বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬

এক সময়ের খরস্রোতা নদী এখন মরা খাল

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, বুধবার ০৫:০৪ পিএম

এক সময়ের খরস্রোতা নদী এখন মরা খাল

ছবি : সোনালীনিউজ

দিনাজপুর : জেলার ফুলবাড়ী উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরস্রোতা শাখা যমুনা নদীটি এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীর তলদেশ ভরে উঠেছে, সে কারণে বছরের বেশি ভাগ সময় এ নদীতে পানি থাকে না, কিছু কিছু জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে, নদীর বুক চিরে পুরোদমে চলছে চাষাবাদ। অথচ এক সময় এই নদীই ছিল এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র উৎস, এখন সে সব শুধুই স্মৃতি।

ফুলবাড়ী উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া এই শাখা যমুনা নদীটি, দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার বিন্যাকুড়ি নামক স্থানে ইছামতি নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে জেলার ফুলবাড়ী, উপজেলা হয়ে, জয়পুরহাট জেলার সদর উপজেলা দিয়ে নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার ত্রিমোহনী যমুনা ও আত্রাই নদীতে মিলিত হয়েছে।

দিনাজপুর পানি উন্নায়ন বোর্ড জানিয়েছে, আঁকা-বাঁকা পথে এই নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে তিন’শ কিলোমিটার, এর মধ্যে ফুলবাড়ী উপজেলায় রয়েছে প্রায় ২০ কিলোমিটার। এই নদীটি এক সময় এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে একমাত্র মাধ্যম ছিল। এই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নদির তীরে গড়ে উঠেছে শহর এবং হাজারো বসতি।

এই নদীর পানি দিয়ে এক সময় চলতো এই অঞ্চলের কৃষকের চাষাবাদ ও ঘর-গৃহস্থালীর কাজ। এই নদীর মাছ দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের মাছের চাহিদা পূরণ হতো, জীবিকা নির্বাহ করতো অনেক জেলে সম্প্রদায়েরা, সেই নদীটি এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীটি দীর্ঘ সময় সংস্কার না করায়, প্রতিবছর বন্যায় নদীর তলদেশে পলি জমে নদীটির নাব্যতা হারিয়ে যাচ্ছে, নদীর পাড় দখল করে অনেকে গড়ে তুলেছে দালান কোটা, নদীতে ফেলছে ময়লা আবর্জনা নদীকে করছে দূষণ।

সরজমিনে দেখা যায় নদীটিতে বছরে বেশির ভাগ সময় পানি থাকে না, নদীর বুক চিরে এখন বিভিন্ন রকমের ফসল চাষাবাদ করা হচ্ছে। ফসল উৎপাদন করতে নদীর পাড় কেটে জমি তৈরি করছে অনেকে, এই কারণে বন্যা আসলেই নদীতে পালির স্তর আরো বেশি করে জমে যাচ্ছে। এক সময় কৃষকরা নদীর পানি দিয়ে চাষাবাদ করলেও, এখন নদীতে পানি না থাকায় সেচ পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কৃষকদের। নদী পাড়ের বাসিন্দারা বলছেন নদীতে পানির ধারণক্ষমতা না থাকায়, বর্ষাকালে অল্প বৃষ্টিপাতে বন্যা হয়ে যায়, নদীর পানি ঘরবাড়িতে প্রবেশ করে। এতে করে প্রতিবছর বন্যার সময় ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়।

নদীপাড়ের কৃষকরা বলছেন, নদীতে পানি না থাকায় সেচ পাম্প দিয়ে চাষাবাদ করতে হচ্ছে, এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে তাই নদীটি দ্রুত খনন করা প্রয়োজন। তারা আরো বলেন, নদীটি সময় মতো সংস্কার করা না হলে এক সময় বিলীন হয়ে যাবে এ নদী, তাই দ্রুত সংস্কার করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও সমাজের সচেতন মানুষ। নদী পাড়ের বাসিন্দা চাঁদপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, এই নদীটির এক সময় প্রাণ ছিল সারা বছরে নদীতে পানি ছিল এই নদীর পানি দিয়ে ঘর-গৃহস্থালীর কাজ ও জমির সেচ কাজ চলতো। এখন নদীতে পানি না থাকায় সেচপাম্প বসিয়ে পানি সেচ দিতে হচ্ছে এতে করে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে, একই কথা বলেন, চাদপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ইউনুছ আলী।

নদী বাঁচাও আন্দোলনের ফুলবাড়ী নেতা পল্লী চিকিৎসক ওয়াজেদুর রহমান বাবলু বলেন, নদীর স্বাস্থ্য ভালো থাকলে দেশের স্বাস্থ্য ও মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকে, নদীর স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেলে, দেশের স্বাস্থ্য ও মানুষের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। এখন নদীর স্বাস্থ্য ভালো নাই দেশে ও মানুষের স্বাস্থ্যও ভালো নাই। তিনি বলেন, আমাদের প্রকৃতি জীববৈচিত্র্য সবেই নির্ভর করে নদীর ওপর, তাই নদীকে বাঁচাতে হবে, এই জন্য তিনি নদীটিকে উদ্ধার করার জন্য জোর দাবি জানান।

এদিকে উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, নদীতে পানি না থাকায় দেশী প্রজাতির মাছের বংশ হারিয়ে যাচ্ছে, উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী সাধু পানিতে ২০১ প্রকার প্রজাতির মাছ থাকলেও, এই অঞ্চলে প্রায় ৫০ প্রকার মাছ আর দেখা যায় না।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোছা. মাজনুন্নাহার মায়া বলেন, ২৬৫ প্রকার প্রজাতির মাছ সাধু পানিতে থাকে, এর মধ্যে এখন সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০১ প্রকার মাছের বংশ রয়েছে, এর মধ্যে এই অঞ্চলে প্রায় ৫০ প্রকার প্রজাতির মাছ আর দেখা যায় না, বাকি মাছগুলো চাষের মাধ্যমে বংশ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নদীতে সারা বছর পানি না থাকায় দেশি প্রজাতির মাছের বংশ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুস সালাম চৌধুরী বলেন, নদীর পানির বহমান রক্ষা করার জন্য সরকার কাজ শুরু করে দিয়েছে, তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এই প্রকল্পটি এই উপজেলাতেও শুরু হবে, এই প্রকল্পটি এই উপজেলায় শুরু হলে এই শাখা যমুনা নদীটির সংস্কার করা হবে।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/এইচএআর