বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬

‘গণপিটুনির ভয়ে পলাতক ছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম’

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ জুন ২০১৯, বুধবার ০৯:৩৫ পিএম

‘গণপিটুনির ভয়ে পলাতক ছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম’

ঢাকা: ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। থানা হাজত, প্রিজন ভ্যান ও আদালতের কাঠগড়া ঘুরে তার ঠিকানা এখন ঢাকার কেরাণীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার। মাদরাসা ছাত্রী নুসরাতকে আপত্তিকর প্রশ্ন ও তা ভিডিও করে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে রোববার (১৬ জুন গ্রেপ্তারের পর গতকাল দুপুরে তাকে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতে হাজির করা হয়।

আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন আবেদন করলেও প্রায় ৩০ মিনিটের দীর্ঘ শুনানি শেষে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামস জগলুল হোসেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় আগামী ৩০ জুন চার্জ গঠনের জন্য তারিখ ধার্য করেন বিচারক। ওই মামলায় গত ২৭ মে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার ২০ দিন পর গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হয় মোয়াজ্জেমকে।

এর আগে রোববার (১৬ জুন) দুপুরে রাজধানীর হাইকোর্টের কদম ফোয়ারা চত্বর থেকে গ্রেপ্তারের পর তাকে নেয়া হয় শাহবাগ থানায়। রোববার (১৬ জুন) রাতভর থানা হাজতে থাকার পর সোমবার (১৭ জুন) সকালে মোয়াজ্জেম হোসেনকে ফেনীর জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুপুর সাড়ে বারোটার কিছু সময় পর শাহবাগ থানা থেকে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।

রাখা হয় ঢাকা মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতের গারদখানায়। মোয়াজ্জেম হোসেনকে আদালতে হাজির করার আগ থেকে বাড়ানো হয় মহানগর দায়রা জজ আদালত চত্বর এলাকার নিরাপত্তা। একই সাথে বিতর্কিত ওসি মোয়াজ্জেমকে দেখতে আসা আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ও সামলাতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। মহানগর দায়রা জজ আদালত ভবনে স্থাপিত সাইবার ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। দুপুরের বিরতির পর ঘড়ির কাটায় দুটো বাজতেই এজলাসে উঠেন বিচারক। দুপুর দুইটা থেকে দুইটা ২০ মিনিট পর্যন্ত চলে ট্রাইব্যুনালের নিয়মিত মামলার কার্যক্রম। ঠিক দুইটা ২০ মিনিটে আদালতের বারান্দা দিয়ে কাঠগড়ায় হাজির করা হয় সোনাগাজী থানার সাবেক ওসিকে। চোখে রোদ চশমা পরে এজলাস কক্ষে ঢুকলেও কাঠগড়ার ওঠার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা খুলে ফেলেন মোয়াজ্জেম হোসেন।

এসময় তার হাতে হাতকড়া না পরানোয় হট্টগোল শুরু হয় আইনজীবীদের মধ্যে। একজন আইনজীবী বলে ওঠেন ‘আইন সবার জন্য সমান, অসুস্থ রোগিকে হাতকড়া পরতে হলে ওসিকেও পরাতে হবে’। এমন বাকবিতণ্ডার মধ্যে বিচারক সবাইকে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দেন। এর পরপরই শুরু হয় শুনানির কার্যক্রম। শুরুতে মামলার বাদী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন আদালতকে বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম আইনের সেবক হয়েও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাননি। আদালত যেদিন তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন তারপর তিনি সরাসরি আপনার আদালতে হাজির হতে পারতেন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে পারতেন। কিন্তু ওসি মোয়াজ্জেম তা না করে পালিয়েছিলেন। সৈয়দ সায়েদুল হক আদালতের কাছে বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম যে ঘটনা ঘটিয়েছেন তা পুলিশ বাহিনীর জন্য কলঙ্ক। বিশ দিন ধরে পালিয়ে থেকে তিনি আরো দুইটি অপরাধ করেছেন। ওসি মোয়াজ্জেম নিজে আদালতে হাজির হলে ব্যক্তি হিসেবে এবং পুলিশ বাহিনী একটি সংগঠন হিসেবে সংশোধনের সুযোগ পেত। আমরা ভেবেছিলাম তিনি শুরুতেই সারেন্ডার করবেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন সাইবার ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম শামীম।

অন্যদিকে, আসামি মোয়াজ্জেমের জামিন চান তাঁর আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ। মোয়াজ্জেমের পক্ষে আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ আদালতকে বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তিনি পলাতক ছিলেন না, পত্রিকার মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবর জানতে পেরে আইনের আশ্রয় নেয়ার জন্যই তাঁর মক্কেল হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশে ছিলেন, পালিয়ে যাননি। গত রবিবার হাইকোর্ট বিভাগে ওসি মোয়াজ্জেমের আগাম জামিন শুনানি হওয়ার কথা ছিল। তবে আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ না দিয়ে পুলিশ তাঁকে হাইকোর্ট চত্বর থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় বলে আদালতে জানান মোয়াজ্জেম হোসেনের আইনজীবী। ফারুক আহম্মেদ আদালতের কাছে বলেন, আপনারা সবাই বলছেন তিনি পলাতক ছিলেন, আসলে ওসি মোয়াজ্জেম পলাতক ছিলেন না। এ সময় আদালত আইনজীবীকে ‘সবাই’ বলতে কি বোঝাচ্ছেন তা জানতে চান।

মোয়াজ্জেমের আইনজীবী বলেন, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের ভয়ে ওসি মোয়াজ্জেম আত্মগোপনে ছিলেন। রাস্তায় বের হলে নানান লোকজন নানা মন্তব্য করছিল। মূলত নিরাপত্তাহীনতায় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। এ সময় আদালত বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হয়ে নিরাপত্তাহীনতা! আদালত হচ্ছে আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। আপনি আদালতে আসলেন না কেন? পরে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের আইনজীবী বলেন, আমার মক্কেল রিলিফ নেয়ার জন্য একটু সময় নিয়েছিলেন। জনগণ অনেক ফেরোসাস (নৃশংস) হয়ে উঠেছিল বলে উল্লেখ করে ওসি মোয়াজ্জেমের আইনজীবী বলেন, আমরা অনেক সময় দেখেছি চুরি না করেও অনেক মানুষকে গণপিটুনিতে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেক ছিনতাইকারীকে মেরে ফেলা হয়েছে। এমন উত্তেজিত মানুষজনের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।

এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নুসরাতের বক্তব্য ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ছড়াননি বলেও আদালতকে জানান আইনজীবী। আদালত জিজ্ঞেস করেন, আপনি ধারণ করেছেন কি না, ইয়েস অর নো? আইনজীবী কোন উত্তর না দেয়ায় আদালত বলেন, ইউ আর টুইস্টিং। তবে এক সময় আইনজীবী বলেন, অনেক সময় বাদী এজাহারে উল্লেখ করা নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসেন। এরকম সরে আসার প্রবণতা থেকে আগাম সতর্কতা হিসেবে বক্তব্য ধারণ করা হয়। আাদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এই মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ৩০ জুন নতুন দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতের আনা-নেয়ার মাঝের সময়ে আলোকচিত্রীদের আড়াল হবার চেষ্টা করেন ওসি মোয়াজ্জেম। অনেক পুলিশ সদস্যও হাত উঁচিয়ে ছবি তোলায় বাধা হয়ে দাঁড়ান।

গত ৬ এপ্রিল নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত। এর ১০ দিন আগে নুসরাত মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ জানাতে সোনাগাজী থানায় যান নুসরাত। থানার তখনকার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন নুসরাতকে আপত্তিকর প্রশ্ন করে বিব্রত করেন এবং তা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। ওই ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলে আদালতের নির্দেশে সেটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই গত ২৭শে মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিলে ওই দিনই ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল। সূত্র: মানবজমিন।

সোনালীনিউজ/এমএইচএম

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue