মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

কেউ কাউকে মানছেন না

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ জুন ২০১৯, বুধবার ০২:৩১ পিএম

কেউ কাউকে মানছেন না

ঢাকা : ভেঙে পড়েছে বিএনপির চেইন অব কমান্ড। নীতিনির্ধারণী ফোরাম ঠুঁটো জগন্নাতে পরিণত হয়েছে। শীর্ষ, সিনিয়র কিংবা সহকর্মী কেউ কারো কথা মানছেন না। উল্টো পরস্পরের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনায় লিপ্ত রয়েছেন। নিজেকে বাঁচানোর বাঁকা পথে হাঁটার অভিযোগও উঠেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের বিরুদ্ধে। ফলে দলটির শীর্ষ পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কালো ছায়া পড়েছে মাঠপর্যায়ে। দলের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত চিত্র দেখে দিনের পর দিন হতাশ হয়ে পড়ছেন সাধারণ নেতাকর্মীরাও।

অবশ্য দ্বন্দ্ব-কোন্দলের নেপথ্যে সরকারদলীয়দের দায়ী করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের দলে বিভেদ সৃষ্টি করতে সরকার কৌশল অবলম্বন করে। তাতে কিছু গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে বানোয়াট সংবাদ প্রচার করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশ রাজনীতিহীন হয়ে পড়ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন অবস্থাই বিরাজ করে। নিজেদের মধ্যে ঐক্য অটুট না থাকলে রাজনীতির মাঠে খেলার বল চলে যায় প্রতিপক্ষের হাতে। যে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপর্যস্ত দলকে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়। যেমনটি বিএনপির বেলায় হয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিতেই দলটি একদিকে যেমন সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে অন্যদিকে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে রাজপথে না থাকায় জনসমর্থনেও ভাটার টান পড়তে পারে।

প্রতিষ্ঠার ৪০ বছরের বিএনপিকে এবারই বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয় সামাল দিতে হচ্ছে। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দি। দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও সাজাপ্রাপ্ত হয়ে লন্ডনে অবস্থান করছেন। বিদেশ থেকেই দল পরিচালনা করছেন। দেশে শীর্ষ নেতা দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলটি গত এক যুগ ধরে রাষ্ট্র পরিচালনার বাইরে। গত দুটি নির্বাচন বর্জন-গ্রহণ করলেও বিরোধী দলের আসন পায়নি তারা। বরং যে দলটি রাষ্ট্র পরিচালনা করত এখন সিঙ্গেল ডিজিট (৬ এমপি) নিয়ে সংসদে রয়েছে।

ইতোমধ্যে লাখখানেক মামলার জালে জড়িয়েছেন আট লক্ষাধিক নেতাকর্মী। আইনি লড়াইয়ের ঘানি টানতে টানতে তারা হতাশ। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে মধ্যম সারির কিছু নেতা নিজেকে রক্ষার জন্য কখনো কখনো ভিন্ন পথে হাঁটেন। অতি গোপনে নেওয়া সিদ্ধান্ত পৌঁছে দেয় প্রতিপক্ষের কাছে। ফলে বার বার মিশনে ব্যর্থ হয়েছে দলটি।

একদিকে দলের বেহাল দশা, অন্যদিকে নেতাদের বিপরীত আচরণে ক্ষোভ-হতাশা প্রকাশ করছেন নেতাকর্মীরা। হারানো ক্ষমতা ফিরে পাওয়া তাদের জন্য স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।     

গত ১৫ জুন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভা হয়েছে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে। তাতে স্কাইপিতে যুক্ত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব তারেক রহমান। আলোচনার এক পর্যায়ে উপস্থিত একাধিক সদস্যের তোপের মুখে পড়েন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বগুড়ার উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ, জাতীয় সংসদে যোগদান, বগুড়ার উপনির্বাচনে প্রার্থী করতে হাসপাতালে খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টাসহ ডজন প্রশ্নের জবাব চায় সভা। সব সিদ্ধান্তের নেপথ্যে তারেক রহমানের নাম ভাঙেন মির্জা ফখরুল।

ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে উদ্দেশ করে দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, সিদ্ধান্ত দিতে পারেন তবে তা স্থায়ী কমিটির জানার অধিকার আছে। সকাল-বিকালে উল্টাপাল্টা বক্তব্য দিয়ে পার্টিকে খাটো করছেন, আসলে আপনি কার ব্যাগ টানছেন?

এ সময় মির্জা ফখরুল ইসলামও নানা সময় দল বদলকারী মওদুদকে কটাক্ষ করেন। এক পর্যায়ে দুপক্ষের মধ্যে বিতণ্ডায় রূপ নেয়। পরে তা শান্ত হয়। মহাসচিব পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি দেন মির্জা ফখরুল। এর আগে গত ২৩ জানুয়ারি বগুড়ায় মির্জা ফখরুলের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল। বিতণ্ডা গড়ায় জ্যাকেটের কলার ধরাধরির পর্যায়ে।

ছাত্রদলের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে গত ১১ জুন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা দিয়েছিল ছাত্রদল। ভেতরে ছিলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সহকমৃীকে মারপিটের ঘটনাও ঘটে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতাসহ সাবেক ছাত্র নেতারা বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।

গত ১০ বছরেও দলকে সুসংগঠিত করতে পারছে না বিএনপি। কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে, কাউন্সিলও হয়েছে; কিন্তু দেশের কোথাও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি দলটি। এ দায়িত্ব মহাসচিবের হলেও তাকে বাইরে রেখে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কমিটি করতে বিভিন্ন জেলা সফর করলেও দ্বন্দ্ব মেটাতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

বিএনপি থেকে শুরু করে দলের ১১ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অবস্থা একই। নেতায় নেতা মানছেন না। কমিটি দিলেই তাতে বাধা দিচ্ছেন, পাল্টা কমিটি জমা দিচ্ছেন কেন্দ্রের কাছে। এক পক্ষকে তাড়িয়ে পার্টি অফিস দখলে নিচ্ছেন নিজ দলের অপর অংশ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকার আমাদের দলের ভেতরে ভাঙন সৃষ্টির জন্য নানামুখী কৌশল নিয়ে থাকে। গণমাধ্যমকে সরকার ব্যবহার করছে। আর স্থায়ী কমিটিতে ঘটে যাওয়া বানোয়াট সংবাদ বলে দাবি করেন বিএনপির এই নীতিনির্ধারক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক প্রধান নূরুল আমিন বেপারি বলেন, বিএনপি দুর্বল হতে শুরু করেছে ২০১৮ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকেই। ওই সময় যারা বিএনপিকে আন্দোলন থেকে দূরে নিয়েছে তারাই মূলত ঘরের শত্রু। নিজ দল সুসংগঠিত করার পাশাপাশি জনগণের স্বার্থ নিয়ে মাঠে থাকতে না পারলে যে কোনো দলই দুর্বল হয়ে পড়ে, জনসমর্থন কমতে থাকে। বিএনপির বেলাতেও তাই ঘটছে। দলে ঐক্য অটুট রেখে সুদূরপ্রসারী চিন্তা করে সিদ্ধান্ত না নিলে প্রতিপক্ষের হাতে রাজনীতির তাস চলে যাবে বলে মনে করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বিদেশে। দেশে যেসব নেতা রয়েছেন তারা পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। ফলে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue