বুধবার, ২২ মে, ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

প্রয়োজন স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন

কৃষি অর্থনীতিতে নারীর অবদান বিবেচ্য

এস এম মুকুল | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৯, শুক্রবার ১২:১৬ পিএম

কৃষি অর্থনীতিতে নারীর অবদান বিবেচ্য

ঢাকা : বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও অবদান ক্রমে বাড়লেও এর সঠিক মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পাচ্ছে না বলে নারীদের আক্ষেপ থেকেই যাচ্ছে। নারীর অধিকার বিষয়ে কাজ করে এমন সংস্থাগুলোর অভিযোগ- নারী দিবস এলেই নারীর অবদান ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও পরে আর এর রেশ থাকে না।

বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃষিকে যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি কৃষিক্ষেত্রে নারীর অবদানকেও অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈতনিক পারিবারিক কাজের পাশাপাশি ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী কৃষি-সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত। নারীরাও যে কৃষক, তারাও যে কৃষিকাজ করেন এ বিষয়টি প্রথম বিবেচনা করা হয় ১৯৯৫-৯৬ সালের শ্রম জরিপের মাধ্যমে। যদিও কৃষির শুরুটাই হয় নারীর হাত ধরে, তার অকৃত্রিম ভালোবাসায়। পৃথিবীর কৃষির ইতিহাস বিশ্লেষণ তথ্য বলছে, শস্য উৎপাদনের প্রধান উপাদান হচ্ছে বীজ। এই বীজ সংরক্ষণ প্রক্রিয়াটিই শুরু হয়েছিল নারীর হাত দিয়ে। সে হিসেবে কৃষিকাজ প্রবর্তনের সর্বপ্রথম দাবিদার নারী হলেও বরাবরই কৃষিক্ষেত্রে নারীর অবদানকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। সূত্র বলছে, কৃষি খাতের ২১টি কাজের মধ্যে ১৭টি ধাপেই নারী অংশ নিলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

অভিযোগ আছে, রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার অংশ হিসেবে ১ কোটি ৩৯ লাখ কৃষককে কার্ড বিতরণ করা হলেও নারীদের এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অপরদিকে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় কৃষিঋণও পাচ্ছেন না তারা। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৯০-এর দশকে ৫২ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৮ শতাংশ নারী কৃষিকাজে জড়িত ছিলেন। ২০১০-এ এ সংখ্যা নারীতে ৬৬ শতাংশ উন্নীত হয়েছে। তারপরও কৃষিক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের অবদান যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না- এটি দুঃখজনক।

আদিকাল থেকেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান বেশি ছিল। গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে নারীর অবদান ৫৩ শতাংশ আর পুরুষের অবদান ৪৭ শতাংশ। এক সময় গ্রামীণ নারীরা গৃহকর্মের পাশাপাশি গৃহপালিত পশুপাখি যেমন গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, কবুতর লালন-পালন করতেন। এছাড়া মাঠের কৃষিকাজে পুরুষদের সহযোগী ভূমিকা রাখতেন। একই সঙ্গে ঘরবাড়ির আঙিনায়ও সবজি ফলাতেন।

গ্রামীণ নারীদের এসব কৃষিকর্ম সাংসারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষিপণ্য বিক্রির মাধ্যমে আর্থিক সচ্ছলতা আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এখন সময় পাল্টে গেছে। গ্রামীণ পর্যায়ে এখন নারীরা কেবল সংসারের প্রয়োজনীয় কৃষিকাজের সহযোগী ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রামীণ নারীরা বাণিজ্যিক কৃষির দিকে ধাবিত হচ্ছেন। পতিত জমিতে, বাড়ির আঙিনায়, পুকুরে অথবা কৃষি জমিতে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিকভিত্তিতে গবাদি পশুপালন, দুগ্ধ খামার, ফলবাগান, নার্সারি, হাঁস-মুরগির খামার, মৎস্য চাষ, সবজি উৎপাদন করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

এমনকি কৃষিভিত্তিক পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীদের অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে। আগে কৃষিশিক্ষায় নারীদের আগ্রহ ছিল না। তখন মনে করা হতো কৃষিশিক্ষা নারীদের জন্য নয়। কিন্তু আধুনিক সময়ের সঙ্গে সেই ধারণাও পাল্টে যাচ্ছে। কৃষিশিক্ষার ক্ষেত্রেও মেয়েদের আগ্রহ বাড়ছে। এই প্রবণতা সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির ক্ষেত্রে সুফল বয়ে আনবে বলে কৃষিবিদরা মনে করছেন।

মজার ব্যাপার হলো- গত এক দশকে কৃষিখাতে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা ১০ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আর এই শূন্যস্থানটি পূরণ করেছেন নারী শ্রমিকরা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ১ কোটি ৩০ লাখ শ্রমশক্তি যুক্ত হয়েছে, যার প্রায় ৫০ লাখই নারী। এ বাড়তি নারীশ্রমিকের প্রায় ৭৭ শতাংশই কৃষিশ্রমিক। আবার শ্রমশক্তি জরিপ ২০০৫-০৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ বছরের ওপরের জনশক্তির ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। এ জরিপ অনুসারে শ্রমশক্তির ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ পুরুষ এবং ৬৮ দশমিক ১ শতাংশ নারী সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত।

প্রাচীনকাল থেকে কৃষিকাজে নারীরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শুরু হয় নারীর সারা দিনের কাজ। ঘর ঝাড়ু দেওয়া থেকে শুরু করে গোয়ালঘরের গোবর দিয়ে জ্বালানি তৈরি, হাঁস-মুরগির খাবার দেওয়া, কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমিকের জন্য মাঠে খাবার পাঠানো, পরিবারের সদস্যদের খাবার দেওয়া, সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, ধান শুকানো, চাল তৈরি, দুপুরের রান্না, খাবার পানি সংগ্রহ, সবজির উৎপাদনের পরিচর্যা, রাতের খাবারসহ হরেক কাজে ব্যস্ত থাকেন গ্রামীণ নারীরা।

নারীর অবদান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানগুলোর তথ্য থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষিখাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৮১ সালে ঘোষিত নারীর প্রতি বিরাজমান সব রকম বৈষম্য বিলোপের দলিল, যা সংক্ষেপে সিডও সনদ নামে পরিচিত।

আইএলও শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৩ অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট ১ কোটি ২০ লাখ নারীশ্রমিকের মধ্যে ৭৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৯২ লাখ নারীই কৃষিকাজ, মৎস্যচাষ ও সামাজিক বনায়নের সঙ্গে জড়িত। ২০১৬ সালের সিএসআরএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষিখাতের ২১ ধরনের কাজের মধ্যে ১৭ ধরনের কাজেই গ্রামীণ নারীরা অংশ নেন।

‘সিডিপির অর্থনীতিতে নারীর অবদান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংলাপে বলা হয়, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২.১টি কাজ করে ব্যয় করেন ৭.৭ ঘণ্টা। নারী পুরুষের তুলনায় ৩ গুণ বেশি কাজ করেন। কৃষিতে নারীর সংশ্লিষ্টতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বীজ সংরক্ষণ; বীজ অঙ্কুরোদগম; বীজ বাছাই; বীজ শোধন; বীজতলায় বীজ বপন; চারা তোলা; চারা রোপণ; কৃষি পঞ্জিকা প্রণয়ন ও অনুসরণ; পুষ্টিসম্মত রান্না কৌশল; খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ; কর্তন-উত্তর কৌশল; শস্য সংরক্ষণ; কৃষি উৎপাদন পরিকল্পনা; কৃষিশ্রমিক ব্যবস্থাপনা; জৈবকৃষি; জৈবসার তৈরি ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা; ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা; কুইক কম্পোস্ট তৈরি ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা; খামারজাত সার; মুরগি পালন; হাঁস পালন; ছাগল পালন; গরু পালন; দুধ দোহন; গরু মোটাতাজাকরণ; ডিম ফোটানো; বসতবাড়িতে শাকসবজি-ফল-ফুল ও ভেষজ চাষ; কবুতর পালন; কোয়েল পালন; নার্সারি ব্যবস্থাপনা; মাতৃগাছ ব্যবস্থাপনা; মৌচাষ; শীতল পাটি বুনন ব্যবস্থাপনা; হোগলা তৈরি; বায়োগ্যাস কার্যক্রম; খাঁচায় ও পুকুরে আধুনিক উপায়ে মাছচাষ; কৃষিভিত্তিক শিল্প জ্যাম-জেলি-আচার-কেচাপ-স্যুপ-আমসত্ত্ব-তালসত্ত্ব তৈরি; ভাসমান সবজি চাষ; ঘাস চাষ; মাশরুম চাষ; আলুর কলার চিপস; চানাচুর তৈরি; ছাদ বাগান; কৃষি বনায়ন এবং সামাজিক বনায়ন প্রভৃতি।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীকে অবহেলা করে কোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কখনো সফল হবে না। আমাদের জাতীয় কবি বলেছেন- ‘শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হাল, নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল। নর বাহে হাল, নারী বহে জল, সেই জল মাটি মিশে, ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে। সেদিন সুদূর নয়-যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।’ বাংলার নারীর জয় হোক। কৃষিক্ষেত্রে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে পাল্টে যাবে সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির চিত্র।


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।