মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

বাজেট বিশ্লেষণ

জবাবদিহিতে আন্তরিক হলে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা উজ্জ্বল

অধ্যাপক ড. মো. সেলিম উদ্দিন | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৯, রবিবার ০২:১২ পিএম

জবাবদিহিতে আন্তরিক হলে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা উজ্জ্বল

ঢাকা : আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে অনেকগুলো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদে গঠিত সরকারের প্রথম বাজেট এটি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলটির ইশতেহার, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার শেষ বছর, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর, উন্নয়নশীল দেশের পথে উত্তরণ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজি অর্জন, রোহিঙ্গা ইস্যু, বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০, রূপকল্প-২০৪১, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পরিকল্পনা, ডিজিটাল বাংলাদেশ, ডিজিটাল অর্থনীতি, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, সকল শ্রেণির-পেশার মানুষের স্বার্থ, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি কৌশলসমূহকে সামনে রেখেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। শস্যবীমা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বিনিয়োগ প্রণোদনা, প্রবাসী আয় আকর্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা প্রয়াস বৃদ্ধি, ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের সংস্কারের অঙ্গীকার, নতুন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বিষয়গুলো এ বাজেটকে কিছুটা নতুনত্ব দিয়েছে। কোনো ধরনের তাৎপর্যপূর্ণ নতুন কর আরোপ ছাড়াই এটা বিশাল, বৃহৎ এবং উচ্চ স্বপ্নের বাজেট। যদি আগামী ছয় মাসে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের কমপক্ষে ৩৫ শতাংশ সঠিক অর্থে ও মানসম্মতভাবে ব্যয় করা যায় তবে জনকল্যাণ হবে প্রশ্নাতীতভাবে।

মোদ্দাকথা, প্রস্তাবিত বাজেটের সাফল্য অনেকাংশ নির্ভর করবে সারা বছরের আর্থিক কর্মকাণ্ডগুলো মাসিক কিংবা ত্রৈমাসিকের ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে গুণগত ও পরিমাণগত বৈশিষ্ট্যের আলোকে মানসম্মত বাজেট বাস্তবায়নের ওপর। কেননা বিগত বছরগুলোতে বাজেট বাস্তবায়নের হার শতভাগ অর্জন করা যায়নি। আমরা দেখেছি, প্রায় ১০ শতাংশ থেকে ২৯ শতাংশ কম ছিল বাস্তবায়ন।

এই বাজেটে সবচেয়ে ভালো দিক হলো চলতি বছরের বাজেটের তুলনায় ২০১৯-২০ বাজেটের মোট ব্যয়, মোট রাজস্ব এবং এনবিআর নিয়ন্ত্রিত কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জবাবদিহিতে আন্তরিক হলে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে এডিপি এবং ঘাটতি অর্থায়নের বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি ২০১৮-১৯-এর সংশোধিত বাজেটের তুলনায় যা নিম্নের পর্যালোচনা থেকে স্পষ্ট হবে।

বিগত দুই অর্থবছর এবং চলতি বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৭ দশমিক ২৮, ৭ দশমিক ৮৬ এবং ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জন  এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আলোকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বাজেট ২০১৯-২০-এ মোট ব্যয় প্রাক্কলন হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। যেটি সংশোধিত ২০১৮-১৯ থেকে ৮০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য, ২০১৮-১৯-এর পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৭৮ কোটি টাকা যেটি ২০১৭-১৮ সংশোধিত বাজেট থেকে ২৫ শতাংশ বেশি। একইভাবে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। যেটি সংশোধিত ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ৬১ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা বা ১৯ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাক্কলন পূর্ববর্তী সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৭৯ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা বা ৩১ শতাংশ বেশি।

এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে কর রাজস্ব বিগত সংশোধিত বাজেট ২০১৮-১৯-এর ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা থেকে ৪৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বা ১৬ দশমিক ২৮ শতাংশ বাড়িয়ে ২০১৯-২০-এ প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, ২০১৮-১৯ বাজেটে এনবিআরনিয়ন্ত্রিত রাজস্ব ২০১৭-১৮ সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৭১ হাজার ২০১ কোটি টাকা বা ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি করে প্রাক্কলিত করেছে। এডিপিও একইভাবে ৩৫ হাজার ৭২১ কোটি টাকা বা ২১ দশমিক ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি করে সংশোধিত বাজেট ২০১৮-১৯-এর ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকায় স্থির করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭-১৮-এর সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এডিপি ২৪ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা বা ১৭ শতাংশ বাড়িয়ে ২০১৮-১৯ বাজেটে নির্ধারিত হয়েছিল। প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ হাজার ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা বা ৪৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ বৈদেশিক উৎস এবং ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা বা ৫৩ দশমিক ২২ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস হতে অর্থায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশোধিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেট  ঘাটতি ১ লাখ ২৫ হাজার ৯২৯ কোটি টাকায় নির্ধারিত করা হয়েছে। টাকা পরিমাণের ভিত্তিতে  প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধির পরিমাণ ১৯ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেশি। বিগত ২০১৮-১৯ বাজেটে প্রস্তাবিত ব্যয়ের প্রবৃদ্ধির (২৫ শতাংশ) চেয়ে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধির (৩১ শতাংশ) অনেক বেশি ছিল। কিন্তু ২০১৯-২০ বাজেটে এটি প্রায় সমপর্যায়ে রয়েছে যেটি সংখ্যাত্মক বাজেটে সামঞ্জস্য নির্দেশ করে ।

২০১৯-২০ বাজেট পর্যালোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট  হয় যে, মোট ব্যয়, মোট রাজস্ব, এনবিআর নিয়ন্ত্রিত রাজস্বগুলো বিগত ২০১৮-১৯-এর সংশোধিত বাজেটের তুলনায় যথাক্রমে ১৮ দশমিক ২২, ১৯ দশমিক ৩২ এবং ১৬ দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে। যেটি ২০১৮-১৯ বাজেটে পূর্ববর্তী সংশোধিত বাজেটের তুলনায় যথাক্রমে ২৫, ৩১ এবং ৩২ শতাংশ প্রাক্কলিত হয়েছিল। ফলে বলা যায়, ২০১৯-২০ বাজেট অন্যান্য আর্থিক বছরের বাজেটের তুলনায় বাস্তবায়নের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। কেননা বিগত কয়েক বছরের বাজেট  ও প্রকৃত অর্জন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রাক্কলিত রাজস্ব আহরণে এবং প্রস্তাবিত ঘাটতি অর্থায়নের ব্যর্থতার কারণে বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরসমূহের বাজেট এবং প্রকৃত ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মোট ব্যয়ে অব্যয়িত অংশ সর্বনিম্ন ২০১০-১১ বাজেটে ৩ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা বা বাজেটের ৩ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ২০১৬-১৭ বাজেটে যেটি ৭১ হাজার ১০৬ কোটি টাকা বা বাজেটের ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়নি। একইভাবে মোট রাজস্বের অনাহরিত অংশ সর্বনিম্ন ২০১০-১১ বাজেটে ৩৩১ কোটি টাকা এবং যেটি ২০১৬-১৭ বাজেটে সর্বোচ্চ ৪১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা বা বাজেটের ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ রাজস্ব আহরণে সমর্থ হয়নি।

বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, অবাস্তবায়িত ঘাটতি অর্থায়ন সর্বনিম্ন ২০১০-১১ বাজেটে ৪ হাজার ২৩ কোটি টাকা যেটি ২০১৬-১৭ বাজেটে সর্বোচ্চ ২৯ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, ২০১৬-১৭ বাজেটের ২৯,৩৬৪ কোটি টাকা অবাস্তবায়িত অর্থায়নের মধ্যে ২৪ হাজার ৭০২ কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নে ব্যর্থ হয় এবং অবশিষ্ট ৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়ন সম্ভব হয়নি বিধায় বাজেট বাস্তবায়নে সফল হয়নি।

রাজস্ব আহরণ এবং বৈদেশিক উৎস থেকে প্রাক্কলিত অর্থ যথাসময়ে সংগৃহীত না হলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে। এই জন্য রাজস্ব আহরণে এবং ঘাটতি অর্থায়নে  বিশেষ করে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নে  সাফল্য দেখাতে  না  পারলে প্রস্তাবিত বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তাই প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কলাকৌশলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা অতীতের  যে কোনো  সময় থেকে বেশি নিতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেট জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বিধানমূলক কর্মসূচি এবং কর সহনীয়করণসহ প্রবৃদ্ধি সঞ্চারী মেগা প্রকল্পসমূহ এবং স্থবির বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির নানা কলাকৌশল অগ্রাধিকার পেয়েছে। বড় আকারের বাজেটের পক্ষে ড. সেলিম উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অপার উন্নয়ন সম্ভাবনা, জনগণের প্রত্যাশা, ভোগ ও চাহিদার ক্রমোন্নতি, বর্তমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে বলা যায়, আকার রক্ষণশীল না হওয়াই ভালো। বড় আকারের বাজেটে অনেকে মনে করেন  অর্থের অপচয় ও অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আমি বলব, অর্থ বরাদ্দে উদারতা থাকা ভালো এবং অনেক সময় সফলতা আসে তবে অর্থ ব্যবহারে যথেষ্ট সতর্ক থাকা এবং অর্থ অপব্যবহার বা অপচয় রোধকল্পে সচেতনতাসহ কঠোরতা অবলম্বন করলে নির্বাচন বছরের এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে জুলাই/২০১৯ থেকে এর বাস্তবায়নে সব পক্ষকে আগ্রহ সহকারে অংশ নিতে হবে। বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ও বাস্তবায়নে বাজেট বক্তৃতায় সুনির্দিষ্ট অনেকগুলো প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবগুলো সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হলে এই বিশাল আকারের বাজেট বাস্তবে প্রতিফলিত করা সম্ভব। মুদ্রাস্ফীতি ৫.৫ শতাংশে রাখা, মধ্যমেয়াদি নীতি কৌশল কঠোরভাবে পরিপালনসহ কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, রপ্তানি খাত, আবাসন খাত ও সেবা খাতকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নেওয়ার অঙ্গীকার। দারিদ্র্যনিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট এবং আয় বৈষম্য নিয়ন্ত্রণের সবিশেষ উদ্যোগের কথা বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় দাবি করা হয়, বাংলাদেশের উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব-পশ্চিমে সব পেশার আপামর জনগণের স্বার্থে এবং সব পেশার মানুষকে বিবেচনায় নিয়ে এই বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে।

তাই মোট ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয় ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার মধ্যে সামাজিক অবকাঠামো খাতে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা (২৭.৪১ শতাংশ), ভৌত অবকাঠামোতে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা (২১.৪৬ শতাংশ), সাধারণ সেবা ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪১ (২৩.৬৩ শতাংশ) কোটি টাকা এবং সুদ পরিশোধ খাতে ৫৭ হাজার ৭০ কোটি টাকা (১০.৯১ শতাংশ) বরাদ্দ হয়েছে। প্রায় সব খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ চলতি সংশোধিত বাজেটের তুলনায় কোনো প্রবৃদ্ধি নেই। বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যেটি মানবসম্পদ উন্নয়নে ও গুণগত শিক্ষার ক্ষেত্রে এমপিওভুক্তির দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবি পূরণ হবে। এছাড়া পরিবহন ও যোগাযোগ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নসহ স্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ইত্যাদি খাতগুলোকে বিগত কয়েক বছরের মতো অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় শিল্পের সংরক্ষণ এবং রপ্তানি খাতকে প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা ও রাজস্ব আদায়ে বিভিন্ন উদ্যোগসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিকগুলোকে বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তি খাত ও সরকারি খাতে অব্যাহত বিনিয়োগ প্রসঙ্গ বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে যেটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, পল্লী উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আর্থিক খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে আর্থ-সামাজিক এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব এবং ব্যাংক ও পুঁজিবাজারসহ আর্থিক ব্যবস্থা সংস্কারের অঙ্গীকার এই বাজেটকে গতানুগতিক ধারা থেকে বের করে এনেছে। নতুন প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কৃষকদের জন্য শস্যবীমা, উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে যুবক বেকারদের জন্য ১০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন, প্রবাসীদের জন্য ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা ও বীমা সুবিধা, নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য তহবিল গঠন, সামাজিক সুরক্ষায় অতিরিক্ত জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তকরণ, নতুন এমপিওভুক্তির মাধ্যমে শিক্ষায় গতিশীলতা সৃষ্টির প্রয়াস, অটিস্টিকসহ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জন্য প্রণোদনা, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ১ শতাংশ হারে প্রণোদনা, গবেষণা উন্নয়ন খাতে অতিরিক্ত ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ, দারিদ্র্যবিমোচনে সুদমুক্ত ক্ষুদ্র ঋণসহ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা হাইটেক পার্কে বিনিয়োগে কর প্রণোদন এবং ভৌত অবকাঠামো খাতে শিল্পায়নের জন্য ১০ বছর কর অবকাশ উল্লেখযোগ্য।

প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে সামস্টিক অর্থনীতির দুর্বলতা, অসঙ্গতি, প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জসমূহের আলোকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বর্তমান বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। সক্ষমতার অভাবে এডিপি বাস্তবায়ন পুরোপুরি না হওয়ায় সরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে না। আবার বছর বছর সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, এর গুণগতমান বৃদ্ধি এবং অর্থবছর শেষ তিন মাসে বা শেষ প্রান্তিক অত্যধিক ব্যয় প্রবণতার কারণে সরকারি অর্থের অপচয়, কাজে নিম্নমান ও গুণগতমান হ্রাস, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। অন্যদিকে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ গত কয়েক বছর ধরে ২১-২২-২৩ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধিত জন্য এই হার জিডিপির ২৬-২৭ শতাংশে উন্নীত করা দরকার। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বিশেষ করে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আগামী অর্থবছরে উচ্চ সুদের হার, বিনিময় হার, চলমান তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণ সংকট, মুদ্রাস্ফীতির হার, বহিঃখাতের অসামঞ্জস্যতা,  বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলসহ পণ্যমূল্য বৃদ্ধি প্রবণতা  ইত্যাদি কারণে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ার সমূহ সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে অন্যান্য চ্যালেঞ্জসমূহের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব আহরণ, অবকাঠামোগত ঘাটতি, সরকারি  ব্যয়ের অগ্রাধিকার ঠিক করা, ঘাটতি  বাজেটের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা  বিশেষ করে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতাসমূহ, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, রপ্তানির প্রবৃদ্ধির তুলনায় আমদানি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক বৃদ্ধি, কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সঞ্চয় বিনিয়োগ তারতম্য ইত্যাদি  উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ব্যয়াধিক্য এবং বাস্তবায়ন সময়োত্তীর্ণের সঠিক ঝুঁকি নির্ণয়, মাসিক ভিত্তিতে  প্রকল্প ও রেজাল্ট ভিত্তিতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা  থাকা  দরকার। ব্যক্তি খাতের  বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বৈদেশিক সূত্র থেকে ঝামেলামুক্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত, সুদের হার, বিনিময় হার, মুদ্রাস্ফীতির হার, আস্থার উন্নতি, বিদুৎ-জ্বালানি, পরিবহন ও যোগাযোগ ইত্যাদি চলমান কার্যক্রমগুলোর সুষ্ঠু সমাপ্তিসহ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর জোর নজরদারি, তদারকি এবং স্থিতিশীলতা অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া বাজেটকে সঠিক বাস্তবায়নে সক্ষমতা, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের স্বচ্ছ রোডম্যাপ, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত পরিবর্তন ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে বাজেট বাস্তবায়নের  অনেক  চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা দূর হবে।     

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট, ব্যবসা ব্যয় হ্রাস, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্যবিমোচনের লক্ষ্যে এই বাজেটে সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যয়ের গুণগতমান, বাস্তবায়ন সময়, মোট প্রকল্প ব্যয় ইত্যাদির ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করে সঠিক ব্যয়ে, সঠিক সময়ে এবং সঠিক গুণে ও মানে প্রকল্প কার্য সমাপ্তির জন্য সঠিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এক দেশ বা অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত না করে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের প্রতিষ্ঠানসমূহকে সমসুযোগ দিলে প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু ঝুঁকি হ্রাস করা যায়। চলমান বৃহৎ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের হার সময় সময় প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রচারের ব্যবস্থা থাকা উচিত। যেমন বাংলাদেশ দৈনিক কতটুকু বা কত কিলোমিটার রাস্তা সম এককে তৈরি হচ্ছে, দৈনিক কত কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে (সম এককে) ইত্যাদি প্রকাশ করার জন্য সুপারিশ করছি। সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামোর কারণে সুফলগুলো সুস্পষ্ট করা উচিত বলে মনে করি। এই বাজেটে প্রবৃদ্ধি সঞ্চয়ী বৃহৎ ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোগত প্রকল্পসমূহ এবং স্থবির বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির নানা কলাকৌশল অগ্রাধিকার পেয়েছে।

করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখা, ১০ শতাংশ কর পরিশোধে বিনিয়োগ, ১৬ এফ ধারার অধীনে স্টক ডিভিডেন্টের ওপর ১৫ শতাংশ কর ধার্য ইত্যাদি বিষয়গুলো পুনরায় বিবেচনায় নিতে হবে। স্টক ডিভিডেন্টের এবং অবণ্টিত মুনাফা ও রিজার্ভের ওপর কর ধার্য বিশেষ করে ব্যাসেল ৩ অনুসারে ব্যাংকের মূলধন উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ভ্যাট আইন ২০১২ প্রণয়নে যদিও বলা হচ্ছে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে দোকান এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস এবং সেলস ডাটা কন্ট্রোলার স্থাপনের উদ্দেশ্যে আমদানি পর্যায়ে আছে। কিন্তু বিগত ৩/৪ বছরে এগুলো সরবরাহ করতে এনবিআর ব্যর্থ হয়েছে যেগুলো রাজস্ব আদায়ে দুর্নীতি অনেকাংশে কমাতে সাহায্য করবে। এ ব্যাপারে কঠোর না হলে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে।

লেখক : চেয়ারম্যান বিএইচবিএফসি, পরিচালক আইবিবিএল

সোনালীনিউজ/এমটিআই


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।