শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬

ক্যাসিনো সম্রাট গ্রেফতারে কেউ খুশি কেউ আতঙ্কে

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০১৯, সোমবার ০১:৫৫ পিএম

ক্যাসিনো সম্রাট গ্রেফতারে কেউ খুশি কেউ আতঙ্কে

ঢাকা : বিতর্কিত নেতা ও ‘ক্যাসিনো সম্রাট’খ্যাত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট গ্রেফতার হওয়ার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে গ্রেফতারের ঘটনায় খুশি হলেও সম্রাটের ‘প্রশ্রয়দাতা’ হিসেবে অভিযুক্তরা আছেন আতঙ্কে।

সম্রাটকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে তাদের নাম উঠে আসে কি-না, এমন চিন্তায় কোনো কোনো নেতার ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’ও বদলে গেছে।

দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের যে কারো দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকায় কেউ কেউ দলীয় পদ হারানোর পাশাপাশি গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্কে ভুগছেন।

সরকারি দলের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রমতে, চলমান শুদ্ধি অভিযানে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে আছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতা ও মন্ত্রী।
ক্যাসিনো কারবার থেকে শুরু করে সারা দেশের সরকারদলীয় প্রায় সব বিতর্কিত সংসদ সদস্য ও নেতার আশ্রয়দাতা হিসেবে পরিচিত তিনি। দলের চার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে তিনজনই সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। ক্যাসিনো-কাণ্ডে দুজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে।

রোববার (৬ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তাদের দুশ্চিন্তা আরো বেড়েছে। ‘কী জানি কী হয়’— এমন আতঙ্কে আছেন তারা। টানা প্রায় এগারো বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় প্রভাবশালী নেতা ও দুর্নীতিবাজদের মদতদাতা হিসেবে পরিচিত, এমন কয়েকজনকেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে দলে গুঞ্জন আছে।

আগামী ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে নানা কারণে বিতর্কিত ও অভিযুক্তদের বাদ পড়ার বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলে আলোচনা আছে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে আগামীতে পরিবর্তন আসছে- এমন আভাস ইতোমধ্যে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া হয়েছে।

মূল দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কেন্দ্রীয় কয়েক নেতারও আতঙ্ক বেড়েছে সম্রাটের গ্রেপ্তার হওয়ার পর। তারাও সম্রাটের বাণিজ্যের ভাগ পেতেন, কেউ কেউ সম্রাটের প্রশ্রয়দাতা হিসেবে দলের নেতাকর্মীদের কাছে সমালোচিত। সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার পর যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীও স্বস্তিতে নেই। তিনি সম্রাটের ‘বিশেষ অভিভাবক’ হিসেবে অভিযুক্ত।

ইতোমধ্যে  তার ব্যাংক হিসাবও তলব করা হয়েছে। বিতর্কিত কারো পাশে আইনি লড়াইয়ের জন্য দলীয়ভাবে না দাঁড়াতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশ দেওয়া আছে। এমন নির্দেশের ফলে অভিযুক্তদের ভয়ও বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও সরকারি দলের তৃণমূল অভিনন্দন জানিয়েছে ক্যাসিনো-কাণ্ডের অন্যতম হোতা সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টিকে।

তাদের মতে, অভিযান নিয়ে এখন দলের সাময়িক সমালোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত সরকার ও আওয়ামী লীগের জন্য তা ইতিবাচক হবে। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত সবখানেই রোববার আলোচনার শীর্ষে চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার খবর।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চলমান অভিযানে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী বেশ কয়েক নেতা নাখোশ হলেও সারা দেশের সাধারণ মানুষ অনেক খুশি। অভিযানে দেশের মানুষ সমর্থন দিচ্ছে। এতে জনগণের কাছে সরকার ও আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে বলেও মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা যুবলীগ নেতা সম্রাটের প্রতি গত বছরের সেপ্টেম্বরেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী তখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়ার আগে গণভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের কমিটি ভেঙে দিতে বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর তখন ক্ষোভের কারণ ছিল ঢাকায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ভবন নির্মাণে সম্রাটের এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর গত এক বছরে কমিটি তো ভাঙেইনি, বরং সম্রাট আরো শক্তিশালী হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশের পর মাত্র কিছুদিন সম্রাটকে সিঙ্গাপুরে গিয়ে থাকতে হয়।

তার নির্দেশের পরও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের যে কয়েক নেতা সম্রাটকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়েছেন, তার অপকর্মে মদত দিয়েছেন, তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেসব নেতাও আতঙ্কে ভুগছেন।

দলীয় সূত্র বলছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকায় ক্যাসিনো-কাণ্ডে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে তারা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েক কেন্দ্রীয় নেতার নামে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।

ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো নেতা ক্যাসিনো খেলতে যেতেন, কারা ক্যাসিনো কারবারের ভাগ নিতেন, তার একটি তালিকা সরকারপ্রধানের কাছেও জমা দিয়েছেন সরকারি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা। এখন সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদের পর এ তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারে।

তথ্যমতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক যাওয়ার আগে গণভবনে দলের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তার কার্যালয়ের তৈরি করা একটি প্রতিবেদন পড়ে শোনান।

তিনি ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সরকারি দলের নেতাদের সম্পর্কে অভিযোগগুলো বর্ণনা করে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা জানতে চান।
তখন সেখানে উপস্থিত আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে ‘অ্যাকশনে’ যাওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি নিজেও ওই নেতাদের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

দলের নেতাদের সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, ‘আপনারা কাউকে বাঁচাতে কোনো তদবির করবেন না আমার কাছে। কে কাকে আশ্রয় দেন, সব খবর আছে আমার কাছে।’

আওয়ামী লীগপ্রধান যখন এ কথা বলছিলেন, তখন দলের শীর্ষস্থানীয় কয়েক নেতার মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল বলে জানায় বৈঠকে উপস্থিত সূত্র।

সোনালীনিউজ/এমটিআই