বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬

ঘুরে দাঁড়াতেই পারছে না ঢাকা মহানগর বিএনপি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ মে ২০১৯, রবিবার ০৩:৫৩ পিএম

ঘুরে দাঁড়াতেই পারছে না ঢাকা মহানগর বিএনপি

ঢাকা : ঘুরে দাঁড়াতেই পারছে না দলের আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা মহানগর বিএনপি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে এক মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু কেটে গেছে দুই বছর।

ইতোমধ্যে সংসদ নির্বাচনে বিপর্যয় মহানগর বিএনপির কার্যক্রমে স্থবিরতা আরো বাড়িয়েছে। সংগঠনের নড়বড়ে অবস্থার কারণে দিন দিন নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। মূলত দক্ষিণ শাখা বিএনপির সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে এবং উত্তরের সভাপতি এম এ কাইয়ুম বিদেশে থাকায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন প্রক্রিয়া থমকে গেছে।

২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল ঢাকা মহানগর বিএনপি উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে বিভক্ত করে আংশিক কমিটি দেয় বিএনপি। উত্তরে এম এ কাইয়ুম এবং দক্ষিণের শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব পান হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। মামলার কারণে উত্তরের শীর্ষ নেতা বিদেশে থেকে দল পরিচালনা করছেন। পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকাও জমা দিয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে সোহেল মুক্তি পেলে একযোগে উত্তর ও দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে। তাই সোহেল মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির কার্যক্রম স্থবিরই থাকছে।  

সংগঠনিক কার্যক্রমের অবস্থা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিদেশে অবস্থানরত মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম ফোনে বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্য উত্তর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম থেমে থাকেনি। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব কার্যক্রম শেষ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

১৯৯৪ সালের পরে যেসব কমিটি গঠন একেবারেই সম্ভব হয়নি সেসব কমিটি পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে। এক নেতার এক পদের বিধান একমাত্র উত্তর বিএনপিতে কার্যকর করা হয়েছে। ২৬টি থানার ১২১ সদস্যের এবং ৭১ সদস্যের ৫৬টি ওয়ার্ডের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রে জমা দেওয়া হয়েছে। সর্বমোট ৭ হাজার ৩২৩ সদস্যের মহানগর উত্তর কমিটি তালিকা প্রস্তুত আছে। এর মধ্যে একজন নেতাও দুটি পদে থাকছেন না। কেন্দ্রীয় কমিটিতে যারা আছেন তাদেরও এক পদে রাখার ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারা শিগগিরই এসব বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

উত্তর বিএনপির অসন্তোষের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি ও অঙ্গ দলের সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ৭ হাজারের বেশি পদ দিয়ে এক নেতার এক পদের বিধান কার্যকর করা হয়েছে। এজন্য থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে অসন্তোষ না থাকলেও ক্ষোভ আছে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে। কারণ নগরের সিনিয়র নেতাদের রাখা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকায়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা দিচ্ছে না কেন্দ্র। ফলে পদহীন অবস্থায় থাকা প্রায় দেড় শতাধিক নেতা ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে অসন্তোষ আছে।

ক্ষোভ ও অসন্তোষ থেকে সম্প্রতি বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা দাবি জানাতে স্কাইপিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টির জন্য কেন্দ্রে চিঠি দিয়েছেন।

এদিকে মূল দলের  থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন হলেও অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলেরও উত্তরের কোনো পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। ফলে দলকে শক্তিশালী করতে মূল দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি দ্রুত গঠনের দাবি উঠেছে।

এদিকে উত্তরের সাংগঠনিক কমিটি গঠনের কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন হলেও দক্ষিণ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। ২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে সভাপতি ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী আবুল বাসারকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা বিএনপির ৭০ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। ২৬ জন সহসভাপতি, ১৯ জন যুগ্ম সম্পাদক, ১৮ জন সহসাধারণ সম্পাদক, তিনজন সাংগঠনিক সম্পাদক এবং দপ্তর সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষের নাম ঘোষণা করা হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কমিটি অনুমোদন করে এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আজো তা গঠিত হয়নি।

দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সাত মাস ধরে কারাগারে। সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসারের খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা নেই নেতাকর্মীদের কাছে। বলা যায়, এই শাখার কার্যক্রম কার্যত স্থবির। কর্মসূচিগুলোতেও ঘোষিত কমিটির ৭০ জনের মধ্যে মাত্র চার-পাঁচ জনকে অংশ নিতে দেখা যায়।

দক্ষিণের সাংগঠনিক অবস্থা নড়বড়ে হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাবেক ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হাবিব-উন-নবী ঢাকা মহানগরের দায়িত্ব পাওয়ার আগে মহানগরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কমিটি গঠনে নগরের শীর্ষ নেতাদের সহযোগিতাও পাননি। নিজেও যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি। দক্ষিণের প্রভাবশালী দুই নেতা সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসের অনুসারীদের সহযোগিতাও পাননি সোহেল।

এছাড়া দক্ষিণের মহানগরের প্রভাবশালী আরো কয়েকজন নেতার ভিড়ে সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসার তেমন গ্রহণযোগ্যতা পাননি। তার কথায় কর্মীরা পর্যন্ত সাড়া দেয়নি।

মহানগর দক্ষিণের ঘুরে দাঁড়াতে না পাড়ার কারণ প্রসঙ্গে কমিটির একাধিক নেতা বলেন, মহানগরের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাস, সাদেক হোসেন খোকা, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আবদুস সালামের অনুসারীরা মহানগরের রাজনীতিতে অনিভজ্ঞ সোহেলকে মেনে নেননি।

এছাড়া কাজী আবুল বাশারেরও গ্রহযোগ্যতা ছিল না কারো কাছেই। মহানগরের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে অর্থের প্রয়োজন হয়; কিন্তু এই শীর্ষ দুই নেতা কোথাও কোনো অর্থের যোগান দেননি। নগরীর নেতাকর্মীদের মামলা নিষ্পত্তির কোনো খবর রাখেননি। থানা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত রফিকুল ইসলাম বকুলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেকগুলো কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বাণিজ্যের অভিযোগ আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহানগর দক্ষিণের অধীনে থাকা ২৪টি থানার মধ্যে একটি কমিটিও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। তবে আংশিক কমিটি করা সম্ভব হয়েছে ১৮টি থানার। ওয়ার্ড কমিটি গঠনও সম্ভব হয়নি বললেই চলে। নগরের দায়িত্বশীল নেতাদের বেশির ভাগই বলছেন, দক্ষিণ শাখা বিএনপির সভাপতি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকার কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন প্রক্রিয়া থমকে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ শাখা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসার বলেন, সভাপতি কারাগারে থাকার কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা সম্ভব হয়নি।

সোনালীনিউজ/এমটিআই