রবিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৮, ৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫

ওই দেখেন ঘুষখোরের ছেলে যায়!

ফাহাদ মোহাম্মদ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার ০৪:২৫ পিএম

ওই দেখেন ঘুষখোরের ছেলে যায়!

পুলিশ সার্জেন্ট ফাহাদ মোহাম্মদ

সকালে হকার যখন পত্রিকা দিয়ে যাচ্ছিলো তখন আমার সরকারি মোটরসাইকেটা পানি দিয়ে ওয়াস করতেছিলাম। ফ্রেশ হয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে যখন পত্রিকাটি হাতে নিলাম তখন সামনে পৃষ্ঠায় দেখলাম তিন অঙ্গনের তিনি মহারথীর মৃত্যুর খবর। যদিও এর আগেই উনাদের মৃত্যুর খবর ফেসবুকে দেখেছি।

আসলে মৃত্যু এমন একটি সত্য যা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। আর মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হত তুমি কোন সত্যকে অস্বীকার করতে চাও? তখন হয়তো মৃত্যুকে অস্বীকার করে অমরত্ব লাভ করতে চাইবে। যে ব্যক্তি জান্নাতে যেতে চায় সেও মরতে চায় না। আজ হোক কাল হোক সবাইকেই মরতে হবে। আমরা আগামীর জন্য পরিকল্পনা করতে পারি। ৫ বছর পরে কি করবো সেটা পরিকল্পনা করে তার জন্য কাজ করতে পারি কিন্তু এই মূহুর্ত পরে আমি পৃথিবীর আলোবাতাস নিতে পারবো কি না তার নিশ্চয়তা দিতে পারবো না। মানুষর মৃত্যুই পৃথিবীর একমাত্র সত্য ও স্বাভাবিক। বেঁচে আছি এটা অস্বাভাবিক, সবকিছু কাকতালীয়।

আমরা অনেকেই অর্থের পিছনে ছুটতে গিয়ে জন্মের আসল উদ্দেশ্যই ভুলে যাই। জন্ম যদি শুধু নিজের জন্যই হয় তাহলে সেই জীবন জীবন নয়। আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিদের হয়তো সুখী মনে হতে পারে কিন্তু সে কখনই জীবনের আসল স্বাদ ভোগ করতে পারে না। সব সময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থেকে সে অন্যের আনন্দেও যে আনন্দ পাওয়া যায় সেটা ভুলে যায়। একটা অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোঁটানোর মধ্যে যে পৃথিবীর সমান আনন্দ পাওয়া যায় সেটা এই মানুষেরা জানে না।

বেঁচে থাকার জন্য অর্থের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। টাকাকে আর এমনিতেই দ্বিতীয় ঈশ্বর বলা হয় নি। কিন্তু এই টাকা পিছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ তার সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে। তার সততা, ন্যায়বিচার, বিবেক সবকিছু বিসর্জন দিয়েও টাকাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আমি একজম মানুষকে চিনি যিনি কয়েকশো কোটি টাকার মালিক ছিলেন। তিনি যখন মারা যান তখন উনার আত্মীয়রা উনার লাশ দাফনের আগেই সম্পত্তি নিয়ে ঝগড়া শুরু করেন। উনি সারা জীবন অর্থের পেছনে সময় ব্যয় করেছেন।

আপনি যদি অসৎ পথে অর্থ উপার্জন করে আপনার পরিবারকে লালন পালন করেন তাহলে এই পাপের ভাগ কেউ গ্রহণ করবে না। যারা এই পাপের ফল ভোগ করবে তারা হল আপনার সন্তান। আপনার পাপের টাকায় সে মানুষ হবে না। মদ খাবে, খারাপ পথে যাবে। তাহলে আপনি কার জন্য এই পাপ পথে পা দিবেন? নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার গল্প হয়তো অনেকেই জানেন, তবুও আমি আবার বলছি।

নিজাম উদ্দিন আউলিয়া ছিলেন একজন কুখ্যাত ডাকাত। তিনি প্রায় ১০০ টি খুন করেছিলেন। এমন কোনো খারাপ কাজ নাই যা তিনি করতেন না। তিনি তার পরিবারের ভরনপোষণ করতেই এসব খারাপ কাজে সম্পৃক্ত হন। একদিন এক দরবেশকে আটক করে তিনি তারা সব কিছু ছিনতাই করে তাকে যখন হত্যা করতে যাবেন তখন দরবেশ নিজাম উদ্দিনকে বলেন, আমাকে মারার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনি যে খুনখারাবি করে আপনার পরিবারের ভরনপোষণ করছেন আপনার পরিবারের সদস্যরা কি এই পাপের ভাগ নিবে? নিজামউদ্দিন বললেন অবশ্যই নিবে। দরবেশ বললেন, ঠিক আছে আমাকে গাছের সাথে বেধে আপনার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞেস করে আসুন তারা এই পাপের অংশীদার হবে কি না। নিজামুদ্দিন যখন বাড়িতে পৌঁছে তার মা কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি যে পাপ করে তোমাদের খাবার যোগান দিচ্ছি তোমরা কি আমার পাপের ভাগ নিবে?' উত্তরে তার মা বললেন, 'আমাদের খাবার যোগাড় করে দেওয়া তোমার দায়িত্ব ও কর্তব্য। তুমি কিভাবে সেটা করবে সেটা একান্ত তোমার ব্যপার। আমি কেন তার তোমার পাপের ভাগ নিবো?' নিজামউদ্দিন যখন একই প্রশ্ন তার স্ত্রী-সন্তানকেও করলেন তারাও একই উত্তর দিলো।

হতাশ হয়ে নিজামউদ্দিন আউলিয়া যখন দরবেশের নিকট আসলেন তখন দরবেশ বললেন, আপনি যা করেন তার পাপ কেবল আপনাকেই স্পর্শ করবে। আপনার সম্পদের ভাগ সবাই নিতে চাইবে কিন্তু পাপের ভাগ কেউ নিতে চাইবে না। তখন নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মনে প্রশ্ন জাগলো তাহলে এগুলো আমি কার জন্য করছি? সেই থেকে নিজামউদ্দিন আউলিয়া পাপ পথ ছেড়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা শুরু করলে। কেউ বলে গল্পটা সত্য আবার কেউ বলে মিথ্যা। কিন্তু এটা সত্য যে আপনার পাপের অংশীদার কেউ হবে না।

বাংলাদেশের মতো দুর্নীতির স্বর্গ রাজ্যে থেকে যদি কাউকে বলা হয় আপনি এই অন্যায় কাজটা করতে পারলেন? উত্তরে তিনি বলবেন সবাই করছে আমার করতে সমস্যা কোথায়? আবার আপনি যখন অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবেন তখন আঙ্গুল দিয়ে দেখাবে, ঐ যে দেখেন বেশি বুঝা লোক যায়। আবার কেউ বলবে, আপনি একটা বোকা লোক সবাই করছে আপনার করতে সমস্যা কোথায়? আপনার একার জন্য দেশ বদলাবে না। আসলেই আমার একার জন্য দেশ বদলাবে না। কিন্তু আপনার পরিবারের দিকে, আপনার সন্তানের দিকে কেউ আঙ্গুল তুলে বলতে পারবে না ' ঐ যে দেখেন চোরে ছেলে যায়, ঐ যে দেখেন ঘুষখোরের ছেলে যায়'।

মৃত্যুকে যদি আমরা একমাত্র সত্য ধরে নেই তাহলে কার জন্য আমরা অনিয়ম করি। কার জন্য আমরা দুর্নীতি করি। যারা আমার পাপের অংশীদার হবে না তাদের জন্য? আমি যদি আজ মারা যাই সকল পাপের জন্য পরকালে আমাকেই শাস্তি পেতে হবে। আমার পাপের জন্য আমার সন্তান বিপথগামী হবে। সমাজে আমার সম্মান নষ্ট হবে। তাই আমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমি কি চাই। আমি একা এসেছি একা যাবো। আমার কৃতকর্মের ফল আমাকেই ভোগ করতে হবে। তাই আমার মৃত্যুতে অন্তত মানুষ যেনো না বলে একটা খারাপ মানুষের বিদায় হল। জানি সকল মানুষের নিকট ভালো হওয়া সম্ভব নয়। তবুও যত পারা যায় মানু্ষের কল্যানে কাজ করে যেতে চাই।

লেখক-ফাহাদ মোহাম্মদ, ট্রাফিক সার্জেন্ট, বাংলাদেশ পুলিশ।


সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।