বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০, ৯ মাঘ ১৪২৬

ওরা সিভিটাও রাখেনি, বের করে দিয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার ১১:৩৩ এএম

ওরা সিভিটাও রাখেনি, বের করে দিয়েছে

ঢাকা: পাশা তালুকদার। আট বছর বয়সে গ্লুকোমায় আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টি হারান। তখন থেকেই লড়াই শুরু। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর লেখাপড়ার জন্য তাকে পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। তখনই তিনি উপলব্ধি করতে শেখেন যে, প্রতিবন্ধীদের জন্য জীবনটা মোটেও সহজ নয়। পদে পদে হোঁচট খেতে হচ্ছিল তাকে।। এরপর লেখাপড়া শেষে চাকরির জন্য অপেক্ষা।

‘এ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা একেবারেই সুখকর ছিল না’,মন্তব্য করেন রিফাত পাশা। বলেন, ‘তবে দিন বদলেছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা এখন অন্য প্রতিবন্ধীদের অধিকারের নিয়ে কথা বলতে পারছেন।’

নিজের বিষয়ে রিফাত বলেন, ‘আমি যখন গ্লুকোমা সমস্যার কারণে দৃষ্টি হারাই, তখন দৃষ্টিহীনদের জন্য বিভিন্ন এনজিও স্কুল করেছিল বটে, কিন্তু সেগুলো ছিল ঢাকার বাইরে। হঠাৎ করে চোখের আলো হারিয়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লেখাপড়া শিখতে হয়েছে। আমার জন্য প্রথম ধাক্কাটা ছিল ভয়ঙ্কর। আত্মীয়স্বজন  ভেবেছিল— যেহেতু আমি অন্ধ হয়ে গেছি, তাই আমাকে দিয়ে আর কিচ্ছু হবে না, প্রচলিত লেখাপড়াতো দূরের কথা।’

রিফাতের ভাষ্য, ‘যেহেতু মাদ্রাসার লেখাপড়ায় তেমন ঝামেলা নেই, তাই আমাকে সেখানেই ভর্তি করানো হোক— আত্মীয়রা প্রায় সবাই জোর দিয়েই এমনটা বলেছিলেন। তারা হয়তো আমার কথা চিন্তা করেই বলেছিলেন। কিন্তু আমার মা সেটা মেনে নেননি।’ রিফাত জানান,তার মা অন্য দুই সন্তানকে যেভাবে পড়াশোনা করাচ্ছিলেন  রিফাতের জন্যও সেভাবেই চিন্তা করেন। পরিবার থেকে দূরে থাকতে হলেও মায়ের আগ্রহ ও পরামর্শে রিফাত বেছে নেন প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি। মাধ্যমিক পাস করলেন তিনি। এরপর আবারও হোঁচট খেলেন। বললেন, ‘সরকারিভাবে মাধ্যমিক পর্যন্ত ব্রেইল বই পাওয়া গেলেও উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে পাইনি। আমি নিজে ব্রেইল বই তৈরি করে লেখাপড়া করেছি।’

নিজের চেষ্টা ও ইচ্ছাশক্তিতে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন রিফাত। এ বিভাগে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে রিফাতই প্রথম  লেখাপড়ার সুযোগ পান। এরপর আবারও যুদ্ধের শুরু। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ভর্তি হয়েছি, তখন শ্রুতি লেখক নিয়ে ভীষণ ঝামেলায় পড়েছি। সব সময় চেয়েছি নিজের পরীক্ষা আমি নিজেই দেবো, কিন্তু সেটা পারিনি। আরেকজনকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানোটা ছিল ভীষণ ঝামেলার। শ্রুতি লেখক পাওয়া যাচ্ছিল না। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি এই ভোগান্তিতে ছিলাম’, বলেন রিফাত পাশা। 

এভাবেই শিক্ষাজীবন শেষ করেন রিফাত। যেহেতু ভালো সাবজেক্ট নিয়ে লেখাপড়া করেছেন, ভালো একটি চাকরির আশাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার এই ভাবনা ছিল বৃথাই। ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছেন তিনি।

রিফাত বলেন, ‘কত মানুষ কত কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে জীবনটা ভীষণ কঠিন। চার বছরে কত শত জায়গায় গিয়েছি। অনেক প্রতিষ্ঠিত দেশি-বিদেশি এনজিও-তে গিয়েছি।

কিন্তু কোথাও চাকরি হয়নি। এমনকি বড় একটি পত্রিকা অফিসে গিয়ে সিভি পর্যন্ত দিতে পারিনি। খুব অপমান করে আমাকে বের করে দেন তারা।’

পত্রিকা অফিসে কেন গিয়েছিলেন জানতে চাইলে রিফাত বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, পত্রিকা অফিসে অনেক সুযোগ থাকে। তারা যদি আমার সিভিটা কোথাও দিতে পারে। আমি বলতে গিয়েছিলাম— সিভিটা রাখেন। যদি কেউ আসে (ডাকে) তাহলে একটু দেবেন। আমাকে সেই সুযোগটুকুও তারা দেয়নি। ভীষণ অপমান করে আমাকে বের করে দিয়েছে।’

২০১৫ সালে রিফাত পাশা তালুকদার যোগ দেন ডব্লিউবিবি (ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ ) ট্রাস্ট নামের এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। ‘এনসিওর আওয়ার রাইটস’ নামে একটি প্রজেক্টের অ্যাসিসট্যান্ট প্রজেক্ট অফিসার হিসেবে কাজ করছেন রিফাত। বললেন, ‘অফিসের সবাই যেমন আমাকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। তেমনই আত্মবিশ্বাসী আমি নিজেও।’

প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করতে গিয়ে রিফাত কেবল অফিসেই বসে থাকেন না। প্রতিবন্ধীদের যেকোনও অধিকার আদায়ে তিনি রাস্তায়ও নেমে আসেন। রিফাত বলেন, ‘গত জুলাইয়ে যখন দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে ঢাকার তিন রাস্তার রিকশা বন্ধ করে দেওয়ার কথা ঘোষণা দেয়, তখন প্ল্যাকার্ড হাতে প্রেস ক্লাবের সামনে একাই দাঁড়িয়ে ছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘মগবাজার থেকে ধানমন্ডিতে যাই রিকশায় করে। আমাদের দেশের পাবলিক পরিবহন কেবল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কেন, কোনও প্রতিবন্ধীবান্ধব না,। হেঁটে যে চলাফেরা করবো, রাস্তাগুলোতে সে উপায়ও নেই। তাই আমাকে রিকশাতেই  যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু রিকশা বন্ধ হয়ে গেলে, আমার পক্ষে চলাফেরা করা সম্ভব হবে না।  সেজন্য রিকশা বন্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমি আমার মত জানিয়েছিলাম। পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন অনেকটাই সরে এসেছে।’

সোনালীনিউজ/এইচএন