বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় প্রভাবশালীরা চাপে রাখেন

চাপে চিড়েচ্যাপ্টা ইউএনওরা

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার ০২:৩১ পিএম

চাপে চিড়েচ্যাপ্টা ইউএনওরা

ঢাকা : রাজনৈতিক চাপে চিড়েচ্যাপ্টা মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সূত্র বলছে, সরকারের সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা-ইউএনও এবং জেলা প্রশাসক-ডিসিরা।

অথচ রাজনৈতিক চাপে তাদের বেকায়দায় পড়তে হয় অনেক সময়। বিশেষ করে ইউএনওদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চাপ থাকে সবচেয়ে বেশি। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশাসনে এখন অনেক মেধাবী কর্মকর্তা আছেন। তাদের সততার সঙ্গে এবং চাপবিহীন কাজ করতে দিলে সরকারের সেবা আরো সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে সারা দেশে ৪১০ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজ করছেন। তাদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে সরাসরি কথা হয়েছে সোনালীনিউজ-এই প্রতিবেদকের।

তারা সবাই জানান, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চাপ সামাল দিতে হয় প্রতিনিয়ত। চাপের কারণে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও অনেক সময় সংকটে পড়তে হয়। প্রভাবশালীদের কারণে ইউএনওদের সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে হোঁচট খেতে হয়। তবে প্রকাশ্যে কোনো ইউএনও মুখ খুলতে রাজি হননি।

জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল  আলম বলেন, এটা ঠিক; আমাদের মাঠ প্রশাসনকে অনেক চাপ সামাল দিতে হয়। আমার তো মাঝেমধ্যে মনে হয়, অনেক দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও এতটা চাপ সামাল দিতে হয় না।

বেশ কয়েকজন ইউএনও বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা ইউএনওদের ওপর চাপ তৈরি করে থাকেন প্রতিনিয়ত।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নসহ সবক্ষেত্রেই তারা নিজেদের খেয়ালখুশির বাইরে প্রশাসনকে যেতে দিতে চান না। জানতে চাইলে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ইউএনও মো. কামরুল ইসলাম বলেন, গতকালও (সোমবার) উপজেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির বৈঠক হয়েছে। তার বিস্তারিত আপডেট স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানিয়েছি। তবে আমি তার থেকে কোনো ধরনের চাপ কিংবা প্রভাব পাইনি।

কর্মকর্তারা বলছেন, কাজ করতে গিয়ে প্রভাবশালীদের সামাল দিতে অনেক সময়ই কৌশল হাতে নিতে হচ্ছে। অনেক সময় বিরোধ এতটাই প্রকট হচ্ছে যে, সংশ্লিষ্ট ইউএনওকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য কিংবা অন্য প্রভাবশালী রাজনীতিকরা জনসেবায় যে মানের হওয়া উচিত, অনেকে এর বাইরে।

তারা প্রকাশ্যে অনেক ভালো ভালো কথা বলেন, সভা-সেমিনারে সুশাসনের কথা বলেন। সংসদে দাঁড়িয়েও অনেক ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুমের বাইরে গেলে সব ভুলে যান। প্রশাসন সততার সঙ্গে সেবা দিতে গিয়ে তাদের স্বার্থপরিপন্থী হলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন, বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি প্রত্যাহারের জন্য উচ্চপর্যায়ে তদবির করে থাকেন।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, জনপ্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এতটা চাপ অন্যদের নিতে হয়। ইউএনওদের প্রায় ৩০-৩৫ জন প্রভাবশালীকে ম্যানেজ করে সরকারি সেবা দিতে হয়, যার কারণে অনেক সময় বিচ্যুতি বেরিয়ে আসে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, অনেক সভা-সেমিনারে এসব নিয়ে কথা হয়। তবে কার্যত কোনো উন্নতি হয় না।

টানা তৃতীয় মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার চায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকবে না। বিশেষভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নানা স্তর কঠোরভাবে সংকুচিত করা হবে। প্রশাসনের মনোভাব হবে নির্ধারিত নীতিমালা ও নির্বাহী নির্দেশাবলি বাস্তবায়ন। এর মাধ্যমে সরকার জনগণের আরো কাছাকাছি আসতে চায়।

জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মো. আসলামুল হক বলেন, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন মিলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এখানে কেউ কারো বিরুদ্ধে নয়। সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আমি সেভাবেই কাজ করি। তিনি বলেন, মিরপুরে একসময় সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিল। এখন সেটি আর নেই। সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করার ফলে এমনটি হয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ইশতেহার দেয়। ভোটের রাজনীতিতে এগিয়ে থাকতে প্রতিশ্রুতি দেন প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি। একইসঙ্গে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ ক্ষমতাসীনদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। সরকারের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বেড়েছে।

অন্যদিকে, দেশের মানুষের শিক্ষা ও আর্থসামাজিক অগ্রগতি তৈরি হয়েছে। ফলে মানুষ এখন আগের থেকে অনেক বেশি সচেতন ও দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব লালন করছে।

জানতে চাইলে সাবেক জনপ্রশাসন সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে। আমরা সরকারের শুদ্ধি অভিযানও দেখছি। এতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা আনা গেলে মানুষ হয়রানিবিহীনভাবে সেবা পাবে, দুর্নীতি কমবে এবং অর্থের অপচয় কমবে।

সূত্র বলছে, রূপকল্প-২০২১ এবং ২০৪১-এর উন্নত বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে একটি দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক সেবামুখী প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।

সরকারের প্রচেষ্টা, তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ফলে সরকারি দপ্তরে কাজের দক্ষতা ও পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বর্তমানে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে অহেতুক কালক্ষেপণ এবং কাজের জটিলতা কমিয়ে বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই