে জিয়া সরে গেলেও তার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিএনপিতে। জিয়ার মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল দলটিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন ওই সব মেধাবীরা। চলমান ধারায় আঁচড় লাগে খালেদা জিয়া বিএনপির কাণ্ডারি হওয়ার দুই যুগ পর।

দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আরেক মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমান, জিয়ার আরেক ঘনিষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) অলি আহম্মেদ বীর বিক্রমসহ বাঘা বাঘা নেতা অপসারিত হন বিএনপি থেকে।

শুধু অপসারণই নয়, লাঞ্ছিতও হতে হয়েছে তাদেরকে। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আসে ওয়ান ইলেভেন (১/১১)। এ সময় কিছু নেতা নিজেদের পাপে তৎকালীন সেনাশাসিত সরকারের চাপে বিপথগামী হন। অবস্থান নেন সংস্কারপন্থি হিসেবে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকেই মাইনাসের ফাঁদ আটে, ভেস্তেও যায়। বাইরের দাগ শুকালেও মনের ক্ষতরেখা থাকে বিদ্যমান।

এদিকে সংগৃহীত ব্যক্তিদেরকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। দলও একাধিকরার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। পদধারী ওইসব নেতা রাষ্ট্র ক্ষমতার সর্বোচ্চ সুবিধা গ্রহণ করে। জলে-স্থলে বনে-জঙ্গলে হেন কোনো সুবিধা নেই তারা গ্রহণ করেননি।

অন্যদিকে বিএনপি যতবারই রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থেকেছে, তখনই ওই মেধাবীরা আত্মরক্ষায় বিকল্প পথ খুঁজেছেন। অবস্থান নিয়েছেন দলের বিপরীতে। অবশ্য বিএনপির অপরাপর নেতারা তাদের সুবিধাভোগী ও অরাজনৈতিক ব্যক্তি খেতাব দিয়ে দূরে ঠেলেছে।

গত এক যুগে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিএনপির আলোচিত নেতারা দল ছেড়েছেন। নেপথ্যের কারণ দেখিয়েছেন দলীয় শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তাদের প্রতি অনাদর-অবজ্ঞা আর বিএনপির রাজনীতিকে কলুষিত করার।

বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেছেন এম মোরশেদ খান। তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতি এখন আর রাজনীতি নেই। এরা স্কাইপের মাধ্যমে রাজনীতি করতে চায়। এটি করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়।

শুধু বিএনপি নয়, আমি আর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই থাকব না। সব ধরনের রাজনীতি থেকে অবসর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর আগে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন সিলেটের ইনাম আহম্মেদ চৌধুরী। তার অভিযোগ দল তার প্রতি অবিচার করেছে।

খালেদা জিয়াবিহীন বিএনপিতে যারা পরিচালকের আসনে আছেন তাদের সঙ্গে আর যাই হোক রাজনীতি করা যাবে না বলেই দলত্যাগ করেছেন তিনি। সাবেক সেনাপ্রধান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমানও রাজনীতি থেকে অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ কথা তিনি জানিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতাদের।

এর আগে ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী দল থেকে পদত্যাগ করেন।

পদত্যাগপত্রে শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, সম্পূর্ণ শারীরিক কারণে আমি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছি। আমি বাইরে যেতে পারি না, আমার চলাফেরার মধ্যে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

অবস্থায় রাজনীতি করতে হলে যে ধরনের শ্রম, সময় দেওয়া প্রয়োজন, সেটা আমার পক্ষে শারীরিক কারণে সম্ভব হচ্ছে না। তবে পদত্যাগের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের আদর্শ থেকে বিএনপি এখন অনেকটাই দূরে।

২০১৬ সালের ৬ আগস্ট বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন দলের ভাইস-চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী ফালু। নতুন কমিটিতে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মনোনীত করায় খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফালু পদত্যাগপত্রে লেখেন, ‘সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও শারীরিক কারণে আমার পক্ষে ওই পদে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। তাই নতুন কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একইভাবে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেছেন পারটেক্স গ্রুপের কর্ণধার এম এ হাসেম।

শহীদ জিয়ার ঘনিষ্ঠখ্যাত মাহবুবুর রহমান ও বিএনপির বড় দাতা এম মোরশেদ খানের পদত্যাগের পর অনেকেই এ ধরনের সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে চাউর রয়েছে।

এ তালিকায় উঠে আসছে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মেজর (অব.) শাহজাহান ওমর, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল নোমানসহ অন্তত আরো ডজন খানেক নেতার নাম।

এ প্রসঙ্গে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের তো পদই নাই। পদত্যাগ করব কোথা থেকে। ৩৫ জন সহ-সভাপতি। এর মধ্যে আমি মাত্র একজন। এ পদ থাকা থাকা আর না থাকা একই কথা।

সোনালীনিউজ/এমটিআই