সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬

ছেলেধরা গুজব

গণপিটুনিতে নিহত নারীসহ ৭ জন, বাড়ছে আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৯, শনিবার ০৮:২৭ পিএম

গণপিটুনিতে নিহত নারীসহ ৭ জন, বাড়ছে আতঙ্ক

ঢাকা : ছেলে ধরা সন্দেহে সারাদেশে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি জেলায় ছেলে ধরা সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

গত এক সপ্তাহে রাজধানীসহ সারাদেশে ছেলে ধরা সন্দেহে নারীসহ সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নেত্রকোনায় এক ব্যক্তির কাছ থেকে নিহত শিশুর বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়েছে। ক্ষুব্ধ জনতা তাকে পিটিয়ে মেরেও ফেলেছে। এতে করে রাজধানীসহ সারাদেশে ছেলে ধরা আতঙ্কে রয়েছেন অভিভাবকরা। প্রাইমারি ও হাইস্কুল এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রশাসন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে রয়েছে উৎকণ্ঠা।    

শনিবার (২০ জুলাই) রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে বোরখা পরিহিত এক নারীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। আজ শনিবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে উত্তর বাড্ডার কাঁচাবাজারের সড়কে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই নারীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ছেলেধরা সন্দেহে এক নারী গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। পুলিশ গিয়ে ওই নারীকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকা : রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় সকালে অজ্ঞাত এক নারী নিহত হয়েছেন।

বাড্ডা থানার পরিদর্শক ইয়াসিন গাজী জানান, সকাল ৮টার দিকে উত্তর বাড্ডা সরকারি স্কুলের সামনে অজ্ঞাত এক নারীকে (৪২) সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে ছেলেধরার গুজব সৃষ্টি হলে স্থানীয়রা তাকে গণপিটুনি দেয়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে যেয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

গত ১৩ জুলাই রাজধানীর আদাবর এলাকায় গণপিটুনিতে মারা যায় এক যুবক। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, স্থানীয় নবোদয় হাউজিং এলাকায় ওই লোক সন্দেহজনক ভাবে ঘোরাফেরা করছিল। এ কারণে লোকজন তাকে ছেলে ধরা হিসেবে আখ্যায়িত করে তাকে আটক করে। লোকজনের মারপিটে মারা যায় লোকটি।   

কেরানীগঞ্জ: সকালে উপজেলার রসুলপুর গ্রামে গণপিটুনিতে এক যুবক নিহত এবং অপর একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ৮টা ৩০ মিনিটের দিকে দুই যুবক কয়েকজন শিশুর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। এ সময় স্থানীয়রা ছেলেধরা সন্দেহে তাদের গণপিটুনি দিলে দুজনই গুরুতর আহত হন।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের উদ্ধার করে একজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং অপরজনকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপপরিদর্শক চুন্নু মিয়া জানান, দুজনের মধ্যে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া যুবককে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

নারায়ণগঞ্জ: সিদ্ধিরগঞ্জে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক স্থানে দুজনকে গণপিটুনি দিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে অজ্ঞাত এক যুবকের মৃত্যু এবং শারমিন (২০) নামে এক নারী আহত হন।
সকাল ৮টায় মিজমিজির আলামিন নগর এলাকার রাজমিস্ত্রী সোহেলের সাত বছরের মেয়ে সাদিয়াকে অপহরণ করার সন্দেহে অজ্ঞাত যুবককে আটক করে গণপিটুনি দেয় এলাকাবাসী।
পুলিশ গুরুতর অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনার দুই ঘণ্টা পর মিজমিজির শাপলা চত্বর এলাকায় ফাইজুল ইসলাম লাবিব নামে চার বছরের শিশুকে অপহরণ করার সন্দেহে এক নারীকে গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। পরে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক শাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে সাদিয়াকে অপহরণের ব্যাপারে কোনো সত্যতা মেলেনি। নিহত যুবক গুজবের শিকার বলে ধারণা হচ্ছে।
অন্যদিকে, লাবিবের নানি খাদিজা আক্তার জানান, শারমিন তাদের ফ্ল্যাটে ঢুকে বিভিন্ন অসংলগ্ন কথা বলেছিলেন। এতে সন্দেহ হলে এলাকাবাসী তাকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে বেঁধে রাখেন। পরে পুলিশ খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

নেত্রকোনা: নেত্রকোণার দুর্গাপুরে ছেলে ধরা সন্ধেহে টিএস খাঁন নামে কিশোরকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করছে স্থানীয়রা। শনিবার বেলা ১২ টায় পৌর শহরের সাধুপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।

পরে পুলিশ গিয়ে কিশোরটিকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। আহত কিশোর উপজেলার কাকৈরগড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বিলাসপুর গ্রামের মুক্তার মিয়া ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে সোমেশ্বরী নদীর বেরিবাধঁরে পাড় ধরে সাধুপাড়া এলাকায় একটি বাড়িতে ডুকে যায় ওই কিশোর। এই সময় বাড়ির ভিতরে থাকা এক মহিলা ছেলে ধরা ভেবে চিৎকার শুরু করে।তার চিৎকার শুনে আশপাশে স্থায়ী বাসিন্দারা ছুটে এসে কিশোরটি ধরে বেদম পিটুনি দেয় । এক পর্যায়ে গাছের সাথে বেধেঁ ফেলে স্থানীয়রা।

এ খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে কিশোরটি উদ্ধার করে দুর্গাপুর থানা পুলিশ সদস্যরা । পরে আহত কিশোরটি দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় চিকিৎসা শেষে থানায় নিয়ে যায় ।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আকরাম খাঁন জানায়, আমার ওয়ার্ডের কিছু বাসিন্দা বেলা ১২টার দিকে আমাকে মোবাইল ফোনে জানা তারা একটি ছেলে ধরা আটক করেছে। খবর শুনে ঘটনাস্থলে যাই এবং পুলিশকে খবর দিয়ে তাদের হাতে ছেলেটি বুঝিয়ে দেই ।

তবে আহত কিশোর টিএস খাঁন জানায়, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতা থাকায় কোনো কাজ করতে না পাড়ায় পেটের দায়ে ভিক্ষা করে খাই। আর তাই ভিক্ষা চাইতেই একটি বাড়িতে ফেলে আমাকে ধরে গাছের সঙ্গে বেধে সবাই মিলে মারতে শুরু করে। আমি কথা বলার চেষ্টা করলে তারা আরো বেশি করে মারতে শুরু আমাকে। আমার পিঠ, হাত পাসহ সব জায়গায় মেরেছে তারা ।

এ বিষয়ে দুর্গাপুর থানার তদন্ত ওসি মীর মাহাবুব রহমান জানায়, ছেলেটিকে চিকিৎসা শেষে থানায় দিয়ে এসেছি। প্রাথমিকভাবে অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি তার। আসলে মানুষ আতংকের বসেই ছেলে ধরা ভেবে মেরেছে। তবে সবাইকে সর্তক থেকে কোনো গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অরপদিকে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুর ঘোনার কাঠালিয়া বাজারে গত ১০ জুলাই রাতে ছেলে ধরা সন্দেহে লোকজন অজ্ঞাত এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় ডুমুরিয়া থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। আটকরা হলেন স্থানীয় মেহেদী মোড়ল ও মধুসুধন মন্ডল।

ডুমুরিয়া থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বিপ্লব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্যহীন বলে গ্রামবাসীর কাছে তিনি জানতে পেরেছেন।

এছাড়া সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা শহরে ছেলে ধরা সন্দেহে অজ্ঞাত ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি গণপিটুণিতে মারা গেছে।
অপরদিকে গতকাল শুক্রবার বান্দরবান জেলা শহরের বালাঘাটা এলাকার পাহাড়ি অঞ্চলে ছেলেধরা সন্দেহে এক রোহিঙ্গা তরুণীকে (১৮) পিটুনি দিয়ে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা। আহত তরুণীর দাবি, তিনি ধর্ষণ থেকে বাঁচতেই পালাচ্ছিলেন। এক কিশোরকে দেখে তার সাহায্য পেতে ডাক দেন।

স্থানীয়রা জানায়, বালাঘাটার লেমুঝিরি ও অক্ষ্যংঝিরির মাঝামাঝি পাহাড়ে গরু  চরাচ্ছিল বিজয় ইসলাম শুভ (১৫) নামের এক কিশোর। এ সময় আটক তরুণী ও আরও তিন তরুণ তাকে ধাওয়া করে। পরে কিশোরের চিৎকারে এলাকাবাসী ওই তরুণীকে ধরে ফেলেন।

এ বিষয়ে অক্ষ্যংঝিরির বাঙালি পরিবারের সন্তান কিশোর বিজয় ইসলাম জানায়, সে গরু চরানোর সময় হঠাৎ ওই তরুণী এসে তাঁকে ডাক দেয় এবং সঙ্গে যাওয়ার জন্য বলে। কিন্তু সে যেতে অস্বীকার করলে তরুণী তাকে ধাওয়া করে। এ সময় আরও তিন তরুণ এসে তাকে ঘেরাও করার চেষ্টা করে। তখন সে চিৎকার দিলে তরুণ তিনজন পালিয়ে যায়। অন্যদিকে স্থানীয় লোকজন এসে পালানোর সময় পড়ে যাওয়া তরুণীকে ধরে ফেলে।

জানা গেছে, বান্দরবান সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই রোহিঙ্গা তরুণীর নাম রোকেয়া বেগম (১৮)। সে জানায়, সে ছেলেধরা নয়। থাকে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে। বিবাহিত এ তরুণীর স্বামীর নাম হামিদ উল্লাহ। শরণার্থী শিবির থেকে চিকিৎসার জন্য বাবার সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে গিয়েছিল।

রোহিঙ্গা তরুণীর তথ্য মতে, শুক্রবার (১৯ জুলাই) সকালে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বের হলে তিন যুবক তাকে ট্যাক্সিতে তুলে সরাসরি বান্দরবানে নিয়ে আসে। এরপর ওই পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে তারা তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। সে পালানোর চেষ্টা করার সময় পথে ওই কিশোরের দেখা পায় এবং কিশোরের কাছে সাহায্য চায়। কিন্তু কিশোরটি ভুল বুঝে চিৎকার দিলে এলাকাবাসী এসে তাকে ধরে ফেলে এবং পিটুনি দেয়।

রোকেয়া বেগম ভাষ্য মতে, যে তিন তরুণ তাকে চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবানে নিয়ে আসে, তাদের নাম রহমত উল্লাহ, আয়াত উল্লাহ ও জাবেদ। তাদের নাম জানতে পারলেও তাদের ঠিকানা জানতে পারেনি সে।

বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা তরুণীকে চট্টগ্রাম থেকে কারা কীভাবে কী উদ্দেশ্যে নিয়ে এসেছে, তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। মারধরে তরুণীটি সামান্য আহত হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন  দেয়া হচ্ছে। এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তবে দেশব্যাপী যে ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে কান না দিয়ে এবং আতঙ্কিত না হওয়ার জন্যও সবার প্রতি আহ্বান জানান ওসি।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue