মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

ইউএস-বাংলা ট্র্যাজেডি

ঘুম ভাঙলে আজও মায়ের জন্য কাঁদে ছোট্ট হিয়া

আনোয়ার হোসাইন সোহেল | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১২ মার্চ ২০২০, বৃহস্পতিবার ০৪:০৭ পিএম

ঘুম ভাঙলে আজও মায়ের জন্য কাঁদে ছোট্ট হিয়া

ঢাকা : আজও ঘুম ভাঙলে মায়ের জন্য কেঁদে উঠে ইনায়া ইমাম হিয়া। তাঁর দিন কাটে আনন্দ স্কুলের বন্ধু, দাদি আর বড় চাচার ছেলে মেয়েদের সঙ্গে খেলা করে। চাচী ফাতেমাও চাচা বাবলু নিজের সন্তানের মতোই আদোর করেন হিয়াকে। বলছি ২০১৮ সালের ১২ মার্চ কাঠমান্ডু ট্র্যাজেডিতে নিহত ইউএস-বাংলার কেবিন ক্রু শারমিন আক্তার নাবিলার একমাত্র মেয়ে কথা। 

মায়ের কথা মনে পড়ে জিজ্ঞাসা করতে হিয়া জানায়, মা বিদেশে গেছে। হিয়ার মন হয়ত ঠিকই সেদিন বুঝেছিলো মাম্মা আজ অফিসে গেলে আর তার কাছে ফিরে আসবে না। এখনও কেউ জিজ্ঞেস করলে হিয়া বলে ‘মাম্মা অফিসে গেসে’। কখন বলে মাম্মা উপর থেকে পড়ে গেছে। 

হিয়ার চাচা বাবু জানান, বিমান দুর্ঘটনার পর থেকে হিয়া আমাদের সঙ্গে থাকছে। হিয়াকে আমরা নিজেদের সন্তানের মতোই মানুষ করার চেষ্টা করছি। আমার আম্মা (হিয়ার দাদী) ও তাঁর চাচী সার্বক্ষণিক হিয়ার দেখাশুনা করে। নাবিলার স্বপ্ন ছিল মেয়েকে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তোলা। আমরা তার স্বপ্ন পূরণ করবো। সে আমার বোনের মত ছিল। দীর্ঘ ফ্লাই করে আসার পরও কখনো মেয়ের ওপর রাগ হতো না। মেয়ের সব আবদার পুরণ করতো। নিজে এতো পরিশ্রম করলেও সব সময় হাসিমুখে থাকতো নাবিলা।

নাবিলার মা মাঝে মধ্যে এসে নাতনীকে দেখে যান। দুর্ঘটনার পর তিনি তাকে নিজের বাসায় নিয়ে যেতে চেয়েছেন কিন্তু হিয়া তার দাদীর কাছেই থাকতে পছন্দ করায় তাকে দাদীর তত্ত্বাবধানে দেয়া হয়। 

অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিল নাবিলা। টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতেন। এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে বিবিএ ফার্স্ট সেমিস্টারে পড়ার সময় পরিচয় হয় আনান আহমেদের সঙ্গে। ২০১৪ সালে নাবিলা-আনান বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ার শ্বশুর বাড়িতেই নিজের বাবা-মার ভালোবাসা পান। স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির সমর্থনেই কেবিন ক্রু হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ২০১৫ সালে শুরু হয় নাবিলার রোমাঞ্চকর পেশা। কিছুদিন পর গর্ভবতী হওয়ায় ৬ মাস অবসরে থাকলেও আবারও স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু। চাকরিতে ছয় মাসের ঘাটতি পূরণে অনেক পরিশ্রম করতেন বলে জানিয়েছেন নাবিলার শাশুড়ি। 

২০১৬ সালে জন্ম হয় নাবিলার মতোই দেখতে ফুটফুটে মেয়ে শিশু হিয়ার। খুব শখ করে নাবিলা তার নাম রাখেন ইনায়া ইমাম হিয়া। নাবিলার মেয়ে হিয়ার বয়স এখন ২ বছর ৪ মাস। মায়ের চাকরির জন্য দাদী ও গৃহকর্মীর কাছে থাকতো হিয়া। কিন্তু অফিসে যাতায়াতের সুবিধার্থে  দুর্ঘটনার মাত্র দেড় মাস আগে উত্তরায় বাসা নেন নাবিলা। মাকে যতক্ষণ কাছে পেতো ততক্ষণই আধো আধো কথায় চলতো হিয়ার আহ্লাদ-আবদার। মাকে সে মাম্মা বলেই ডাকে। গত ১২ মার্চ যখন হিয়ার মাম্মা বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিলো তখন তার কী কান্না। কোনভাবেই মাম্মাকে সেদিন অফিসে যেতে দিচ্ছিলনা ছোট্ট হিয়া। কে জানতো এটাই ছিল মায়ে সঙ্গে হিয়ার শেষ দেখা। মায়ের একান্ত কিছু ছবি ও কলিগদের সঙ্গে তোলা কিছু এখনও স্মৃতি হয়ে আছে হিয়ার কাছে।   

উল্লেখ্য, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ওই বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে ছিলেন, পাইলট ক্রুসহ ৫১ জন। নিহতদের মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি। এছাড়া ২৪ জন নেপালি ও একজন চীনা নাগরিক। দুর্ঘটনাগ্রস্ত প্লেনে ছিলেন মোট ৭১ জন আরোহী। প্রথমে ঘটনাস্থলে ২০ থেকে ২৫ জনের মতো নিহত হওয়ার তথ্য জানায় নেপাল। তবে কিছুক্ষণ পর আহতদের হাসপাতালে নিলে দীর্ঘ হয় লাশের সারি।কাঠমান্ডুতে বিমান বিধ্বস্তের পরপরই পাইলট এবং ত্রিভুবন বিমানবন্দরের এয়ারট্রাফিক কন্ট্রোলের কথোপকথন ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কথোপকথন শুনে দুর্ঘটনার জন্য ইউএস-বাংলা ও নেপাল একে অন্যের ওপর দোষারোপ করে। এ ঘটনায় গঠিত নেপাল সিভিল এভিয়েশনের তদন্ত কমিটি ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

সোনালীনিউজ/এএস