শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

ট্রাম্পকার্ড এরিক-সাদ

কাদেরকে ঠেকাতে একাট্টা দুই ভাবি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার ০৭:৪৮ পিএম

কাদেরকে ঠেকাতে একাট্টা দুই ভাবি

ঢাকা : রাজপথের আন্দোলনে ঘাম ঝরেনি এরশাদের জাতীয় পার্টির। তবে গলদঘর্ম হয়েছে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব আর ভাঙনের নানান কাহিনীতে। পুরুষতান্ত্রিক এই দলের যত দ্বন্দ্ব-কোন্দলের সৃষ্টি তার নেপথ্যে নারী।

জীবদ্দশায় নারীদের সঙ্গে লড়াই করে সামাল দিয়েছেন এরশাদ। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এইচ এম এরশাদ নেই তবে দলে ঠিকই আছে ল্যাং মারামারির পুরনো কালচার। চতুর্মুখী নতুন নতুন ইস্যুতে চাপে আছেন পার্টির শীর্ষ নেতা জি এম কাদের।

বর্তমান ভাবি রওশনের চালের সামাল দিতে না দিতেই সাবেক ভাবি বিদিশার চালে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।

রওশন-বিদিশা দুজনেই ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করছেন এরশাদের সন্তানদের। রওশনের কার্ড সাদ এরশাদ আর প্রতিবন্ধী এরিক হচ্ছেন বিদিশার। জিডি, পাল্টা জিডি, লিগ্যাল নোটিশসহ আইনি প্যাঁচে জড়িয়ে যাচ্ছেন জি এম কাদের। নানামুখী আতঙ্ক থেকেই গভীরের খোঁজ নিতে দলের সিনিয়র নেতাদের দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি।

কী চালে এগুচ্ছেন বিদিশা সিদ্দিকী, রওশনের মতিগতিই বা কী? তাদের পেছনেই বা কারা? দুই মেরুতে থাকা দুই ভাবি কী জাতীয় পার্টিকে জিএম কাদেরমুক্ত করতে একাট্টা হয়েছেন কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তিনি (কাদের)।  

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় পার্টিতে বিভিন্ন সময় যে বৈরী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এখনো সেই আলামত বিরাজ করছে। পার্টির কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। হতে চান পার্টির চেয়ারম্যান। এরশাদের মৃত্যুর পর দুর্বল ধাক্কা দিয়ে আপাতত পেয়েছেন ছেলে সাদ এরশাদকে রংপুরের এমপি হিসেবে। সংসদের স্পিকারের কাছে একদিকে জি এম কাদের অন্যদিকে রওশন চিঠি দিয়েছিলেন। বিশেষ কক্ষের পরামর্শে ছাড়-পাল্টা ছাড়ের মাধ্যমে দৃশ্যত সমঝোতা হয়েছে দেবর-ভাবির।

কিন্তু কলকাঠি নাড়া ছাড়েননি রওশন। আগামী ডিসেম্বরে পার্টির কাউন্সিল। লড়াইটা সেখানেই হতে পারে বলে জাপার সিনিয়র নেতাদের আভাস-ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দ্বিধাবিভক্ত প্রেসিডিয়াম মেম্বাররা এখনই মুখ খুলছেন না। তারা অপেক্ষা করছেন কাউন্সিল পর্যন্ত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও সংসদের এমপি এ প্রতিবেদককে বলেন, আতঙ্ক থেকেই এরশাদপুত্র রাহগির আল মাহিকে (সাদ এরশাদ) পার্টির যুগ্ম মহাসচিব করেছেন জি এম কাদের। বিষয়টি প্রেসিডিয়ামের অনেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানেন না। এ নিয়ে ক্ষোভ আছে।

তার মতে, রওশনের টান থেকে চেয়ারম্যানের চেয়ার ঠেকাতে তার (রওশন) ছেলে সাদকে বিনাবাক্যে এবং একক সিদ্ধান্তে যুগ্ম মহাসচিব করেছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হবে কি না তা নিয়ে অনেকটাই সংশয় রয়েছে। এ সংশয় কাটতে অপেক্ষা করতে হবে কাউন্সিল পর্যন্ত।

কাদেরের সামনে নতুন করে ‘এরিক’ ইস্যু হাজির। এরশাদের প্রতিবন্ধীপুত্র শাহতা জারাব এরিক। স্ত্রী বিদিশার সঙ্গে লড়াই করে এরিককে নিজের কাছে রেখেছিলেন এরশাদ। গঠন করে দিয়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদসমেত ট্রাস্ট। ট্রাস্টের দ্বিতীয় প্রধান করেছেন ভাতিজাকে।

ছোটভাই জি এম কাদেরকে পার্টির কাণ্ডারির দায়িত্ব দিলেও এই ট্রাস্টের ধারে-কাছেও রাখেননি। তালাক দেওয়া সাবেক স্ত্রী বিদিশাকে তো নিষিদ্ধ করেছেন প্রেসিডেন্ট পার্কে (এরশাদের বাসভবন)।

কিন্তু গত ১৪ নভেম্বর হঠৎ সেই প্রেসিডেন্ট পার্কে বিদিশা, নিয়ন্ত্রণে প্রতিবন্ধী এরিক।

ছেলে এরিকের সঙ্গে অবস্থান নেওয়া বিদিশা অভিযোগ করছেন, এই বাসায় এরিকের দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা তার ছেলের স্বাস্থ্যের প্রতি ‘অবহেলা’ করেছেন। এরশাদের ব্যক্তিগত গাড়িচালক এরিককে ‘মারধর’ করেছেন।

‘নিরাপত্তাহীনতায়’ ভুগতে থাকা এরিক মা বিদিশাকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট পার্কে থাকতে চান জানিয়ে গত ১৮ নভেম্বর গুলশান থানায় জিডি করেন। বিদিশার ওই অভিযোগের পর তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার হুমকি দিয়েছিলেন জি এম কাদের।

জাপার সহযোগী সংগঠন জাতীয় যুব সংহতির যুগ্ম আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ আবু ওয়াহাবের পক্ষে গত মঙ্গলবার আইনজীবী এম এম সালাহ্উদ্দিন আহম্মেদ আইনি নোটিশ দিয়েছেন বিদিশাকে। টানটান উত্তেজনা এরশাদ পরিবারে।

বিদিশা ঝড়ো হাওয়ায় ওলটপালট হচ্ছে পার্টির নেতৃত্বও। ইতোমধ্যে চাচা জি এম কাদেরের প্রতি ভয়ের তির ছুড়েছেন এরিক। নিজ জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাতে সঙ্গে নিয়েছেন মা বিদিশাকে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিষ্কণ্টক  করতে দেবর কাদেরকে টার্গেট করেছেন ভাবি বিদিশা। সুযোগ বুঝে ছুড়ছেন তার কার্ডও। তিনিও রাজনীতিতে আসতে চান।

এদিকে জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে বিদিশার অবস্থান এবং রওশন এরশাদের মুখে কুলুপ আঁটা নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে প্রশ্ন উঠেছে।

কেউ বলছেন, জি এম কাদের ঠেকাতে বিদিশাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন রওশন। নিজ নিজ স্বার্থের হিসেব কষে এক হচ্ছেন দুই ভাবি রওশন-বিদিশা।

আবার কেউ বলছেন, অদৃশ্য কোনো স্থান থেকে বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েই লড়াইয়ে নেমেছেন বিদিশা। নইলে কূটনীতিকপাড়ায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টিত এরশাদের বাসায় নিষিদ্ধ বিদিশা প্রবেশ করলেন কীভাবে?

সোনালীনিউজ/এমটিআই