বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬

ইতিবাচক কাজের সাফল্যকে ম্লান করে দেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা

এখনো জনবান্ধব নয় পুলিশ

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৯, সোমবার ০১:৪৭ পিএম

এখনো জনবান্ধব নয় পুলিশ

ঢাকা : পুলিশকে জনবান্ধব করে তুলতে সরকারের ইচ্ছা দীর্ঘদিনের। ইতোমধ্যে সে প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কিন্তু অনিয়ম-দুর্নীতি আর অসদাচরণের কারণে পুলিশকে এখনো বন্ধু মনে করে না সাধারণ মানুষ।

অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের পুলিশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি জনমনে গভীর শেকড় গেড়েছে। পুলিশের ভাবমূর্তি ইতিবাচক করতে হলে মহাপরিকল্পনার বিকল্প নেই। কারণ পুলিশের অনেক দিনের এবং অনেক ইতিবাচক কাজের সাফল্যকে ম্লান করে দিয়েছে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের নেতিবাচক কাজ।

এছাড়া পুলিশের মাঠপর্যায়ে কর্মরতদের বেশিরভাগই সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণ করে। এ অবস্থায় মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, কথা বলার বাচনভঙ্গি কেমন হবে সে ব্যাপারে আরো যথেষ্ট প্রশিক্ষণ ও ওরিয়েন্টেশন প্রয়োজন।

অভিযোগ আছে, থানার ওসিরাই এখন স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তারা সেবাপ্রত্যাশীদের সঙ্গে  যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছেন।

এলাকার ফুটপাতের হকার থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ওসিরা সরাসরি যোগাযোগ রাখেন। অথচ এক যুগ আগেও এ অবস্থা ছিল না। ওসিরা নিজেদের পারসোনালিটি বজায় রাখতেন। বর্তমানে ওসিরা প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পেলেও বেশিরভাগ ওসিই দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির মানসিকতা পোষণ করেন।

রোববার (১৮ আগস্ট) এক প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা মহানগরের এক থানার ওসি অকপটে বলেন, ‘আরে ভাই, আর বলবেন না। এই ডিপার্টমেন্ট ঠিক হতে সময় লাগবে আরো ৫০ বছর।’ এ সময় তিনি জনৈক সাব-ইন্সপেক্টরকে ধমক দেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ব্যবহার বিধি শেখান।

তিনি বলেন, ‘একটা মানুষ তোমার কাছে এসেছে আইনগত সহায়তা চাওয়ার জন্য। আইনগত সহায়তা দিতে পার আর না পার আগে তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার কর, মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনো। তাহলে পুলিশ সম্পর্কে ওই লোকটির নেতিবাচক মনোভাব থাকবে না। তোমাদের মতো দুর্ব্যবহারকারী পুলিশ সদস্যের কারণে গোটা বাহিনীর বদনাম হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার থানা এলাকায় একটি কারখানার বয়লার বিস্ফোরণে সম্প্রতি তিন শ্রমিক মারা গেছেন। আমার অফিসার আমাকে এসে বলল, স্যার কারখানা মালিকের সঙ্গে আপস রফা করে দিয়েছি। মালিক প্রত্যেক পরিবারকে ২ লাখ করে মোট ৬ লাখ টাকা দিতে রাজি হয়েছেন। আমি তাতে বাদ সাধি এবং কারখানা মালিককে শর্ত দিই ৫ লাখ করে  নিহত ৩ শ্রমিকের পরিবারকে ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। নইলে মামলা হবে, কারখানা মালিক জেলে যাবে। মালিক ১৫ লাখ টাকা দিতে রাজি হয়।

এরই মধ্যে অন্য এক থানার ওসি আমাকে ফোন করে বলেন, স্যার টাকার অঙ্কটা একটু কমানো যায় না? জবাবে আমি বললাম, কেন, কমালে কী হবে?

ওই ওসি বললেন, কমালে আপনার জন্য একটা ভালো অ্যামাউন্টের ব্যবস্থা করা যাবে। জবাবে বললাম, মিয়া, সব টাকাই খেতে হবে। এই টাকা দিয়া কী করবা। গরিব মানুষ দিনমজুরের পরিবার ৫ লাখ টাকা ব্যাংকে রাখলেও মাস শেষে একটা অ্যামাউন্ট পাবে।  সে বিব্রতবোধ করে ফোন রেখে দিল। এই হচ্ছে অবস্থা ভাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না। মানুষ  কেন পুলিশকে বন্ধু মনে করবে। আমরা হলি আর্টিজানের পর ভালো কাজ করেছি। সন্ত্রাস দমন ও আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নেও ইতিবাচক সাফল্য অর্জন করেছি। এসবই ম্লান হয়ে যায় যখন কতিপয় পুলিশ প্রকাশ্যে ঘুষ নেয়। জোরপূর্বক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে বলে।’

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, জবাবদিহিতার অভাবের জন্য আজ পুলিশের ইমেজ সংকট প্রকট। পুলিশ কেন, গোটা সমাজে আজ ‘আমিত্ব’ এক প্রকট সমস্যা, আমিই বড়, আমিই  শ্রেষ্ঠ, আমিই রাজা এবং নিজেকে  বেশ ক্ষমতাবান মনে করার যে প্রবণতা বা মনমানসিকতা বিভাগে দেখা যায় তা এ ডিপার্টমেন্টের জন্য ক্ষতিকর।

যে যত বড় দায়িত্বে থাক না কেন তার ব্যবহার, আচার-আচরণ ততই ভালো ও নমনীয় হতে হয়। এমনকি কাজ করতে গিয়ে ভুল করলে যদি তা অকপটে স্বীকার করার সাহস ও মানসিকতা  পোষণ না  থাকে কিংবা নিজেকে বড় ক্ষমতাবান মনে করে তাহলে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে ইমেজ সংকট  দেখা  দেবে। এ জন্য পুলিশ বিভাগের আধুনিকতার জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির  গুরুত্ব অপরিসীম।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ শতভাগ ঘুষমুক্তভাবে স্বচ্ছতার সঙ্গে করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতির উন্নয়ন হচ্ছে। পুলিশের গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে বাড়ছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, পুলিশকে জনবান্ধব করার লক্ষ্যে পুলিশের বিদ্যমান নানা সমস্যা সমাধান করা হয়েছে। পুলিশের প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। সরকার পুলিশ বাহিনীর জন্য ব্যয় করাটাকে বিনিয়োগ মনে করে। এ জন্য পুলিশের বাজেট দিন দিন বাড়ানো হচ্ছে। পোশাক, জুতা, বাসস্থান, যানবাহন, রেশন, সরঞ্জাম, আগ্নেয়াস্ত্র কোনো কিছুর ঘাটতি রাখা হচ্ছে না। এত সুযোগ-সুবিধার পরও পুলিশ কেন জনমনে আস্থা অর্জন করতে পারছে না।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি মোদাব্বির হোসেন চৌধুরী বলেন, মাঠপর্যায়ে কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনীকে আরো দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে আচার-ব্যবহার ভালো করা শেখাতে হবে।

তিনি আরো বলেন, সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার আশা করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর ব্যত্যয় ঘটে। ফলে সাধারণ মানুষ পুলিশকে বন্ধু ভাবে না।

সোনালীনিউজ/এমটিআই