বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬

ক্ষমতার অপব্যবহারে ঢাকা পড়ছে উন্নয়ন

জুবায়ের আহমেদ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১২ মার্চ ২০২০, বৃহস্পতিবার ০১:৫৯ পিএম

ক্ষমতার অপব্যবহারে ঢাকা পড়ছে উন্নয়ন

ঢাকা : ২০০৮ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে সরকার গঠন করা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার আগে আর কোনো দল সরকার গঠন করে এক মেয়াদের বেশি সরকারে থাকতে পারেনি।

১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সরকার গঠনের পর ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে টানা  দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করলেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচন বর্জন করায় আন্দোলনের মুখে পুনরায় নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল বিএনপি এবং ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

তখন থেকে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত প্রতি পাঁচ বছর পরপর ক্ষমতার হাতবদলের ফলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হতো না, বহু প্রকল্প আটকে যেত সরকার পরিবর্তনের কারণে। জনসাধারণের মধ্যেও আক্ষেপ থাকত এ নিয়ে এবং অনেকেই প্রত্যাশা করতেন একাধিকবার কোনো দল সরকার গঠন করবে এবং দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটবে।

২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে। একই সরকার টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে বিভিন্ন মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই এবং উন্নয়নের সুফলও পাচ্ছে দেশের মানুষ। কিন্তু একই দল টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে দলের বহু সুবিধাভোগী নেতাকর্মী এবং অনুপ্রবেশকারীরা ক্ষমতাকে নিজেদের চিরস্থায়ী সম্পদ মনে করে লুটপাট করছে যে যার মতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছার কারণেই এসব অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া ব্যক্তি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ধরাকে সরাজ্ঞান করা ব্যক্তিদের ধৃত করার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হলেও মূলত এর মাধ্যমেই প্রকাশ হচ্ছে ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে দেশকে বিভিন্নভাবে অস্থিতিশীল করার মতো বিষয়সমূহ।

একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মাথাপিছু আয়, অর্থনৈতিক ঝুঁকি হ্রাস ও মানবসম্পদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হলেই রাষ্ট্রকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র বলা যায়।  ক্ষেত্রে গড়ে মাথাপিছু আয় বাড়লেও প্রান্তিক পর্যায়ে অর্থাৎ সাধারণ নাগরিকদের ভাগ্যের বদল হয়নি। বরং যাদের পর্যাপ্ত টাকা আছে, তাদেরই আরো টাকা হচ্ছে, সাধারণ মানুষেরা সাধারণই রয়ে গেছে।

বেকার সমস্যার সমাধান করতে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলেও বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই, সেই সঙ্গে এখনো অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে থাকা বহু মানুষের বসবাস বাংলাদেশে, যাদের হঠাৎ চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে সহযোগিতা চাইতে হয়, কন্যাসন্তানকে বিবাহ দেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তার জন্য মানুষের দ্বারস্থ হতে হয়।

সব শ্রেণির মানুষের তিন বেলা খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার অধিকার অনেকটাই নিশ্চিত হলেও এখনো বহু মানুষ দেখা যায়, দেশের জেলা শহরগুলোতে, যাদের খাবার নিশ্চিত হয় অন্যের সহায়তার মাধ্যমে, গৃহহীন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। অবশ্য মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকার গৃহহীনদের পাকা ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে এবং ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বহু মানুষ পাকা গৃহ পেয়েছেও। সব মিলিয়ে উন্নয়নের যে আসল রূপরেখা, সেদিকে পৌঁছাতে পারেনি সরকার, এর মূলে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি এবং বিভিন্ন প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থের লুটপাট, কী পরিমাণে দুর্নীতি হচ্ছে দেশে, তা প্রকাশ্য বিষয়। রূপপুরের বালিশকাণ্ডের মতো অসংখ্য ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। পুকুরে ভরপুর এবং কৃষিপ্রধান দেশের মানুষকেও নাকি পুকুর খনন এবং বিভিন্ন কৃষিজ পণ্যের চাষ ও উৎপাদন বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে যেতে হয় দলবল নিয়ে—জাতির সঙ্গে এর চেয়ে বড় তামাশার আর কী হতে পারে!

যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, সরকারি দপ্তরগুলোতে নাগরিক সেবার মান উন্নয়ন, ডিজিটালাইজেশন, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি, মাদক কারবারিদের প্রতিহত করা, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমন, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ উল্লেখযোগ্য আরো বহু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে সরকারের সফলতা বলা গেলেও সরকারি দলের বড় বড় নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির নেতাকর্মীদের ক্ষমতার দাপটে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া, অর্থ পাচার, ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংক লুটপাট, ক্ষমতা ব্যবহার করে নিরীহ মানুষদের প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড, প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের জন্য প্রশাসনকে ব্যবহারসহ অসংখ্য কর্মকাণ্ডের কারণে ঢাকা পড়ছে সরকারের উন্নয়ন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পর দেশের সর্বোচ্চ পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তি হলেও নিজেকে জনসাধারণের কাছাকাছিই রেখেছেন সব সময়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগে এ বিষয়ে অবগত হলেও তিনি মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অধিক নিরাপত্তা গ্রহণ করেননি, জনসাধারণের কাছাকাছি থাকা এবং তাদের ভাগ্যের উন্নয়নকেই প্রাধান্য দিয়েছেন সব সময়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য চেষ্টার কমতি রাখছেন না।

কিন্তু সরকারি দলে অনুপ্রবেশকারী এবং অসাধু-স্বার্থ উদ্ধারকারী ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যাহত হচ্ছে দেশের স্বার্থ, বিভিন্ন বিষয়ে তাদের অপকর্মের কারণে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের মর্যাদা, ঢাকা পড়ছে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সেই সঙ্গে দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণেও বাধাগ্রস্ত হতে হচ্ছে, যা কাম্য নয়।

কাজেই ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে যারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছে, দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে, যারা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে, অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ছে, সর্বোপরি সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে তাদের শক্ত হাতে প্রতিহত করার কোনো বিকল্প নেই, মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য এবং দেশকে সত্যিকার অর্থেই এগিয়ে নেওয়ার জন্য যেসব কার্যক্রম গ্রহণ ও পদক্ষেপ নিতে হয়, প্রত্যাশা থাকবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেসব কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করবেন।

লেখক : শিক্ষার্থী, ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম)


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।