মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯, ৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

চামড়া সংকটে নতুন মোড়, ট্যানারিতে বিক্রি বন্ধ

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০১৯, রবিবার ০২:০০ পিএম

চামড়া সংকটে নতুন মোড়, ট্যানারিতে বিক্রি বন্ধ

ঢাকা : সরকারের অনুরোধে গতকাল শনিবার থেকে ট্যানারিগুলোর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু ওইদিন হঠাৎ কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা ট্যানারিগুলোতে চামড়া বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। ট্যানারির কাছে তারা তাদের আগের পাওনা টাকা না পাওয়া পর্যন্ত চামড়া বিক্রি করবে না। এমন পরিস্থিতিতে চামড়া নিয়ে শুরু হচ্ছে নতুন অরেক সংকট।

শনিবার (১৭ আগস্ট) কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের জরুরি বৈঠকের পড়ে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সংগঠনটি বলছে, ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া শত শত কোটি টাকার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত চামড়া বিক্রি বন্ধ থাকবে।

বৈঠক শেষে কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ট্যানারি মালিকদের কাছে যে পাওনা টাকা রয়েছে, তা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত নতুন ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেব না। আজকের মিটিংয়ে সবাইকে নিষেধ করা হয়েছে কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে।

রোববার (১৮ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

তবে ট্যানারি মালিকদের কাছে কত টাকা পাওনা রয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি দেলোয়ার হোসেন।
এরপরেও তিনি বলেন, কেবল ঢাকার লালবাগের পোস্তার ব্যবসায়ীরাই ট্যানারি মালিকদের কাছে অন্তত ১০০ কোটি টাকা পান। সেই হিসাবে সারা দেশে অন্তত ৪০০ কোটি টাকার ওপরে বকেয়া রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে চামড়া বিক্রি বন্ধের প্রতিক্রিয়ায় ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, সরকারের অনুরোধে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী তারা কাঁচা চামড়া কিনতে তৈরি হয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ আড়তদারদের বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্তে সেটা হয়নি। তবে এমন পরিস্থিতিতে তাদের কিছু করার নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আজ (রোববার) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্যানারি মালিক, আড়তদার ও কাঁচা চামড়া সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসছে। সেখানে চামড়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। সেখান থেকেই নতুন এ সংকটের সমাধান আসতে পারে।

যদিও গতকাল কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠনের বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্তের পরেও সীমিত পরিমাণে কোরবানির পশুর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া কেনা গেছে বলে দাবি করেছেন ট্যানারি মালিকরা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ।

তিনি বলেন, অনেক ট্যানারি আজ চামড়া কিনেছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে চামড়া কেনা শুরু হয়েছে। এখন প্রতিদিনই যে যার মতো কাঁচা চামড়া কিনবেন।

মূলত, সারা দেশ থেকে কোরবানির পশুর চামড়া কেনেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এরপর তাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া যায় আড়তগুলোতে। সেখান থেকে চামড়া বিক্রি করা হয় ট্যানারিগুলোতে।

কিন্তু এবার প্রথম ধাপে কাঁচা চামড়ার দর দেখে হতাশ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ চামড়া সড়কে ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটালে তা নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। এমন পরিস্থিতি দেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি গতকাল থেকে চামড়া কিনতে ট্যানারি মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানায়। কিন্তু আড়তদারদের এমন সিদ্ধান্তে তা ঝুলে গেল।

বরাবরের মতো এবারো কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও মাঠের চিত্র ছিল ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন স্থানে আড়তদারদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী সেই চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেন কিংবা ফেলে দেন।

চট্টগ্রাম, সিলেট, উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত আড়াইশ কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

এ বছর কোরবানির ঈদে সারা দেশ থেকে ৫৫ থেকে ৬০ লাখ গরু এবং ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ব্যবসায়ীদের। তবে ন্যূনতম দাম না পেয়ে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ গরুর চামড়া সড়কে ফেলে ও মাটিতে পুঁতে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

আবার অবহেলার কারণে সময়মতো লবণ না দেওয়া ও গরমের কারণেও কমপক্ষে ২০ শতাংশ গরুর চামড়া নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে দামের ধসের কারণে নষ্ট হয়েছে ছাগল ও ভেড়ার প্রায় ৮০ শতাংশ চামড়া। অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি চামড়ার মধ্যে অর্ধেক চামড়াই নষ্ট হচ্ছে।

অভিযোগ আছে, কোরবানির পশুর চামড়া বেচাকেনায় সরকারের কার্যকর নজরদারি ও উদ্যোগের ঘাটতির কারণে বারবার আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের কারসাজিতে চামড়ার দামে ধস নামছে।

সরকারি প্রতিবছরই লোকদেখানো চামড়ার দর নির্ধারণ করে দিলেও সে দামে চামড়া কিনছে না সংশ্লিষ্টরা। তবে দাম না পেয়ে লোকসান গুনেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। আর বঞ্চিত হচ্ছে গরিব মিসকিন আর এতিমরা।

সোনালীনিউজ/এমটিআই