শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

ওয়াসায় দুর্নীতির ১১ উৎস চিহ্নিত করেছে দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৮ জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার ১১:১৭ পিএম

ওয়াসায় দুর্নীতির ১১ উৎস চিহ্নিত করেছে দুদক

ঢাকা : দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ঢাকা ওয়াসায় দুর্নীতির সম্ভাব্য ১১ উৎস চিহ্নিত করেছে। এসব দুর্নীতি নিরসনে দেওয়া হয়েছে ১২ সুপারিশ।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান এ প্রতিবেদন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেন।

এ সময় সাংবাদিকদের দুদক কমিশনার জানান, দুদক ২০১৭ সালে দেশের ২৫টি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান আইন ও বিধি-বিধানের পদ্ধতিগত ত্রুটি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবসহ বিবিধ কারণে যেসব দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি হয় তার উৎস চিহ্নিত করে সেগুলো বন্ধ বা প্রতিরোধে পৃথক ২৫টি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে।

কমিশন ইতোমধ্যে ১৩টি প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করেছে। ওয়াসার প্রতিবেদনটি ১৪তম জানিয়ে মোজাম্মেল হক বলেন, এ প্রতিবেদনে দুর্নীতির ১১টি সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করে তা নিরসনে ১২টি সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে এ প্রতিবেদন করা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিশনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত টিমের প্রতিবেদন এটি। টিম বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

‘সরকারের প্রতিটি সংস্থাকেই সমন্বিতভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। এ জাতীয় প্রতিবেদন মূলত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি প্রতিরোধে আরও সংবেদনশীল করে তুলবে,’ যোগ করেন মোজাম্মেল হক।

প্রতিবেদন গ্রহণকালে মন্ত্রী তাজুল ইসলাম দুদকের এ জাতীয় কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, দুর্নীতি দেশের অর্থনীতিসহ সকল প্রকার অগ্রযাত্রার প্রতিবন্ধক। তাই মন্ত্রণালয়ের কোনো স্তরেই দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না।

‘কমিশনের এ প্রতিবেদন আমলে নিয়ে কর্মকর্তাদের কোনো প্রকার গাফিলতি কিংবা শৈথিল্য আছে কি না তা চিহ্নিত এবং সে মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে,’ যোগ করেন তিনি।

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রজেক্টের টাইমলাইন ও বাস্তবায়ন নিয়ে মিটিং করি। কয়েক দিন আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের সব পিডিকে নিয়ে মিটিং করেছিলাম। সেখানে ২৩টি প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি অসন্তোষজনক, আমি প্রত্যেকটি পিডিকে দাঁড় করিয়ে তাদের বক্তব্য শুনেছি, কারণগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য বলেছি।’

তিনি বলেন, ‘একজন পিডি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারার কারণে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকল্প থেকে প্রত্যাহার করে আরেকজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

দুর্নীতির উৎস : দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়। এক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হয় না বলে জনশ্রুতি আছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

মিরপুর এলাকায় পানির চাহিদাপূরণে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা হ্রাসকরণ প্রকল্প, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে নেয়া অন্তর্বর্তীকালীন পানি সরবরাহ প্রকল্প, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেইজ-৩) প্রকল্প, পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার (ফেইজ-১) প্রকল্প, ঢাকা এনভায়রনমেন্ট সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্প, ঢাকা মহানগরীর আগারগাঁও এলাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প, ঢাকা পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেন দুদক কমিশনার। এ ছাড়া ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্পের পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচন; ব্যক্তিমালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায় এবং ওয়াসা কর্মচারীদের ওভারটাইম বিলে দুর্নীতি হচ্ছে বলেও জানান মোজাম্মেল হক খান।

সুপারিশ : ঢাকা ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি বা অর্থ অপচয় রোধে বিভিন্ন প্রকৌশল সংস্থার অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর সমন্বয়ে যৌথ পরিমাপ টিম ও মনিটরিং টিম গঠন করা যেতে পারে। প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরির সময় কাজের যথার্থতা ও উপযোগিতা আছে কিনা-তা ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত হতে হবে এবং বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যাতে অহেতুক না বাড়ানা হয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি আরোপ করা প্রয়োজন। দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কমিটিতে দাতা সংস্থার প্রতিনিধিসহ টেন্ডার ও ক্রয়কার্য যথাযথ হচ্ছে কিনা-তা মনিটরিং করার জন্য মন্ত্রণালয় ভিত্তিক শক্তিশালী টিম গঠন করা যেতে পারে।

প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের সময় ওয়াসার ঊধ্র্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার প্রকল্প পরিদর্শনসহ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা যেতে পারে। ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের আগে সুনিশ্চিত হতে হবে যে, দরপত্রের শর্তানুযায়ী ঠিকাদার প্রকল্প কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করেছেন। এ ছাড়া ঠিকাদার যতটুকু কাজ করছেন তার গুণগত মান যাচাই করে বিল পরিশোধ করা যেতে পারে।

ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ওয়াসার ম্যানুয়াল পদ্ধতির ব্যবহার পরিহার করে সহজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে মিটার রিডিংয়ের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। অবৈধ ওভারটাইম বিল রোধে ঢাকা ওয়াসার কর্মচারীদের জনবল কাঠামো সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন এবং বেতনের সাথে ওভারটাইম বিলের সমন্বয়সাধনসহ সুর্নিদিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। প্রকল্পকাজ বাস্তবায়নের জন্য ঢাকা ওয়াসার কাজে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যেমন : ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, সওজ, বিদ্যুৎ বিভাগ ইত্যাদির সঙ্গে সুষ্ঠু সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন। ঢাকা ওয়াসার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে গণমাধ্যম, দুদক, অডিট ডিপার্টমেন্টসহ নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে সেবা গ্রহিতাদের নিয়ে ঢাকা ওয়াসায় মাঝে মাঝে গণশুনানির আয়োজন করা যেতে পারে। ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নাধীন অবস্থায় বিভিন্ন প্রকৌশলী সংস্থার বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত সার্ভিলেন্স টিমের আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে।

বিভিন্ন প্রকার ক্রয়ে প্রতিযোগিতামূলক প্রকাশ্য বা ই-টেন্ডারিং, দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ সিনিয়র কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বুয়েটসহ অন্যান্য পেশাদার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে বলেও সুপারিশ দিয়েছে দুদক।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue