সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২ পৌষ ১৪২৬

কারা পাচ্ছেন যুবলীগের নেতৃত্ব

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার ০৬:৩৭ পিএম

কারা পাচ্ছেন যুবলীগের নেতৃত্ব

ঢাকা : পুরো নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আলোচনার অন্যতম বিষয় থাকছে মূল দলসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সম্মেলন।

বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম সহযোগী সংগঠন যুবলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে (কংগ্রেস) ঘিরে আলোচনা, আগ্রহ ও কৌতূহল অন্য যে কোনো সংগঠনের তুলনায় বেশি। যুবলীগের সম্মেলনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে নেতাকর্মীদের কৌতূহলের পাশাপাশি সংগঠনটিতে পদপ্রত্যাশীর সংখ্যাও বাড়ছে।

চলমান শুদ্ধি অভিযানের মধ্য দিয়ে বিতর্কিত ও অভিযুক্ত নেতাকর্মীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সংগঠন থেকে বহিষ্কার হচ্ছেন, একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে নতুন মুখও উঠে আসছে।

ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন ও তুলনামূলক বিতর্কমুক্ত নেতৃত্ব পাওয়ার মতো যুবলীগও আগামীকাল ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে স্বচ্ছভামূর্তির নেতৃত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা সংগঠনটির সব পর্যায়ের বর্তমান ও সাবেক নেতাকর্মীদের।

সংগঠন সূত্রমতে, অনিয়ম ও দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানে সবচেয়ে বেশি ঝড়-ঝাপ্টা যাচ্ছে যুবলীগের ওপর দিয়ে।

ক্যাসিনো বাণিজ্য, মাদক, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগই অন্য সংগঠনের তুলনায় এখনো পর্যন্ত বেশি আলোচিত ও সমালোচিত। সরকারি দলের যে কোনো সহযোগী সংগঠনের চেয়ে যুবলীগের নেতাকর্মীই এখনো পর্যন্ত অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন বেশি। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বেশ কয়েক নেতা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনেও আছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কয়েক নেতার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করছেন, কয়েকজনের বিদেশে যাওয়ার বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা আছে।

নানা অপকর্মে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ যেভাবে আলোচনায় এসেছে, তাতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী বিস্মিত। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নামে অভিযোগ উঠেছে যে, পুরো সংগঠনই দূষিত হয়ে গেছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। এ কারণে গোটা যুবলীগকেই ঢেলে সাজাতে চান আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কারা আসছেন যুবলীগের নেতৃত্বে, আলোচনা এখন সেদিকেই। শুদ্ধি অভিযানের মতো বড় ধাক্কার পর কেমন হবে যুবলীগের কমিটি, এমন প্রশ্ন নেতাকর্মীদের। সংগঠনটিকে ঘিরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক নেতার দীর্ঘদিনের যে বলয় গড়ে উঠেছে, সেই বলয় এবার ভাঙছে কি না— এমন প্রশ্নও অনেকের।

দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এবারের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যুবলীগের দীর্ঘদিনের বলয় ভাঙতে চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সরাসরি যুবলীগের অভিভাবক হিসেবে সংগঠনটির দেখভাল করতেন।

কিন্তু তার হাতে যুবলীগের এমন পরিণতির পর এবার প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন নিজেই যুবলীগের কমিটির বিষয়টি দেখবেন।

ইতোমধ্যে যুবলীগের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের শীর্ষ নেতা নির্বাচনের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন তিনি দলের শীর্ষ নেতা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে। তাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সংগঠনটিকে অনুপ্রবেশমুক্ত নেতৃত্ব তৈরিতেও বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সাবেক নেতারাও এবার পেতে পারেন সংগঠন দুটির শীর্ষ দুটি পদের দায়িত্ব।

চলতি মাসে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের তিনটি সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে শীর্ষ পদগুলোর দায়িত্ব পেয়েছেন সংগঠনগুলোর সদ্য সাবেক কমিটিরই নেতারা। যুবলীগের বেলায়ও এমনটা হতে পারে বলে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার ধারণা।

এমনটা হলে সংগঠনটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যসহ অন্য কয়েক নেতা নতুন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন। তবে বয়স ৫৫-এর মধ্যে হওয়ার শর্ত থাকায় স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কোনো কোনো নেতারও নতুন কমিটিতে ঠাঁই পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। আবার বর্তমান কমিটি ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মধ্যে সমন্বয় করেও হতে পারে নতুন কমিটি।

সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ও সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি করছেন যারা, তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গ্রেপ্তারের পাশাপাশি দল এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থেকে বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে দুইভাবে অভিযান চলছে।

এর মধ্য দিয়ে বিতর্কিত, চাঁদাবাজ, অভিযুক্ত ও নানাভাবে অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীদের সরিয়ে দিয়ে সংগঠনগুলোকে ‘বিতর্কমুক্ত’ করা যাচ্ছে বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন দল।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গড়া ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া এ দলের নেতৃত্বের সরকার আগামী ২০২০ সালে তার জন্মশতবর্ষ ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবে। এর আগেই দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যেই আওয়ামী লীগ সভাপতির কঠোর নির্দেশে দলের ভ্রাতৃপ্রতিম, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে ‘শুদ্ধি অভিযান’ চলছে।

সূত্রমতে, এবারের সম্মেলনে চেয়ারম্যান পদে আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য শেখ মারুফ, যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণির ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজম ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শহীদ সেরনিয়াবাত।

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যুবলীগের বর্তমান কমিটির দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুব্রত পাল ও মহিউদ্দীন আহমেদ মহির নামও আলোচনায় রয়েছে। সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্যে বাহাদুর বেপারী, অজয় কর খোকন ও ইসহাক আলী খান পান্নার নামও আলোচিত হচ্ছে।

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক চয়ন ইসলামের নামও আলোচনায় আছে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। তাই সংগঠনটির নেতৃত্বে কারা আসছেন, তা মূল দলের শীর্ষ অনেক নেতার কাছেও তা পরিষ্কার নয়।

সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে ছাড়াই কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়েছে যুবলীগ। নতুন কমিটিতেও আর ঠাঁই পাচ্ছেন না বর্তমান চেয়ারম্যান ওমর ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ। এমনকি ওমর ফারুক সংগঠনের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণও এখন পর্যন্ত পাননি।

অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িতদের দলের কোনো পর্যায়েই রাখা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন সংগঠনটির সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির নানক।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত যাদের কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত ও বদনামের মুখোমুখি হয়েছে, তাদের বিবেচনায় রাখার সুযোগ নেই। যুবলীগকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এবারের কমিটি করা হবে।

নতুন যারা আসবেন, তাদের অনেক দায়িত্ব থাকবে। ইতোমধ্যে যারা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন, তাদের বিদায় করা হবে।

চলমান শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেই ঘোষণা করা হয় যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের চারটি সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের তারিখ। এগুলোর মধ্যে তিনটির সম্মেলন ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আগামীকাল বেলা ১১টায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

অন্যান্য সময় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার সম্মেলন শেষে কেন্দ্রের সম্মেলন হতো; কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমান পরিস্থিতিতে মহানগর শাখার সম্মেলন অনুষ্ঠানের পক্ষে নয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব।

২০১২ সালের ১৪ জুলাই সবশেষ সম্মেলন হয় যুবলীগের। তিন বছর মেয়াদের ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় চার বছর আগে।

তথ্যমতে, আওয়ামী লীগের সভাপতি দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেন গত ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত দলের যৌথ সভায়। এর এক সপ্তাহ পর দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভায় তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন।

সমালোচনা করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের দুই নেতার। এরপর গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আওয়ামী লীগের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়।

সোনালীনিউজ/এমটিআই