রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬

করোনা ভাইরাস, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, হোম কোয়ারেন্টাইন কী

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২০, বৃহস্পতিবার ০৮:০৫ পিএম

করোনা ভাইরাস, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, হোম কোয়ারেন্টাইন কী

ঢাকা : চীনজুড়ে ছড়িয়ে পড়া রহস্যময় করোনা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কয়েকদিন ধরে নতুন এ ভাইরাস সারা বিশ্বের মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে গত ডিসেম্বরে ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হয়, এরপর তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা ধরণা করছেন, বিষধর চাইনিজ ক্রেইট বা চাইনিজ কোবরা করোনা ভাইরাসের মূল উৎস হতে পারে।

ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে উহানের বাস, পাতাল রেল ও ফেরি পরিষেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এছাড়া উহান থেকে বিদেশগামী বিমান ও ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়েছে। এতকিছুর পরও করোনা ভাইরাস চীনের পাশাপাশি জাপান, থাইল্যান্ড, হংকং, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত ছড়িয়েছে। ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে বৈশ্বিক বাজারে ভ্রমণ ও বাণিজ্যিকভাবে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও পতন দেখা দিয়েছে।

করোনা ভাইরাস কি : করোনা ভাইরাস ভাইরাসেরই একটি পরিবারের সদস্য, যা শ্বাসযন্ত্রের প্রক্রিয়ায় সংক্রমণ ঘটায়। নতুনটিসহ সাতটি করোনা ভাইরাস রয়েছে। ডব্লিউএইচও অস্থায়ীভাবে নতুন এ ভাইরাসের নাম দিয়েছে ‘২০১৯-এনসিওভি’।

২০০২ ও ২০০৩ সালে মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের পেছনে সার্স (সেভার অ্যাকিউট রিসপাইরেটরি সিনড্রোম) করোনা ভাইরাস ছিল। সার্সে প্রায় নয় হাজার মানুষ আক্রান্ত হয় এবং এর মধ্যে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়।

সার্স প্রাদুর্ভাবের এক দশক পর ২০১২ সালে মার্স (মিডল ইস্ট রিসপাইরেটরি সিনড্রোম) প্রাদুর্ভাব শুরু হয়, যা এখনো চলমান।

মার্স ভাইরাসে ২ হাজার ৪৯৪ জন আক্রান্ত হয়, এর মধ্যে মারা যায় ৮৫৮ জন, যার বেশির ভাগ ঘটনা ঘটে আরব উপদ্বীপে। উহানের নতুন করোনা ভাইরাস এ ভাইরাসগুলো থেকে আলাদা, তবে আগে কখনো এর প্রাদুর্ভাব মানুষের মধ্যে দেখা যায়নি।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সতর্কতার অঙ্গ হিসেবে এই তিনটি শব্দ সম্প্রতি প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। আইসোলেশন, হোম কোয়ারেন্টাইন ও কোয়ারেন্টাইন। তবে এদের মধ্যে তফাৎ কোথায়? কী বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসোলেশন, হোম কোয়ারেন্টাইন ও কোয়ারেন্টাইনের মধ্যে বেশ কিছু ফারাক রয়েছে। এছাড়া পার্থক্য আছে নিয়ম মানার ক্ষেত্রেও।

আইসোলেশন : কোনো ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে তা ধরা পড়লে তাকে আইসোলেশনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। আইসোলেশনের সময় চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে থাকতে হয় রোগীকে।

অন্য রোগীদের কথা ভেবে হাসপাতালে আলাদা জায়গা তৈরি করা হয় এদের জন্য। অন্তত ১৪ দিনের মেয়াদে আইসোলেশন চলে। অসুখের গতি-প্রকৃতি দেখে তা বাড়ানোও হয়। আইসোলেশনে থাকা রোগীর সঙ্গে বাইরের কারও যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় না। তাদের পরিজনের সঙ্গেও এই সময় দেখা করতে দেওয়া হয় না। একান্ত তা করতে দেওয়া হলেও অনেক বিধি-নিষেধ মেনে।

কোয়ারেন্টাইন : করোনাভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পরই তার উপসর্গ দেখা দেয় না। অন্তত সপ্তাহখানেক সেটি ঘাপটি মেরে বসে থাকে।

তাই কোনও ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশ থেকে ঘুরে এলে বা রোগীর সংস্পর্শে এলে তার শরীরেও বাসা বাঁধতে পারে কোভিড-১৯। তিনি আক্রান্ত কিনা এটা নিশ্চিত হওয়া মাত্রই কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয় রোগীকে।

অন্য রোগীদের কথা ভেবেই কোয়ারেন্টাইন কখনও হাসপাতালে আয়োজন করা হয় না। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে এমন ব্যক্তিকে সরকারি কোয়ারেন্টাইন পয়েন্টে রাখা হয়।

কমপক্ষে ১৪ দিনের সময়সীমা এখানেও। এই সময় রোগের আশঙ্কা থাকে শুধু, তাই কোনও রকম ওষুধপত্র দেওয়া হয় না। শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বলা হয়। বাইরে বেরনো বন্ধ করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। যেহেতু রোগের জীবাণু ভিতরে থাকতেও পারে, তাই মাস্ক ব্যবহার করতেও বলা হয়। বাড়ির লোকেদেরও এই সময় রোগীর সঙ্গে কম যোগাযোগ রাখতে বলা হয়।

হোম কোয়রান্টিন : বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়িতে রেখে আইসোলেশন সম্ভব নয়। বরং একে হোম কোয়ারেন্টাইন বলাটা অনেক যুক্তিযুক্ত।

কোনও ব্যক্তি যখন নিজের বাড়িতেই কোয়ারেন্টাইনের সব নিয়ম মেনে, বাইরের লোকজনের সঙ্গে ওঠা-বসা বন্ধ করে আলাদা থাকেন, তখন তাকে হোম কোয়ারেন্টাইন বলে। সাধারণত, সম্প্রতি আক্রান্ত দেশ থেকে ঘুরে না এলে রোগীকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়।

এক্ষেত্রেও ন্যূনতম ১৪ দিন ধরে আলাদা থাকার কথা। কোনও ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশ থেকে ঘুরে এলে, বা রোগীর সংস্পর্শে এলে তার শরীরেও বাসা বাঁধতে পারে কোভিড-১৯। বাসা আদৌ বেঁধেছে কি না বা সে আক্রান্ত কিনা এটা বুঝে নিতেই এই ব্যবস্থা নিতে হয়।

এক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যবিধির বাইরে কোনও আলাদা ওষুধ দেওয়ার প্রশ্নই নেই। বেশি করে পানি, ভাল করে খাওয়া-দাওয়া, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর নানা পথ্য— এসব দিয়েই পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

করোনাভাইরাস এমন একটি সংক্রামক ভাইরাস - যা এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি। ভাইরাসটির আরেক নাম ২০১৯ - এনসিওভি বা নভেল করোনাভাইরাস। এটি এক ধরণের করোনাভাইরাস। করোনাভাইরাসের অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ছয়টি প্রজাতি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। তবে নতুন ধরণের ভাইরাসের কারণে সেই সংখ্যা এখন থেকে হবে সাতটি।

২০০২ সাল থেকে চীনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া সার্স (পুরো নাম সিভিয়ার এ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামে যে ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৭৭৪জনের মৃত্যু হয়েছিল আর ৮০৯৮জন সংক্রমিত হয়েছিল। সেটিও ছিল এক ধরণের করোনাভাইরাস।

নতুন এই রোগটিকে প্রথমদিকে নানা নামে ডাকা হচ্ছিল, যেমন: 'চায়না ভাইরাস', 'করোনাভাইরাস', '২০১৯ এনকভ', 'নতুন ভাইরাস', 'রহস্য ভাইরাস' ইত্যাদি। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগটির আনুষ্ঠানিক নাম দেয় কোভিড-১৯ যা 'করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯'-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

রেসপিরেটরি লক্ষণ ছাড়াও জ্বর, কাশি, শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যাই মূলত প্রধান লক্ষণ। এটি ফুসফুসে আক্রমণ করে। সাধারণত শুষ্ক কাশি ও জ্বরের মাধ্যমেই শুরু হয় উপসর্গ দেখা দেয়, পরে শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণত রোগের উপসর্গগুলো প্রকাশ পেতে গড়ে পাঁচদিন সময় নেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১৪ দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। তবে কিছু কিছু গবেষকের মতে এর স্থায়িত্ব ২৪ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। মানুষের মধ্যে যখন ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেবে তখন বেশি মানুষকে সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকবে তাদের। তবে এমন ধারণাও করা হচ্ছে যে নিজেরা অসুস্থ না থাকার সময়ও সুস্থ মানুষের দেহে ভাইরাস সংক্রমিত করতে পারে মানুষ। শুরুর দিকের উপসর্গ সাধারণ সর্দিজ্বর এবং ফ্লু'য়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্থ হওয়া স্বাভাবিক।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue