শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬

ছাত্ররাজনীতিতে অস্থিরতা

ছাত্রদলের বিষফোড়া বিএনপি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার ০১:৫৬ পিএম

ছাত্রদলের বিষফোড়া বিএনপি

ঢাকা : ছাত্র রাজনীতিতে লেজুড়বৃত্তি ঠেকাতে নতুন আইন করেছিল সরকার। সে আইনে ছাত্র সংগঠনগুলো স্বাধীন হয় গত একযুগ আগে। ছাত্র সংগঠনের নিজস্ব গঠনতন্ত্র রয়েছে। তবে প্রতিকূল পরিবেশ আর আইনের ব্যত্যয় ঘটানোর জন্য জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের স্বাধীনতায় আঘাত এসেছে। আঘাত করেছে নিজ সংগঠনের অভিভাবক জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিই।

দীর্ঘদিন পর একটি সুন্দর পরিবেশে নতুন নেতৃত্বের খোঁজে নেমেছিল সংগঠনটি। গতি পেয়েছিল সারা দেশে, কিন্তু তাতে বিষফোঁড়ার ভূমিকায় ছিল বিএনপি। যার কাজ তাকে করতে না দেওয়ায় রাজপথের রাজনীতি চলে গেছে আদালতের কাঠগড়ায়। ছাত্রদলের এক নেতার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটির কাউন্সিল আপাতত স্থগিত। অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে কাউন্সিলকে। যদিও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ছাত্রদলের কাজ ছাত্রদলই করছে।

এদিকে সংগঠনের রেজুলেশন নিয়ে রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর) আদালতে যাচ্ছে ছাত্রদল। আর আদালতের নোটিশের জবাব দিতে প্রস্তুত হচ্ছে বিএনপি।

অন্যদিকে ছাত্রদলের কাউন্সিল স্থগিত হওয়ায় বিএনপির অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের কাউন্সিল নিয়েও অনেকটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুসারে ছাত্রসংগঠনগুলো স্বাধীন থাকবে। মূল দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের পরামর্শ দিতে পারবে। ছাত্রসংগঠনগুলো মূল দলের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখবে। শতভাগ বাস্তবায়ন না হলেও ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল।

ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের কাউন্সিল, নেতা নির্বাচনসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজ করছিল। কিন্তু তাতে বাধ সেধেছে মূল দল। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি, সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো।

ক্ষমতাসীন দলের বিষয়টা আপাতত সমালোচনায় না এলেও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে বিএনপিকে। ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করেছে বিএনপি। ছাত্রদলের কাউন্সিলের যাবতীয় আয়োজন করেছে বিএনপি। শতভাগ হস্তক্ষেপ করেছে বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

মূল দলের শীর্ষ নেতাদের বিধি ভঙ্গের জন্য আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন ভুক্তভোগী নেতা। গত বৃহস্পতিবার ছাত্রদলের এক নেতার মামলায় আটকে গেছে সংগঠনটির কাউন্সিল। উৎসবমুখর প্রস্তুতির শেষ হঠাৎ আদালত ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিলের ওপর ‘অস্থায়ী’ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

ছাত্রদলের কাউন্সিলের ওপর আদালত স্থগিতাদেশ দেওয়ায় দল ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের কাউন্সিল নিয়েও শঙ্কায় পড়েছে বিএনপি। গত শুক্রবার পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে বিএনপির স্থায়ী কমিটিসহ সিনিয়র নেতারা বৈঠক করেন। তাতে ক্ষোভও প্রকাশ করেন কয়েক নেতা।

আগামীতে বিএনপিসহ অঙ্গসহযোগী সব সংগঠনই কাউন্সিলে নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরি করার দলীয় সিদ্ধান্ত ছিল। ছাত্রদলের কাউন্সিল ঝুলে যাওয়ায় পুরো দল পুনর্গঠনও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বিএনপির হস্তক্ষেপই ছাত্রদলের কাউন্সিলে স্থগিতাদেশের অন্যতম কারণ হলেও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বললেন, ছাত্রদলের কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সঙ্গে বিএনপি জড়িত নয়।

গত শুক্রবারের বৈঠকের মাঝপথে বেরিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, আদালতকে দিয়ে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি সরকার তৈরি করছেন তা অত্যন্ত ভয়াবহ।

কাউন্সিলের ওপর আদালতের স্থগিতাদেশের ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন’ উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ছাত্রদলের বিষয়ে এখন পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে তা আইনসম্মতভাবেই হয়েছে। ছাত্রদলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চেয়ারম্যান অর্থাৎ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানই নিয়েছেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানই পারেন এই সিদ্ধান্ত নিতে। এটা সম্পূর্ণ লিগ্যাল। এখন পর্যন্ত যা হয়েছে কোনোটাই বেআইনি হয়নি।

ছাত্রদলের কাউন্সিলের বিষয় কী হবে-প্রশ্ন করা হলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এটি ছাত্রদলের বিষয়। ছাত্রদলের বিষয়ে তারা আলোচনা করছে। তাদের (ছাত্রদল) সিদ্ধান্ত তারা নেন। বিএনপি এর সঙ্গে কোনোমতেই জড়িত নয়।

বিএনপিকে পক্ষ করে আদালত যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন, তার জবাব দেওয়া হবে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি নেতারা উত্তরগুলো আদালতের কাছে যথা সময়ে দেব। সেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে ছাত্রদলের সিদ্ধান্ত ছাত্রদলই নেবে, এখন যারা দায়িত্বে আছে তারাই বলবে।

ছাত্রদল ও বিএনপির একাধিক নেতা জানান, সামনে মেয়াদোত্তীর্ণ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করার পথে এগোচ্ছিল বিএনপি।

ছাত্রদলের ওপর নিষেধাজ্ঞার আদেশ আসায় হোঁচট খায় দলটি। দলটির চিন্তাভাবনায় ছিল যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠনগুলোর সামনের কমিটিগুলো কাউন্সিলের মাধ্যমে করার। ছাত্রদলের কাউন্সিলের দিকে তাকিয়ে ছিল নেতা-কর্মীরা।

বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে ডিসেম্বরে বা নতুন বছরের শুরুতে বিএনপির কাউন্সিল করারও বিষয়টি মাথায় রেখেছিল দলটি। দলের মহাসচিব একাধিকবার কাউন্সিল করার কথাও গণমাধ্যমে বলেন।

কিন্তু ছাত্রদলের ঘটনায় ছেদ পড়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে। ছাত্রদল নিয়ে পরবর্তী করণীয় কী তা নিয়ে গত দুদিন ধরে দীর্ঘ সময় বৈঠকও করে বিএনপি। দলের আইনজীবী নেতা ও সাবেক ছাত্রনেতাদের মতামতও নেন লন্ডনে অবস্থান নেওয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

সূত্রমতে, সুষ্ঠুভাবে ছাত্রদলের কাউন্সিল সম্পন্ন হলে যুবদলের নতুন নেতৃত্বও একই পদ্ধতিতে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএনপির হাইকমান্ড। এরপর জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটিও একই পদ্ধতিতে হওয়ার কথা ছিল। ছাত্রদলের কাউন্সিলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার ঘটনায় বিএনপির নীতিনির্ধারকদের সব হিসাবই ওলট-পালট করে দিয়েছে।

বিএনপি নেতারা বলেন, বিএনপিতে ভালো কিছু হোক সেটা সরকার চায় না। কারণ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শক্তিশালী কমিটি হলে নিজেদের হুমকি মনে করছে সরকার। তাই আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে সরকার এই ষড়যন্ত্রটা করল।

এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন বলেন, ছাত্রদলের কাউন্সিলে বাধা দিয়ে সরকার গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানল। দল ও অঙ্গসংগঠনের ভবিষ্যতে কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব বাছাইয়ে ক্ষেত্রেও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার আদেশ আসতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

সোনালীনিউজ/এমটিআই