বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

কাঁটায় ভরা পথে বিএনপি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০১৯, সোমবার ০৮:১১ পিএম

কাঁটায় ভরা পথে বিএনপি

ঢাকা : দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে বিএনপির সামনে একটিমাত্র পথ খোলা রয়েছে। বাকি সব পথ বন্ধ। নেত্রীর মুক্তির জন্য দীর্ঘ ১৮ মাস নানাপথে ঘুরেছে বিএনপি নেতাকর্মীরা। কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো গোপনে। রাজনৈতিক অঙ্গনে চাউর ছিল ‘সমঝোতার’ কথাও। কিন্তু ফলাফল শূন্য। ম

রমি বাউলশিল্পী প্রয়াত কামাল পাশার ‘দিনদুনিয়ার মালিক খোদা’ গানটির একটি অন্তরার মতোই বিএনপির অবস্থা। ‘সব পথ যার কাঁটায় ঘেরা কোন পথে সে চলবে’। এখন কাঁটায় ভরা একমাত্র পথেই আন্দোলনের দিকে যেতে হচ্ছে দলটিকে।

বিএনপির দাবি, আদালতের বিষয়কে সরকার পরিকল্পিতভাবে রাজপথে ঠেলে দিচ্ছে। আন্দোলনের কথা আলোচনায় এলেই দলটির প্রায় ১৮ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ১ লাখ মামলা, গুম-খুনের কথা মনে করিয়ে দেয় বলে মন্তব্য করেন দলীয় নেতা, বোদ্ধা এবং কর্মীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাদামাটা কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিঠি চালাচালি, আইনি লড়াই সর্বোপরি সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েও কাজ না হওয়ায় চেয়ারপারসনের মুক্তির আশা একরকম ছেড়েই দিয়েছে বিএনপি।

অন্যদিকে প্যারোলে মুক্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল আছেন খালেদা জিয়া। সঙ্গত কারণে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমেই মুক্তির বিষয়টি ভাবতে বাধ্য হচ্ছে বিএনপিকে। এজন্য আগামী জানুয়ারিকে টার্গেট করে এ সময়ের মধ্যে আন্দোলন সফল করার মতো সাংগঠনিক শক্তি গড়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।

বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সপ্তাহের দুদিনে দলীয় সাত এমপি হাসপাতালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে সমঝোতার যে আলোচনা শুরু হয়েছে তা ঠিক নয়। প্রকৃত পক্ষে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অবহিত করেই দলীয় এমপিরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও তার মুক্তির বিষয়টি নতুনভাবে দলীয় এমপিদের মাধ্যমে ফোকাস করতেই এই সাক্ষাতের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিএনপি চাইছে, নতুন করে বেগম জিয়ার জামিন আবেদনের আগে দলীয় যেসব পথ খোলা আছে, সেগুলোকে কাজে লাগাতে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন মহলে বিএনপির যারা বন্ধু কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছেন, তাদের কাছে বেগম জিয়ার মুক্তির ইস্যুটি তুলে ধরা হচ্ছে।

একইসঙ্গে কিছু কর্মসূচিও নেওয়া হবে, যাতে করে সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। এসব করে কোনো কাজ হবে না জেনেও চলতি বছরের বাকি সময়টা কঠোর আন্দোলনের এই বিকল্প পথে থাকবে বিএনপি। এরপর জানুয়ারির শুরু থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির একদফা আন্দোলনে যাবেন তারা।

দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের এক নেতা বলেন, খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মুক্তি দিয়ে দেবে তা কোনো অবস্থাতেই ভাবে না বিএনপি। প্যারোল না নিয়ে জামিন পেয়ে খালেদা জিয়া মুক্ত হলে তার আপসহীনতার কাছে ক্ষমতাসীনরা হেরে যাবে। এজন্য আন্দোলন ছাড়া দলীয় প্রধানের মুক্তির আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এজন্য আন্দোলনের মাঠ প্রস্তুতের জন্য সংশ্লিষ্ট নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আর প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে কোনো নেতা যাতে কোনো ধরনের কথা প্রকাশ্যে না বলেন, সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। কারণ দলীয় এমপিদের দেশনেত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজনে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করবেন তবু প্যারোলে মুক্ত হবেন না।

এর আগে একটি প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসার প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। কিন্তু হ্যাঁসূচক কিছুই মেলেনি। দেশীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত একাধিক নেতা ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতার সঙ্গে দফায় দফায় কথা হয়েছে। তাতেও ফল আসেনি।

অবশেষে দলীয় এমপিরা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করে তাদের আবেগের কথা জানান। তাদের বার্তা যেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছানো হয়।

এ নিয়েও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতিবাচক কোনো সাড়া নেই। বরং বিএনপিকে আন্দোলনের ঢেউ তোলার পরামর্শ দেন ওবায়দুল কাদের।   

দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য গত ১ এপ্রিল বিএসএমএমইউতে নেওয়া হয়। গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ৫ বছরের সাজা হয় তার। পরে এই কারাদণ্ডাদেশ বাতিল চেয়ে করা আপিলে সাজা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করেন উচ্চ আদালত। বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা চলছে।

দলীয় দফতর সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ বছরে বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলনে গুম-খুন, মামলা-হামলা ও প্রত্যক্ষভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন প্রায় ১৮ লাখ নেতাকর্মী। আন্দোলনকে ভিন্নধারায় প্রবাহিত করতে প্রতিপক্ষ ভূমিকা রেখেছে। ফলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিণত হয়েছে সন্ত্রাসে।

জাতীয় ইস্যু নিয়ে রাজপথে থেকেও বিএনপি বিভিন্ন দেশে ‘সন্ত্রাসী দল’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। আগামীর আন্দোলনে নামার আগে বিএনপিকে বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে বলে জানান দলটির নেতারা।

সোনালীনিউজ/এমটিআই