বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬

গাছে ঝুঁকছে নগরবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৫ জুন ২০১৯, মঙ্গলবার ০১:৫৫ পিএম

গাছে ঝুঁকছে নগরবাসী

ঢাকা : চলমান ত্রাহি গরমে দুপুরের রোদে সবুজ পাতার মধ্যে লাল করমচাগুলো চকচক করছে। যেন সবুজের মাঝে লাল সিঁদুর। গাছে গাছে ধরে আছে আম, জাম, আলুবোখারা, লাল শরিফা, জামরুল, লটকন। আছে আনারসও।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাণিজ্যমেলার মাঠে আয়োজিত বৃক্ষমেলায় গেলে দেখা মিলবে এমন দৃশ্যের। মেলার এমন সবুজ পরিবেশ টানছেও দর্শনার্থীদের। এদিকে বিক্রেতারা বলছেন, ইট-পাথরের বহুতল জঙ্গলের মধ্যে একটু প্রশান্তি পেতে অনেকে যেখানে পারছে, সেখানে গাছ লাগাচ্ছে। এ কারণে গাছ কিনতে প্রচুর মানুষ আসছে মেলায়। দেখতেও আসছে অনেকে।

গত ২০ জুন শুরু হয়েছে মাসব্যাপী জাতীয় বৃক্ষ মেলা। চলবে আগামী ১৯ জুলাই পর্যন্ত। মেলায় ১০৪টি স্টলে নানা প্রজাতির ফুল, ফল, ঔষধি, শোভাবর্ধনকারী গাছ বিক্রি হচ্ছে। আরো আছে গাছ লাগানোর ও পরিচর্যার সরঞ্জাম, বই, ফুলের টব, বীজ, সার। কেউ কেউ গাছ লাগানোর মাটিও বিক্রি করছেন।

তবে এসব ছাপিয়ে এ মেলা পরিণত হয়েছে বিশাল আমবাগানে। মেলার প্রতিটি স্টলে বিভিন্ন প্রজাতির আমের চারা সাজিয়ে রেখেছেন মালিকরা। ড্রামে তৈরি কলমের গাছে থোকায় থোকায় আম শোভা পাচ্ছে, যা সহজেই দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। মেলা উদ্বোধনের দিন প্রধানমন্ত্রী নিজেই গাছে ঝুলে থাকা এমন আম দেখে আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

এ ছাড়াও মেলায় মিলছে চার কেজির আম এবং লাখ টাকার ক্যাকটাস।

মাসব্যাপী জাতীয় বৃক্ষমেলায় দেশের নামিদামি নার্সারি মালিকরা স্টল নিয়ে গাছের পসরা সাজিয়েছেন। দেশি-বিদেশি প্রায় হাজার প্রজাতির গাছ স্থান পেয়েছে এবারের মেলায়।

জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষ মেলা-২০১৯ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর তিনি মেলার বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। একই সঙ্গে তিনি গাছে ঝুলে থাকা আম নেড়েচেড়ে দেখেন।

সরেজমিন বৃক্ষ মেলা পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, সেখানে দেশের সরকারি-বেসরকারি ১৭২টি প্রতিষ্ঠানের স্টল রয়েছে। দেশের নামিদামি নার্সারি মালিকরা তাদের উৎপাদিত বিভিন্ন ফল, ফুলসহ হাজার প্রজাতির গাছের চারা সাজিয়ে বসেছেন ক্রেতাদের জন্য।

মেলা ঘুরে দেখা যায় প্রচুর বিদেশি গাছ। থাই শোভাবর্ধনকারী এলেরিয়া গাছ দেখতে দেশি আলুপাতার মতো। বৃক্ষ মেলায় আছে থাইল্যান্ডের গ্রাফটিং করা থাই আম ‘ই টু আর টু’। আছে চার কেজি ওজনের আম ‘ফোর কেজি’। বিদেশি ‘গোল্ডেন বল’ ক্যাকটাসের দাম লাখ টাকার মতো। আরো আছে থাইল্যান্ড থেকে আনা ক্যাকটাস। বিক্রেতারা জানান, এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং যত্নে খরচ বেশি, তাই দামও বেশি।

মেলা ঘুরে দেখা যায়, মা-বাবার সঙ্গে শিশুরাও এসেছে। তারা বেশ আগ্রহ নিয়েই বিভিন্ন ধরনের গাছ দেখছে। গাছের ঝুলে থাকা ফল তাদের আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মেলায় দেখা গেছে, মালয়েশিয়ার মিল্ক কোকোনাট, গন্ধযুক্ত সাদা রঙের অ্যারোমেটিক জুঁই, মিসরীয় ডুমুর, থাই সফেদা, থাই পদ্ম, আমাজন লিলি, প্যারাডাইস, পয়েন, সৌদি খেজুরগাছ, গোল্ডেন বোতলব্রাশসহ আরো অসংখ্য রকমের গাছ। আছে পিচ, ডেউয়া, হানি ডিউ, চায়নিজ মাল্টা, থাই শসা। আরো আছে হরেক রকমের লতা ও গুল্মজাতীয় গাছ। হরেক রঙের এবং দামের ক্যাকটাস, অর্কিড, ঔষধি গাছ মিলবে মেলায়। আছে ঝুমকোলতা (থাই ফ্যাশন ফ্লাওয়ার), জুঁই, কামিনী, ক্যামেলিয়া ফুলের গাছ। ফলের মধ্যে আছে আমলকী, পেয়ারা, লেবু, জাম্বুরা, আমড়া, কামরাঙাসহ হরেক রকমের দেশি-বিদেশি ফল। এগুলোর দাম শুরু হয়েছে ১০০ টাকা থেকে। তবে যেসব গাছে ফল ধরেনি, সেগুলোর দাম আরেকটু কম।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) স্টলে আছে বিলুপ্তপ্রায় নাগলিঙ্গম, মহুয়া, পলাশের চারাগাছ। মেলায় পাওয়া যাচ্ছে সাওয়ারসপ (টক আতা), গাইনুরা, মিসরীয় ডুমুর, ভ্যানিলা অর্কিড, নীল গাছ, চুইঝালগাছ, জয়তুনগাছ (জলপাই)। এগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশি জাতের আমগাছের চারা পাওয়া যাচ্ছে। ঘাসও কেনা যাবে মেলা থেকে।

নিজের ফ্ল্যাটের বারান্দায় ছোট মসলার বাগান করবেন আশা বারী। নিজের ছোট্ট সন্তানকেও এই কাজে যুক্ত করবেন। তার জন্য বিভিন্ন ধরনের মসলার গাছের চারা কিনছেন। একটি মসলার গাছ কিনবেন বলে দরদাম করছেন। লিভিং আর্ট নামের একটি স্টলে সালমা শিরিন সেই গাছের দাম হাঁকছেন। সালমা শিরিন জানালেন, এই গাছের পাতা যে কোনো মাংস রান্নার সময় ছিঁড়ে দিলে তা মসলার কাজ করবে।

মেলায় আছে মডেল সুন্দরবন। ‘সুন্দরবন কর্নার’ নামের ওই মডেল বন তৈরি করেছে বন বিভাগ। সেখানে বটগাছে ঝুলছে মাটির বানর। আরো আছে মাটির তৈরি বাঘ, চিত্রাহরিণ, কুমির ও বক। আছে কৃত্রিম নদীও। নদীর পাড়ে নৌকায় রাখা শুকনো গোলপাতার ডাল।

বৃক্ষ মেলায় স্টল নিয়েছে কৃষিবিদ উপকরণ নার্সারি। কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার খন্দকার শরিফুল আলম রানার সঙ্গে। তিনি বলেন, আমের এখন অনেক জাত রয়েছে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বিভিন্ন জাতের আম আবিষ্কার করছেন। দেশে এখন প্রায় সাড়ে তিনশ জাতের আম রয়েছে। এক নার্সারিতে সব জাতের চারা পাওয়া সম্ভব না।

তিনি বলেন, আম, ফুল, ফল, সবজি, বনজ, ঔষধি মিলে এ বছর ১ কোটি চারা তৈরি করেছি। এ মেলা ছাড়াও সারা বছর এসব চারা বিক্রি করি। ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাড়িতে যারা ছাদবাগান করছেন তাদেরও আমরা চারা সাপ্লাই দিই।

খন্দকার শরিফুল বলেন, এ মেলায় শুধু গাছ বিক্রিই নয়, অনেক অর্ডারও নেন। গত বছর তারা ৯০ লাখ গাছের চারা তৈরি করেছিলেন। বিক্রিও ভালো হয়েছিল। আশা করছেন এবারো ভালো সাড়া পাবেন।

রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা শাজাহান তালুকদার ২৫ হাজার টাকা দিয়ে খিরসাপাত, ব্যানানা ম্যাংগো ও হাড়িভাঙা জাতের তিনটি আমগাছ কিনেছেন। প্রতিটি গাছে প্রায় ১৫-২০টি করে আম ধরে আছে। তিনি বলেন, আম ছাড়াও জামরুল, কতবেল, আতা, মেওয়া ও করমচার চারা নিয়েছেন। বাড়ির ছাদবাগানে এগুলো যুক্ত হবে।

মেলায় গ্রিন ওয়ার্ল্ড নার্সারির মো. তোরাব হোসেন বলেন, ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য অনেকে এখন ইনডোর প্ল্যান্ট কেনেন। এসব গাছ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে রাখা যায়। পানি দিতে হয় কম। দাম একশ থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে।

বৃক্ষ মেলার পরিবেশ অন্য মেলার চেয়ে আলাদা বলে বন্ধুদের নিয়ে দল বেঁধে এসেছেন কলেজছাত্রী যারিন তাসনিম। তিনি বললেন, বৃক্ষ মেলার পরিবেশই অন্য রকম। বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে ও গাছ কিনতে এসেছেন তারা।

কথা হয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের সহকারী বন সংরক্ষক খন্দকার মো. জাকারিয়ার সঙ্গে। মেলার তথ্য কেন্দ্রে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, বৃক্ষরোপণ সম্পর্কে মানুষ এখন অনেক সচেতন হয়েছেন। তাছাড়া শহরের মানুষ এখন ছাদে বাগান করা শিখেছেন। সবাই এখন ফরমালিনমুক্ত টাটকা ফল খেতে চান। বাড়ির ছাদে নিজে গাছ রোপণ করে ফল খাওয়ার মজাই আলাদা।

তিনি আরো বলেন, ১০ বছর আগেও মানুষ এত সচেতন ছিলেন না। নার্সারি মালিকদের ট্রেনিং দিয়ে সচেতন করা হয়েছে বলেই আজ বৃক্ষরোপণ অভিযানে বিপ্লব ঘটছে। মেলায় প্রতিদিন ১০২টি স্টল এবং ৭০টি প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ টাকার চারা বিক্রি হচ্ছে। ২০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকা কেজি দরে সুস্বাদু আম খেতে পারছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৃক্ষ রোপণ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্যই এই মেলার আয়োজন।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শ্যামল কুমার ঘোষ জানান, মেলার প্রথম দিনে ১৪ হাজার ২২৮টি চারা বিক্রি হয়েছে ২২ লাখ ২৮ হাজার ৫০২ টাকায়।

সোনালীনিউজ/এমটিআই