শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬

করের টাকায় অবৈধ সুযোগ

বিশেষ প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২১ মে ২০১৯, মঙ্গলবার ১২:২২ পিএম

করের টাকায় অবৈধ সুযোগ

ঢাকা : জনগণের করের টাকায় সমাজের ধনী শ্রেণিকে অবৈধ আয়ের সুযোগ করে দিচ্ছে সরকার। সঞ্চয়পত্রে উচ্চ সুদ দিয়ে এই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আর এতে সরকারের বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর মাত্র ৫ শতাংশ যাচ্ছে সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে। আর ৯৫ শতাংশ অর্থ যাচ্ছে বিত্তশালীদের হিসাবে। অথচ রাজনৈতিক বিবেচনা আর ভুল তথ্যে সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদ হার কমাচ্ছে না, যা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যাংকিং খাতে।

সূত্রে জানা গেছে, সমাজের সাধারণ মানুষ সুবিধা পাচ্ছে বিবেচনায় সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদ হার কমাতে চায় না। আসন্ন বাজেটেও এর সুদ হার কমানো হবে না বলে এরই মধ্যে ইঙ্গিত করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বর্তমানে সঞ্চয়পত্রগুলোর মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে সুদহার ১১ দশমিক ৫২, পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ২৮, তিন বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক শূন্য ৪ এবং তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঞ্চয়কারীর ব্যাংক হিসাব নম্বর, মোবাইল ফোন নম্বরও দিতে হবে। নতুন ব্যবস্থায় ৫০ হাজার পর্যন্ত টাকা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা যাবে নগদ টাকায়। এর বেশি হলেই তা পরিশোধ করতে হবে চেকের মাধ্যমে। এ উদ্যোগের ফলে এ খাতে কালো টাকার বিনিয়োগকারীরাও চিহ্নিত হয়ে যাবেন। আগামী অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র কেনাবেচা স্বয়ংক্রিয় করা হবে এবং ১ জুলাই থেকে সঞ্চয়পত্রের আসল ও সুদ চলে যাবে গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে।

জানা গেছে, সঞ্চয়পত্রের সুবিধাভোগী কারা এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সঞ্চয়পত্রে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ খুবই সামান্য। সরকার এ পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটির টাকা ঋণ নিয়েছে এর মাধ্যমে। যার ৯৫ শতাংশই বিত্তশালীদের। এর মধ্যে বর্তমান ও সাবেক আমলা, পুলিশ, সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা ও বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারাই বেশি। সঞ্চয়পত্রে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ রয়েছে বর্তমান ও সাবেক আমলাদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কয়েকটি পেশার মানুষ তারা নামে-বেনামে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের সত্যতা মিলেছে বিশেষ অনুসন্ধানে। গত কয়েক দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সঞ্চয়পত্র কিনতে আগ্রহীদের বেশির ভাগই পেশাজীবী ও তাদের আত্মীয়স্বজন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, সঞ্চয়পত্র বেচাকেনা অনলাইন ডাটাবেজে আসলেও আগের বিক্রি করা আড়াই লাখ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র অনলাইনের ডাটাবেজে আসছে না। ফলে নতুন করে অনলাইনের আওতায় আবারো যাদের হাতে টাকা রয়েছে তারা বিনিয়োগ করতে পারছেন। ব্যাংকের আমানতের সুদ হার কম বলে অনেকে তা তুলে নিয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। এতে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট দিন দিন গভীর হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে তারা ঋণ দিতে পারছে না। এতে বিনিয়োগে খারাপ প্রভাব পড়ছে। যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে।

ব্যাংকাররা বলছেন, সরকারপ্রধানের চাপ রয়েছে বিনিয়োগকে চাঙ্গা করার। তাই ঋণের সুদ হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই দফা এ নিয়ে নির্দেশনাও দিয়েছেন। কিন্তু ব্যাংকগুলো তা কার্যকর করতে পারছে না। মূলত উচ্চ সুদে তাদের আমানত নিতে হচ্ছে। সেটিও অনেক ক্ষেত্রে পাচ্ছে না। কারণ কয়েকটি ব্যাংকের জালিয়াতির কারণে সাধারণ মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছে। এসব কারণে ঋণের সুদ হার সহসা কমার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকরা। যদিও আসন্ন বাজেটে এ ব্যাপারে চমক নিয়ে হাজির হতে পারেন অর্থমন্ত্রী। তবে তাদের দাবি, সঞ্চয়পত্রের সুদ হার অবশ্যই কমাতে হবে। এর হার ক্ষেত্র বিশেষে ৯ শতাংশের বেশি হতে পারে না।   

জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের হিসাব মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) সঞ্চয়পত্রসহ সব ধরনের জাতীয় সঞ্চয় স্কিম থেকে সরকারের নিট ঋণ এসেছে ৩৯ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। ফলে এ খাত থেকে বাজেট ঘাটতি পূরণে চলতি অর্থবছরে সরকার কর্তৃক গৃহীত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫১ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি নিট ঋণ নিয়েছে সরকার। এবারের বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা নিট ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য ঠিক করেছিল।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের হালনাগাদ তথ্যমতে, গত মার্চ মাসেই চার হাজার ১৩০ কোটি ৭১ লাখ টাকা নিট ঋণ এসেছে সঞ্চয়পত্র থেকে। এর আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে খাত থেকে নিট ঋণ এসেছিল চার হাজার ৬০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। গত জানুয়ারিতে ছয় হাজার তিন কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল, যা ছিল এক মাসের হিসাবে সবচেয়ে বেশি নিট বিক্রি।

তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সরকারকে জনগণের করের টাকা থেকে সঞ্চয়পত্রের সুদ বাবদ বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। কিন্তু এই অর্থ যাচ্ছে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে। প্রান্তিক মানুষ কোন সুফল পাচ্ছে না। অথচ বলা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ রয়েছে এখানে। আর পুরো বিষয়টি ধোঁয়াশা করে রাখা হয়েছে।

সম্প্রতি এক প্রাক বাজেট আলোচনায় আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদহারে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না বলে ইঙ্গিত দিয়ে মুস্তফা কামাল বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদহার যেভাবে ছিল, তাতে হাত দেইনি, হাত দেবও না। অথচ ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান তারল্য সঙ্কট কাটাতে ব্যাংকার দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয়পত্রের সুদ হার কমানোর দাবি তুলে আসছেন। তারা বিষয়টি জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবিরকে চিঠিও দেন। গভর্নর একাধিকবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এ ব্যাপারে ইতিবাচক কথা বলেছেন। তবে কোন অগ্রগতি হয়নি।

অপরদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতে নগদ টাকার টানাটানি চলছে। অনেক গ্রাহক তার আমানত তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের প্রস্তাব থাকবে সঞ্চয়পত্রের সুদ হার নিয়ে সরকার বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই