শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬

চোরাই কাগজে ভরপুর নয়াবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২২ মে ২০১৯, বুধবার ০১:৩২ পিএম

চোরাই কাগজে ভরপুর নয়াবাজার

ঢাকা : রাজধানীতে কাগজের পাইকারি বাজার পুরান ঢাকার নয়াবাজার। এখানে দেশে উৎপাদিত ও বৈধ পথে আমদানি করা কাগজের সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা কাগজও। গত শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নয়াবাজারে সরু গলিতে শত শত কাগজের দোকান। ওইসব দোকানে সারি সারি সাজিয়ে রাখা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কাগজ। উন্নত মানের দেশি কাগজ থাকলেও দাম কম হওয়ায় বিদেশি কাগজের চাহিদা বেশি। বিশেষ করে পোশাক কারখানায় ব্যবহূত বিশেষ টিস্যু কাগজ, ডুপ্লেক্স বোর্ড, নন-কার্বন রিকোয়ার্ড (এনসিআর) আর্ট কার্ড ইত্যাদি।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, এসব কাগজ কাস্টমসে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এবং আন্ডার-ইনভয়েসিং ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে রাতের আঁধারে নয়াবাজারে সরাসরি কাস্টম থেকে রাজধানীর কাগজের বাজারে চলে যায়। কোনো শুল্ক না থাকায় এসব বিদেশি কাগজ কম দামে বাজারে পাওয়া যায়। নবাব ইউসুফ রোডে ইউরেকা ট্রেডিং এজেন্সিতে গাজীপুর থেকে ইউসুফ আলী এসেছেন গার্মেন্টের টিস্যু কাগজ কিনতে। শার্ট, শাড়ি, টি-শার্ট এসব কাপড়ে ইনার হিসেবে এই টিস্যু কাগজ ব্যবহার করা হয়।

দোকানের ব্যবস্থাপক ইমরান বলেন, এ কাগজ দেশেও উৎপাদন হয়; আবার আমদানির মাধ্যমেও আনা হয়। তবে পণ্য কিনতে আসা ইউসুফ বাধা দিয়ে বলেন, ‘ভাই, দেশে এ পণ্য উৎপাদন হয় খুব কম। ফলে বিদেশি কাগজই আমরা বেশি ব্যবহার করি। আবার দামও কম পাই। বাজারে এসব কাগজ আসে অবৈধভাবে। গার্মেন্টের মালিকরা কারখানায় ব্যবহারের নামে এনে কাগজ অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন। ফলে দেশি কাগজের চেয়ে বিদেশি কাগজ ব্যবহার করা যায় কম দামে।’

দোকান কর্মকর্তা ইমরান বলেন, দেশি টিস্যু কাগজ প্রতি রিম ৭৫০ টাকায় তারা বিক্রি করেন। আর বিদেশি টিস্যু কাগজ বিক্রি হয় ৭০০ টাকায়। ফলে বিদেশিটা চলে ৬০ শতাংশ আর ৪০ শতাংশ চলে দেশি কাগজ। এ ছাড়া ডুপ্লেক্স কাগজ ও আর্ট কার্ডের প্রায় ৮০ শতাংশই বাইরে থেকে আসে।

নয়াবাজারের এক কাগজ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশে বর্তমানে আন্ডার-ইনভয়েসের মাধ্যমে ভারতের ডুপ্লেক্স বোর্ড আসছে বাজারে। এসব কাগজ প্রতি রিম দেশি ৭০ থেকে ৭২ হাজার টাকা। আর ভারত থেকে চোরাই পথে আসা একই কাগজ বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকায়।

দেশে এনসিআর কাগজ উৎপাদনে প্রায় শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট ইসিজি পেপারের নামে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অবাধে খোলা বাজারে চলে আসছে। দেশি কাগজ প্রতি রিম এক লাখ ৪০ হাজার টাকা হলেও চোরাই পথে আসা এই কাগজের দাম পড়ে এক লাখ ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ইদানীং প্যাকেজিংয়ের আড়ালে বাজারে সয়লাব হয়ে পড়েছে হোয়াইট প্রিন্টিং পেপার। দেশি শিল্পের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকার পরও দাম কম হওয়ায় চোরাই কাগজেরই কদর বেশি। চোরাই এই কাগজ প্রতি টন ৯০ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। আর স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাগজের দাম পড়ে ৯৫ হাজার টাকা।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত মানের কাগজ এখন দেশেই উৎপাদন হচ্ছে। আর তা মুদ্রণশিল্পের কাজে ব্যবহূত হচ্ছে দেদার। এমনকি বিদেশেও যাচ্ছে দেশের কাগজ। এসব সুখের অনুষঙ্গের পাশে কষ্ট হয়ে থাকছে চোরাই কাগজ। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের বাজারেই টেকা কঠিন হয়ে পড়ছে দেশি কাগজের। রফতানিমুখী শিল্পের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থায় যে শুল্কসুবিধা দেওয়া হয়, তা চলে যায় কাগজ চোরাকারবারিদের পকেটে।

এতে দেশ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে দেশি কাগজশিল্পে বিপুল বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়েছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কাগজ ও কাগজ বোর্ড এনে অবৈধভাবে দেশের বাজারে বিক্রি করায় বৈধ আমদানিকারকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বন্ডের গডফাদার আবুল হোসেনের নেতৃত্বে সক্রিয় এক ডজন চোরাকারবারি  : নয়াবাজারে বন্ডের গডফাদার খ্যাত আবুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন এক ডজন চোরাকারবারির দৌরাত্ম্যেই কাগজসহ দেশীয় শিল্প খাত ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েছে। তারা বন্ড সুবিধায় আনা শুল্কমুক্ত পণ্যের বাধাহীন বাজার গড়ে তুলেছেন। নানা প্রতিযোগিতায় ফেলে দেশীয় শিল্পকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। সংঘবদ্ধ এই চক্র এতই প্রভাবশালী যে, তাদের কাছে সরকারের দায়িত্বশীল মহলও জিম্মি হয়ে পড়েছে। পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকার আবুল হোসেন মার্কেটের কর্ণধার ‘বন্ড গডফাদার আবুল হোসেনের’ আধিপত্যের বিরুদ্ধে কারো টুঁ শব্দটি করারও উপায় নেই। এই গডফাদার ও তার সহযোগীদের অপকর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কথা বলে নিস্তার পাচ্ছেন না কেউ। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কাস্টমসের কর্মকর্তাদের পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনোভাবেই এসব গডফাদারকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই রাঘববোয়ালদের প্রকাশ্য চোরাচালান নিয়ে পুলিশের নির্বিকার ভূমিকায় প্রশ্ন উঠেছে। ফলে ধ্বংসের হাত থেকে কাগজ খাতকে কোনোভাবেই রক্ষা করা যাচ্ছে না।

জানা গেছে, মধ্যরাতে পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকায় আবুল হোসেন মার্কেটের আঙিনাতেই বন্ড সুবিধায় আনা কাগজ লোড-আনলোড হয়। সেখানে পুলিশ ছাড়াও আবুল হোসেনের পোষ্য মাস্তান দল পাহারায় থাকেন। অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব নেওয়ার পর থেকেই আবুল হোসেন রীতিমতো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তার পেপার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের অভ্যন্তরে গ্রুপিং সৃষ্টির মাধ্যমে পছন্দের ব্যবসায়ীদের নিয়ে গড়ে তোলেন আলাদা সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটই তার নেতৃত্ব বহাল রাখে, চোরাকারবারি নিশ্চিত রাখে। নেতৃত্বের ক্ষমতা দিয়েই আবুল হোসেন যখন যাকে খুশি হুমকি-ধমকি দেন, কাগজের বাজার বন্ধ করার ভয় দেখান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আবুল হোসেনের সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরাই প্রতিবছর সরকারি বই মুদ্রণের আগ মুহূর্তে বাজারে কাগজের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির নানা পাঁয়তারা চালিয়ে থাকে।

সরেজমিন কাগজের সবচেয়ে বড় খোলাবাজার নয়াবাজারের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুল্ক সুবিধায় আনা কাগজ প্রায় প্রতিটি দোকানেই বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, সাধারণত রাত ১১টার পর থেকে বন্ডের মাধ্যমে আনা পণ্য লোড-আনলোড হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পেপার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল হোসেন বলতে পারবেন। তিনিই এ ব্যবসার মূল হোতা। পুরো নয়াবাজারের পেপার মার্কেট তার নিয়ন্ত্রণে চলে। তার কথায় সবাই ওঠে-বসে। তিনিই (আবুল হোসেন) বলতে পারবেন কে কে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

বাংলাদেশ পেপার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল হোসেনের অফিসে কয়েকবার গেলেও তার অফিসের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে দেখা বা যোগাযোগ করতে দেননি। তারা জানান, আবুল হোসেন অফিসে নেই। তার মোবাইল ফোন নম্বর চাইলে বলেন, আমাদের নম্বর দেওয়ার কোনো অনুমতি নেই। কয়েক দিন পর এসে তার থেকে নেবেন। পরপর দুই দিন তার অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৬ হাজার ৫৬৫টি প্রতিষ্ঠানের নামে বন্ড লাইসেন্স থাকলেও অনিয়মের কারণে ১ হাজার ৭৫৭ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করেছে কাস্টমস। আবার কারখানা বন্ধ থাকার পরও বন্ড লাইসেন্স আছে ২ হাজার ৪৩৮টি পোশাক ও প্যাকেজিং কারখানার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবুল হোসেন বন্ডের পণ্য চোরাচালানের নেতৃত্ব দিয়ে এখন ধনকুবেরে পরিণত হয়েছেন। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে তার রয়েছে দীর্ঘদিনের সখ্য। কাস্টমস কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে অভিযানে গিয়ে বিপাকে পড়েন বন্ড গডফাদার আবুল হোসেনের পেটোয়া বাহিনীর হাতে। এক্ষেত্রে কোতোয়ালি থানার ওসির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিযোগ উঠেছে। এমতাবস্থায় সদরঘাট ও আশপাশের এলাকায় বন্ডের পণ্যের চোরাচালান ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানোর দাবি জানিয়েছেন কাগজ ও বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি মোংলা ইপিজেডের মুন স্টার, সৈয়দপুর ইপিজেডের ফারদিন অ্যাকসেসরিস ও কোয়েস্ট এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জের ওয়েবকোয়াট নামের এই চারটি বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাগজজাতীয় পণ্য রাজধানীর নয়াবাজারে কয়েক দফা বিক্রি করেছে। এর আগেই এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়ে। কিন্তু কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় পুনরায় চোরাকারবারিতে জড়িয়ে পড়েছে ওই চার প্রতিষ্ঠান।

জানা গেছে, মোংলা ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান মুন স্টারের মালিক অত্যন্ত প্রভাবশালী। তার একাধিক প্রতিষ্ঠানের রয়েছে বন্ড লাইসেন্স। এর আগেই কাগজজাতীয় পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির অপরাধে ওই ব্যক্তির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে কয়েকটি মামলা করেছে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর। তবু থামেনি চোরাচালান। সম্প্র্রতি মুন স্টার কাগজের একটি বড় চালান কালোবাজারে বিক্রি করেছে।

কাস্টমস সূত্র জানায়, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও চোরাচালানের দায়ে ওয়েবকোয়াটের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট জানিয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও বন্ডেড পণ্য চোরাই পথে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার পণ্য জব্দ করেছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। সেদিন রাতে রাজধানীর গুলিস্তান ও বিরুলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতটি কভার্ড ভ্যানও জব্দ করে কাস্টমস। এ অভিযানে ফারদিন অ্যাকসেসরিসসহ ছয় প্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার পণ্য জব্দ করা হয়। এর আগেও বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত পণ্য এনে দেশের খোলা বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি করেছে মেসার্স ফারদিন অ্যাকসেসরিস।

প্রতিষ্ঠানটির এ অনিয়ম সম্পর্কে ২০১৫ সালে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ফারদিন অ্যাকসেসরিস জিপিপিএস, এইচআইপিএস, পিভিসি রেজিন, পিইটি রেজিন, প্যারাফিন ওয়াক্স, পিপি, এইচডিপিই, এলডিপিই, এলএলডিপিই, বিওপিপি, ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্ট কার্ডসহ ২৫ ধরনের কাঁচামাল এনে বিক্রি করেছে ৩৫ কোটি ৪০ লাখ টাকায়। এতে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে ১২ কোটি ৯ লাখ টাকার। ফারদিন অ্যাকসেসরিস লি. একটি নব্য অনুমোদনপ্রাপ্ত বন্ডেড প্রতিষ্ঠান।

প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট, রংপুর কমিশনারেট একটি সাময়িক বন্ড লাইসেন্স দিয়েছে, যার নম্বর ০৪/২০১৪ তারিখ ১৪-০৭-২০১৪। প্র্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধার আওতায় বিনা শুল্কে আমদানি করা কাঁচামাল উৎপাদনে ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে।

দেশে শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানির নামে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার অপব্যবহার বাড়ছেই। আমদানিপণ্য কালোবাজারে বিক্রি করে শুল্ক ফাঁকির মহোৎসব চলছে। আবার আমদানির আড়ালে বেড়েছে অর্থ পাচার। সব মিলিয়ে বন্ড সুবিধায় এখন ‘পোয়াবারো’ চোরাকারবারিদের। একশ্রেণির ব্যবসায়ী বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে কালোবাজারে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাৎ করছে। চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য বন্ডের কার্যক্রম শুধু প্রশ্নবিদ্ধ নয়, বরং রাজস্ব ফাঁকি ও দেশীয় শিল্পকে হুমকির সম্মুখীন করছে।

আমদানিকারকরাও সঙ্কটে : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) অভিযোগ জানিয়ে বাংলাদেশ পেপার ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, রফতানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য বন্ড সুবিধায় আনা কাগজ ও কাগজ বোর্ডে এখন খোলাবাজার সয়লাব। পোশাকশিল্পের নামে নির্ধারিত গ্রামের বাইরে নিম্ন গ্রামের কাগজ ও কাগজ বোর্ড আমদানি করে খোলাবাজারে ছাড়া হচ্ছে। এতে বৈধ পথে সরকারকে নির্ধারিত রাজস্ব দিয়ে আমদানি করা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা অসম প্রতিযোগিতায় সঙ্কটের মধ্যে পড়ছেন।

অ্যাসোসিয়েশন সূত্রমতে, ১৯৯৬ সালে তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যবহারের জন্য বন্ড সুবিধায় কাগজ ও কাগজ বোর্ড আমদানি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এতে শুধু ৩০০ গ্রাম বা তদূর্ধ্ব গ্রামের কাগজ আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়। রফতানিমুখী শিল্পে তেমন চাহিদা না থাকলেও ১০০ গ্রাম বা ১৫০ গ্রামের আর্ট পেপার বন্ডেড সুবিধাভুক্ত করা হয়। সুবিধার আড়ালে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করায় সরকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। আর উচ্চ শুল্ক দিয়ে আমদানি ও বিনা শুল্কে আমদানি করা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করায় বৈধ আমদানিকারকরা সঙ্কটে পড়েছেন।

পেপার ইমপোর্টার্সদের দাবি, দেশি কাগজ শিল্পে ছাপা ও লেখার কাগজ, নিউজপ্রিন্ট, মিডিয়া ও লাইনার পেপার, সিগারেট পেপার, টিস্যু পেপার বোর্ড উৎপাদিত হয়। কিন্তু মুদ্রণশিল্পের পাশাপাশি দেশে ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্ট পেপার, আর্ট কার্ড, কার্ড বোর্ড, সুইডিশ বোর্ড, ফোল্ডিং বক্স বোর্ড ও অ্যাডহেসিভ পেপারের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও তা উৎপাদনের শিল্প বেশি গড়ে ওঠেনি। এসব পণ্যের ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা ৬০ শতাংশের বেশি শুল্ক দিয়ে আমদানি করেন। কিন্তু পোশাকশিল্পের জন্য বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাগজ ও কাগজ বোর্ড কৌশলে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।

এক হিসাবে দেখা যায়, বৈধ পথে কোটেড ও গ্রাফিক পেপার, ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্ট কার্ড ও ফোল্ডিং বক্স ও সেলফ অ্যাডহেসিভ পেপার থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ২৫১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩০৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৫৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

একই সময়ে বন্ড সুবিধার আওতায় আনা কোটেড পেপার, ক্রাফট পেপার ও গ্রাফিক পেপার আমদানিতে সরকার রাজস্ব পায়নি। ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তিন বছরে তিন হাজার ৯৮৮ কোটি টাকার পেপার আমদানি করা হয়। এই আমদানির বিপরীতে ব্যবসায়ীরা শুল্ক সুবিধা পান দুই হাজার ৭৭২ কোটি টাকা।

অর্থাৎ প্রতিবছর সরকার প্রায় এক হাজার কোটি টাকা রাজস্ববঞ্চিত হচ্ছে। বন্ড সুবিধার বাইরে বৈধ পথে এই কাগজ আমদানি করা হলে সরকারের রাজস্ব আরো বাড়বে বলে মনে করছে বাংলাদেশ পেপার ইমপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন।

বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ) সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ছোট-বড় কাগজের কল আছে ১০৬টিরও বেশি। ওই সব কাগজকলে বিশ্বমানের কাগজ উৎপাদন হয়। এসব কাগজ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কাগজের সমকক্ষ।

এ ছাড়া দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, টাঁকশাল, রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনী ও সব শিক্ষা বোর্ডের জন্য স্থানীয় কাগজ ব্যবহূত হয়ে থাকে। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর যোগসাজশে বাজারকে অস্থির করে তোলা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও তারা আমলে নেয় না। বরং কোনো কোনো সময় তাদের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ কাগজের বাণিজ্য হয়।

বিপিএমএ সচিব নওশেরুল আলম বলেন, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে দুই কোটি ডলার বা ১৬৮ কোটি টাকা। এসব কাগজ রফতানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ ১০ থেকে ১৫টি দেশে। শেষ হতে যাওয়া এই অর্থবছরে এর প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া আমদানি বিকল্প পণ্য হিসেবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে দেশি কাগজশিল্প।

দেশে কাগজের বাজার ও চাহিদা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিপিএমএ সচিব বলেন, দেশি কাগজকলের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ছয় লাখ টন। আর এই চাহিদার চেয়েও আড়াই গুণ বেশি উৎপাদন সক্ষমতা আছে।

এ ছাড়া চাহিদা কম থাকায় এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় টিকে থাকতে না পারায় আরো ৫০টি কাগজকল এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এ খাতে বিনিয়োগ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। সরাসরি ১৫ লাখ শ্রমিক জড়িত। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে ৬০ লাখ লোক জড়িত।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া বলেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আসছে বাজেটে পদক্ষেপ থাকবেই। ইতোমধ্যে বন্ডেড সুবিধা অপব্যবহারকারী ৬০ থেকে ৭০টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন আরো কিছু প্রতিষ্ঠানে অভিযান হচ্ছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই