সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের লড়াই

সাধন সরকার | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৫ মে ২০১৯, রবিবার ০২:৫৩ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তনের লড়াই

ঢাকা : অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সুইডিশ রিসার্চ ইনস্টিটিউট স্টকহোম রেজিলিয়েন্স সেন্টারের জলবায়ু গবেষক উইল স্টেফেন এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, “মানুষ যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে, সেটাই পৃথিবীর তাপমাত্রার মূল নিয়ামক নয়। আমাদের গবেষণা বলছে, মানবসৃষ্ট কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে তা পৃথিবীর অন্যান্য ব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলবে, যাকে ‘ফিডব্যাক’ বলা হয়। এটা আরো উষ্ণতা তৈরি করতে পারে, এমনকি আমরা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ করলেও তা হতে পারে।” এ ঘটনায় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দীর্ঘমেয়াদে প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আর তাই জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে বিশ্ব।’ বাস্তবতাও সেকথা বলছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব আজ বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর মানুষ ১০ ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। তথ্যমতে, গত এক দশকে বরফ গলার হার চারগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর স্থলভাগ। ফলে জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে যেসব উপকূলীয় দেশ অস্তিত্ব সঙ্কটে রয়েছে সেসব দেশের প্রথম সারিতে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ। সম্প্রতি গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০১৯ সালে ‘বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে’ বাংলাদেশের অবস্থান নবম। গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ৭ নম্বরে। এ সময় এ দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রত্যেক দেশ কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপকূলীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এর জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলোর মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নির্গমন।

সম্প্রতি ‘জাতিসংঘ শিশু তহবিল’ (ইউনিসেফ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি শিশু। দেশের দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাস করা এসব শিশুর জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটা এখন এক দৃশ্যমান বাস্তবতা যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলোর শিশুরা অর্থ উপার্জনের জন্য যে কোনো কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে! এতে করে শিশুরা নানাবিধ শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়ছে। দায়িত্ব নিতে না পেরে অনেক পরিবার মেয়েশিশুদের দ্রুত বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে বহু পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে একপর্যায়ে কাজের খোঁজে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। এতে করে এসব পরিবারের শিশুরা পাচার হওয়াসহ যৌন হয়রানির ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা অতিমাত্রায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে প্রকৃতির স্বাভাবিক বদলে যাওয়ার ধরনও বদলে গেছে। শিল্পবিপ্লব পরবর্তী যুগে উন্নত দেশগুলোর মাত্রাতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতার মাত্রা বেড়ে গেছে বহুগুণ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে ঋতুচক্র বদলে গেছে। হিমবাহের বরফ গলছে, সমুদ্র উত্তপ্ত হচ্ছে, বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দুর্যোগে উপকূলীয় এলাকায় বসবাসরত মানুষের জীবনব্যবস্থা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিব্যবস্থা, স্থানচ্যুত হয়ে মানুষ অভিবাসী বা শরণার্থীতে রূপান্তরিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ভুগতে ভুগতে অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব পরিবার তাদের ও তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ২০১৫ সালের ফ্রান্সের প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিল্পযুগের আগের তুলনায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। বিজ্ঞানীরা এটাও সতর্ক করে দিয়েছে যে, এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে প্রকৃতি আরো প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠবে। ঝড়ঝঞ্ঝা, খরা, বন্যা, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের আকস্মিক দুর্যোগ আরো বেড়ে যাবে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও সুপেয় পানির সঙ্কট।

জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তথ্যমতে, চলতি শতকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে! জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে লন্ডনসহ বিশ্বের ৩৩টি দেশের মোট ৮০টি  গুরুত্বপূর্ণ শহরে থেমে থেমে আন্দোলন চলছে। আন্দোলনরত মানুষ ও সংগঠনের মূল দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে বিভিন্ন দেশ বা কর্তৃপক্ষ প্রকৃত সত্যটা বলছে না এবং তাদের দাবি কার্বন নির্গমনের হার শূন্যে নামিয়ে আনা হোক। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে সমালোচনা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এ কারণে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি যে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে সেকথা এখনো বলা যাবে না; একথা যেমন ঠিক এটাও ঠিক যে, যুক্তরাষ্ট্র না থাকার কারণে সবচেয়ে বেশি  কার্বন নির্গমন করা উন্নত দেশগুলোকে এক কাতারে নিয়ে এসে জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবেলায় নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (এসডিজি) অর্জন ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। প্রতিটি শিশুর টেকসই ও উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে উন্নত দেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একযোগে কাজ করতে হবে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে ১ কোটি ৯০ লাখ শিশু। সাইক্লোন-বন্যা এবং পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের প্রতি তিনটি শিশুর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ১ কোটি ৯৪ লাখ শিশুর মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখ শিশু নদীভাঙন এলাকা কিংবা এর কাছাকাছি থাকে। ৪৫ লাখ শিশুর বসবাস উপকূলীয় এলাকায়। খরার ঝুঁকিতে রয়েছে আরো ৩০ লাখ শিশু। সুতরাং উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশ বিপর্যয় রোধে উন্নত ও অনুন্নত সব রাষ্ট্রকেই সম্মিলিতভাবে কাজ করার সময় এসেছে। আমাদের এখন সেদিকেই নজর দিতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।