মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নীরব সুশীল সমাজ

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার ০৩:৪৬ পিএম

জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নীরব সুশীল সমাজ

ঢাকা : রান্নার পেঁয়াজের দাম বাড়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায়। একের পর এক বাড়ছে চালের দাম। গ্যাস-বিদ্যুৎ পানির দামও বাড়ছে লাগাতার। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্নীতির থাবায় ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তর। খেয়েপরে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকু যেন এখন অনিশ্চিত। দেশের সুশীলসমাজের নীরবতা নিয়েও সাধারণের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এদিকে জীবনমানে উন্নতির কথা বলছে সরকার। কিন্তু তাতে আশার আলো দেখতে পায় না সাধারণ মানুষ। তারা চায় কষ্ট-দুর্ভোগের কথাগুলো সরকারের দৃষ্টিগোচর হোক। সরকার সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।

কিন্তু যারা সাধারণ মানুষের কথাগুলো নিয়ে সোচ্চার থাকার কথা তারা বলতে এখন একেবারেই নিশ্চুপ। ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো দোষারোপ করছে সরকারকে। আর সুশীলসমাজ দোষারোপ করছে রাজনৈতিক দলগুলোকে। পরস্পরকে দোষারোপের মাঝখানে সাধারণ মানুষের কষ্ট আর দুর্ভোগের কথাগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে একর পর এক।

এদিকে সুশীলসমাজকে প্রতিনিধিত্বকারীদের নিয়ে সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, তারা ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’, তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।

সম্প্রতি পেঁয়াজ নিয়ে দেশে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। ঠেলাগাড়ি দিয়ে বহন করা পেঁয়াজ উঠেছে বিমানে। বাজারে পেঁয়াজ সংকট অথচ গুদামঘরে পচে যাচ্ছে পেঁয়াজ। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে নিহত হচ্ছে শিক্ষার্থী। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষককে পানিতে চুবিয়ে আহত করা হচ্ছে। পুড়িয়ে মানুষ মারা থেকে শুরু করে নির্মম হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় লাশের সারি বাড়ছেই।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, সরকার প্রতিবেশী দেশের কাছে নদীর পানি, দেশের মাটিসহ সবকিছু বিকিয়ে দিচ্ছে। আর সরকারের তরফ থেকে অভিযোগ উঠেছে চারদিকে নানামুখী ষডযন্ত্র চলছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে নেমেছে শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন উইং। বিদ্যমান এমন পরিস্থিতিতে একেবারেই নিশ্চুপ সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা।

রোববার (১৬ নভেম্বর) দেশের সুশীলসমাজের একাধিক প্রতিনিধি সঙ্গে আলাপকালে তাদের নীরবতার কারণ উল্লেখ করেছেন। নিজেদের সক্ষমতা এবং বাধ্যবাধকতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন কেউ কেউ।

আবার ছোটখাটো বিষয় নিয়ে শুধুই সরকারের সমালোচনা না করার দাবিও করেছেন কেউ কেউ। বরং বৈরী পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।   

ড. আইনুন নিশাদ : প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে ফারাক্কার বাঁধসংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে প্রবল আপত্তি আছে এ দেশের মানুষের। এরই মধ্যে সম্প্রতি ফেনী নদীর পানি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে অপ্রকাশিত চুক্তি নিয়ে বিরোধিতা করেছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো।

এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আমাদের দেশের নদী ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, আমাদের দেশের একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে সরকার কিছু করলে তার বিরোধিতা করতে হবে।

আমি অতীতের চুক্তির কথা বলছি না, তবে ফেনী নদীর পানি নিয়ে সরকারের ভাষ্যমতে যে চুক্তি হয়েছে তা দোষের কিছু দেখছি না। তিনি বলেন, উজানের ভারত তার ভাটির দেশকে (বাংলাদেশ) জানিয়ে মাত্র ২ কিউসেক পানি উত্তোলন করছে। তারা না জানালে আমাদের কী-ই বা করার ছিল।

বরং বলা যেতে পারে আমাদেরকে জানিয়ে পানি নিচ্ছে এটাই বড় অর্জন। তবে ফারাক্কা নিয়ে এ দেশের সঙ্গে ভারত যা করছে তা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন ড. আইনুন নিশাত।

ড. শাহদীন মালিক : আমি আইনের মানুষ, বিশেষজ্ঞ বললে আইনের টুকটাক বলতে পারি। তবে নিত্যপণ্য, মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে সাধারণ মানুষ হিসেবে বলতে পারি আমাদের অধিকারগুলো কালে কালে খর্ব হচ্ছে। বর্তমানে খর্ব করার প্রবণতা আরো বেড়েছে।

ভোট দিতে পারি নাই, বাজারে গেলে পণ্যের দাম আগের সপ্তাহে যা শুনেছি পরের সপ্তাহে তার চেয়ে অনেক বেশি। যেখানে পণ্যবাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেই পাশ কাটিয়ে যান সেখানে সাধারণ মানুষ সত্যি অসহায়। সরকারের উচিত হবে দেওয়ালের লিখন পড়া।

মানুষ ভালো থাকতে চায়; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষ খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছে। মন্ত্রীরা আমাদের বাঁচা-মরা নিয়ে হাস্য-তামাশা করছে। এটা দুঃখজনক।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সুশীলসমাজ তো এখন নিষ্ক্রিয়। দেশের বৈরী পরিস্থিতিতে যারা কথা বলতেন তারা নিশ্চুপ। কারণ অনেকগুলো। কেউ ভীত, কারো বিরুদ্ধে মামলা আবার কেউ চুপচাপ আছেন দলীয় বিবেচনায়। এসবের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু বলব কোথায়? গণমাধ্যম, গোলটেবিল, সভা-সেমিনার তো বন্ধ প্রায়। টকশোগুলোতে তো আমরা অবাঞ্ছিত।

তিনি বলেন, খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, আবাসন- এসব মানুষের মৌলিক অধিকার। মৌলিক চাহিদাসহ জানমালের নিরাপত্তার দায় নেয় সরকার। কিন্তু বর্তমান সরকার তো দায়বদ্ধতার কাঠামো ভেঙে ফেলেছে। তাদের ভোটও লাগেনি, জবাবদিহিতাও নেই। এজন্য যারা রাজপথে থাকার কথা তাদের সক্রিয় হতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধু ভোটের জন্য মানুষের দ্বারে গেলে চলবে না, মানুষের সমস্যার কথাও বলতে হবে। কিন্তু সে চিত্র তো দেখা যাচ্ছে না। আর বিনা লড়াইয়ে পটপরিবর্তন হবে, তাদের ভাগ্যের উন্নতি ঘটবে এমন আশা করে যারা পা তুলে, হাত গুটিয়ে বসে আছেন তাদের জন্যও সুসংবাদ নেই বলেও মন্তব্য করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার।

এম হাফিজ উদ্দিন খান : রাজনৈতিক দলগুলো কেন এখন কথা বলে না, কেন রাস্ত্তায় নামে না? তাদের লড়াই, আন্দোলন সংগ্রাম শুধু ক্ষমতার জন্য, নাকি ক্ষমতায় গিয়ে চুরি করার জন্য।

দেশে এত ঘুষ, দুর্নীতি, অনাচার-অত্যাচার চলছে, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-ছাত্র কারো নিরাপত্তা নেই। জীবন বাঁচার জন্য যতগুলো প্রয়োজনীয়তা আছে তার সবগুলোতেই আঘাত এসেছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই। এসব নিয়ে কথা বলে না কেন?

আপনারা যাদেরকে সুশীল বলে মনে করেন তারা তো পাথর। কথায় আছে না ‘অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর’। আমরা এখন অধিক শোকে বসবাস করছি। বলার জায়গা নাই। বললে প্রকাশ করার সাহস আপনাদেরও (গণমাধ্যম) নাই।

ড. আসিফ নজরুল : মানুষ তার বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। দানব সরকার মানুষের বাকশক্তি ডাকাতি করেছে। শুধু নিত্যপণ্য কেন, কিছুই বলার অধিকার নাই, সমালোচনা করার অধিকার  নেই। যারা শাসক হিসেবে বসে আছেন তারা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। তাহলে তাদের কাছে অধিকার আশা করে লাভ কি?

আর রাষ্ট্র যখন ফ্যাসিস্ট আচরণ করে, দেশে বৈরী পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকে, সাধারণ মানুষ যখন অসহায় হয়ে পড়ে তখন সুশীলসমাজ সোচ্চার হয়ে ওঠে। আমরা এখন আর সুশীলদের সোচ্চার হতে দেখছি না। সুশীল নিয়ে ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছিল, ‘সুশীলদের চোখে বিলাই মুতিয়া দিয়াছে।’

এখন তো খবরের কাগজেও এমন ছাপা হবে না। যারা প্রকাশ করবে তাদের তো মেরুদণ্ড মোটামুটি রাষ্ট্রের কাছে বন্ধক বললে বেশি বলা হবে না।

আসিফ নজরুল বলেন, আইনের শিক্ষক হিসেবে বলব, দেশে যখন আইনের শাসন থাকে না তখন মানুষের শুধু মৌলিক নয়, ইচ্ছাশক্তিও থাকে না। গুম, খুন, ধর্ষণ, হামলা-মামলায় দেশের মানুষ নিথর।

গৃহপালিত বিরোধী দল তো সাধারণ মানুষের কথাগুলো বলবে না, আর যারা রাজপথে বিরোধী দল হিসেবে আছে তাদের সাংগঠনিক শক্তি এতই দুর্বল যে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, নিজেদের অধিকার আদায়ের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আলো আসবেই, সময়ের ব্যাপার মাত্র।

সোনালীনিউজ/এমটিআই