শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

চার দেশে যাতায়াত করতেন সাহেদ, সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচার

নিউজ ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২০, সোমবার ০৪:২৪ পিএম

চার দেশে যাতায়াত করতেন সাহেদ, সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচার

ঢাকা : কিশোর বয়স থেকে ঠকবাজি শুরু করেন। অঢেল অর্থশালী হতে প্রতারণা তার নেশায় পরিণত হয়।

হাজারও মানুষকে নানা কায়দায় প্রতারিত করে তিনি এখন নিজেই প্রতারণার ইনস্টিটিউট। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে হাতিয়ে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা। আত্মসাৎ করা এই টাকার বড় একটি অংশ দেশ থেকে সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম।

শুধু তাই নয়, সাহেদ করিমের ‘ফ্লাইফোবিয়া’ রোগ থাকলেও তিনি প্রায় সময় বিদেশ ভ্রমণে যেতেন। তার এই ভ্রমণ শুধু ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও নেপালকেন্দ্রীক ছিল। সাহেদের ব্যবহৃত পাসপোর্টে এই চার দেশের ভিসার সিল ও যাওয়া-আসার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত অর্থ পাচারের জন্য সাহেদ করিম সিঙ্গাপুরকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সাহেদের প্রতারণার মামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে তার বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতারণার মাধ্যমে সাহেদ করিম অনেক অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এসব অর্থের বড় অংশ তিনি সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন। এগুলো সবই সাহেদের প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া কালো টাকা।

তবে কী পরিমাণ অর্থ সাহেদ বিদেশে পাচার করেছেন, সুনির্দিষ্ট করে এখনই বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতারণার এসব অর্থ শুধু সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন না কি মালয়শিয়াতে সে বিষয়েও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। এছাড়াও অর্থ পাচারের বিষয়ে সাহেদকে কারা সহযোগীতা করেছে তাদেরও খুঁজে বের করতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফট্যানেন্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার সব ধরনের প্রতারণার বিষয় স্বীকার করেছেন।

এছাড়াও প্রতারণার মাধ্যমে তার আয়ের একটি বড় একটি অংশ বাংলাদেশর বাইরে পাচার করতেন বলেও আমাদের প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, সাহেদ করিমের অর্থ পাচারের বিষয়ে মানি লন্ডারিং আইনে একটি মামলা দায়ের করার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কে অনুরোধ জানিয়েছি। মানি লন্ডারিংয়ের মামলাটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সাহেদ করিমের বিরুব্ধে র‌্যাবের দায়ের করা তিনটি মামলায় (প্রতারণা, অস্ত্র ও জালনোট) পর্যায়ক্রমে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও জানান তিনি।

সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা মামলার তদন্তের বিষয়ে র্যাবের তদন্ত সশ্লিষ্টরা জানান, ওই মামলায় সাহেদ করিমের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ডের প্রথম ৬ দিন তিনি গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হেফাজতে ছিলেন। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মামলার তদন্তভার র‍্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেই মোতাবেক সাহেদ করিমকে র্যাবের কাছে হস্তান্তর করে ডিবি পুলিশ। এরপর রিমান্ডের বাকি ৪ দিন সাহেদ করিম র্যাবের হেফাজতে ছিলেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাহেদ জানান, অর্থশালী হওয়ার জন্যই সে এসব প্রতারণামুলক কাজ করেছেন তিনি। প্রতারণার কাজে সাহেদের অন্যতম সহযোগী ছিলেন গ্রেফতার হওয়া প্রতিষ্ঠানের এমডি মাসুদ পারভেজ গাজী, জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম শিবলী, হাসপাতালের এমডি মিজানুর রহমানসহ প্রতিষ্ঠানের অনেকেই।

র‌্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, ২০০৭ সালে সাহেদ করিম নিজেকে বিএনপির নেতার পরিচয় দিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের অনুমোদন নেন। ওই সময় তিনি রিজেন্টের নামে ক্লিনিক চালাতেন।

এরপর ২০১০ সালে সাহেদ বিডিএস কিক ওয়ান এবং কর্মমুখী কর্মসংস্থান সোসাইটি (কেকেএস) নামে দুটি এমএলএম কোম্পানি চালু করেন। এক বছর পর শত শত গ্রাহকের অন্তত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে এবং প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে গা ঢাকা দেন সাহেদ। এমএলএম প্রতারণার ওই টাকায় রিজেন্ট হাসপাতাল গড়ে তোলেন সাহেদ। তার সবক’টি ব্যবসা শুরু করেন প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত অর্থের মাধ্যমে। প্রতারণার ও জালিয়াতি ঢাকতে সরকারের গুরুত্তপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও ছবি তুলে তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি।

একই সঙ্গে বিভিন্ন সময় অনেক ভুক্তভোগীকে অস্ত্রের মুখে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ ও বিভিন্ন সুবিধা আদায় করতেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় তিনটি ও উত্তরা পূর্ব থানায় প্রতারণার এক মামলায় এবং সাতক্ষীরার দেবহাটায় দায়ের করা অস্ত্র মামলায় রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমকে পাঁচ মামলায় ৩৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদ পারভেজেরও ২১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

গত ৬ জুলাই করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেয়া, নানা অনিয়ম, প্রতারণার অভিযোগে রিজেন্ট গ্রুপের দু’টি হাসপাতালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার আলমের অভিযান চালায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

পরদিন গত ৭ জুলাই রিজেন্ট গ্রুপের মূল কার্যালয় এবং রাজধানীর উত্তরা ও মিরপুরে এর দু’টি হাসপাতাল সিলগালা করে দেওয়া হয়। হাসপাতালটি প্রতারণা করে ১০ হাজারেরও বেশি করোনা পরীক্ষার সার্টিফিকেট দিয়েছে। তারমধ্যে অধিকাংশই ভুয়া রিপোর্ট।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তরা পশ্চিম থানায় রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদসহ ১৭ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করে র‌্যা্ব। অভিযানের সময় রিজেন্ট হাসপাতালের পরিচালক ও ব্যবস্থাপকসহ আটজন কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে গত ৯ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম শিবলীকে গ্রোফতার করা হয়।

সবশেষ গত ১৫ জুলাই ভোরে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোমরপুর গ্রামের লবঙ্গবতী নদীর তীর সীমান্ত এলাকা থেকে আত্মগোপনে থাকা রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদকে গ্রেফতার করা হয়। এই পর্যন্ত মামলার এজাহারভুক্ত মোট ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue