বুধবার, ২৬ জুন, ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

জলবায়ু পরিবর্তনে সন্তান জন্মদানে বাড়ছে শঙ্কা

নিউজ ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২১ মে ২০১৯, মঙ্গলবার ০৪:১১ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তনে সন্তান জন্মদানে বাড়ছে শঙ্কা

ঢাকা : বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন। এ জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীকে ঠেলে দিচ্ছে চরম ক্রান্তিলগ্নে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উন্নত বিশ্বের নারী ও পুরুষের মধ্যে সন্তান জন্মদানের বিষয়ে অনীহা ও আতঙ্ক তৈরি করছে। এ অবস্থায় অনেকেই সন্তান জন্ম না দেওয়াকে জলবায়ু পরিবর্তনে করণীয় সম্পর্কে মানুষকে সচেতেনতার কর্মসূচি হিসেবে মনে করছেন। জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ডয়চে ভেলে’ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরে।

জার্মানির স্কুলশিক্ষিকা ফেরেনা ব্রুনশভাইগার সন্তান জন্মদানকে চরস এক আকাঙ্ক্ষার মাধ্যম দেখছেন। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তার এই আকাঙ্ক্ষা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়টিকে সামনে রেখে যেসব নারী ও তরুণ-তরুণী সন্তান না নেওয়ার আন্দোলেন শুরু করেছেন, এখন তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন জার্মানির বাভারিয়া রাজ্যের এই বাসিন্দা। তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আমরা এটা নিয়ে দীর্ঘ সময় গভীরভাবে চিন্তা করেছি। ঘটনাচক্রে জলবায়ু পরিবর্তনই আমার কাছে (সন্তান না নেওয়ার) প্রধান কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে| অবশ্য আমি অনেক সংগ্রাম করেছি এটা নিয়ে। কারণ, আমরা শিশুদের ভালোবাসি। আমার স্বামীও একজন স্কুলশিক্ষক। বোধ করি, আমরা সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি।

বিশ্বের তরুণ সমাজের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন এমনভাবে প্রভাব ফেলছে যে, তারা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড় থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ে বলে তরুণরা বেশ চিন্তার মধ্যে পড়েছেন।

গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে না পারলে ২০৫০ সালের মধ্যে কোটি কোটি মানুষ বিপদে পড়তে যাচ্ছেন বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। এ ক্ষেত্রে বিমানে কম চড়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলেছেন, কম সন্তান নেওয়া, উদ্ভিদ জাতীয় খাবার খেয়ে উন্নত বিশ্বের মানুষ ব্যক্তিগতভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে পারেন।

পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়েই চলছে যেটা একটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলে মনে করেন জার্মানির স্কুলশিক্ষিকা ব্রুনশভাইগার। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে ৭৬০ কোটি থেকে ২০৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ১ হাজার কোটি হতে চলেছে। এটা কার্বন নিঃসরণ ও সম্পদের সমস্যা বাড়ানোর বড় কারণ হবে বলে জানান তিনি।

মিউজিশিয়ান ও অ্যাক্টিভিস্ট ব্লাইথ পেপিনো সন্তান নেওয়ার জন্য বেশ ইচ্ছে পোষণ করলেও ২ বছর আগে তিনি একটি গবেষণা প্রতিবেদনে চোখ বুলিয়ে পাল্টে ফেলেন সিদ্ধান্ত। গবেষণা পত্রটি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয় তুলে ধরে জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিপদের সম্মুখীন হবে।

যেসব নারী সন্তান জন্ম না দিতে পণ করেছেন, তাদের নিয়ে ‘বার্থস্ট্রাইক’ নামে বিশ্বব্যাপী একটি ক্যাম্পেইন গ্রুপ চালু করেছেন পেপিনো। জীববৈচিত্র্যে সংকটের ভয়াবহতা এবং সরকারি উদ্যোগের অভাবের ফলে নারীরা এ রকম সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে তার ভাষ্য।

পেপিনো রয়টার্সকে বলেন, আমরা নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি না। এটা যখন ভাবি, তখন আমি বুঝতে পারি সন্তান নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। যদিও এটাকে মায়েদের জন্য এক ধরনের অবিচার বলে মানছেন তিনি। কারণ, সন্তান না নেওয়া ‘বড় ধরনের একাকিত্বের’ই ব্যাপার। পেপিনো বলেন, ‘বার্থস্ট্রাইক’ প্রচারাভিযানের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সহজে ‘দৃষ্টিগ্রাহ্য’ বার্তাই দিতে চাচ্ছেন তারা, যা তাদের আন্দোলনে আবেগের সংযোগও তৈরি করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উদ্বেগ জন্মহারে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো উপাত্ত পাওয়া যায়নি। তবে ২০১৭ সালের এক হিসাব থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি নারীর গড় সন্তানের সংখ্যা ১ দশমিক ৮-এ নেমে এসেছে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। অন্য উচ্চ ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে জন্মহার স্থিতিশীল থাকতে কিংবা কমতে দেখা গেছে।

জনসংখ্যার ওঠানামার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা কষ্টকর হলেও জলবায়ু পরিবর্তন যে এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে তা স্পষ্ট। কারণ, একটা বড় অংশের মানুষ এর ফলে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে ভীতি কিংবা অনীহার কথা বলছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার লোকের মধ্যে চালানো এক জরিপে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি নারী সন্তান জন্মদানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনকে বিবেচনায় নিচ্ছেন।

আরেক গবেষণায় দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্বেগ থাকলেও ৩৩ শতাংশ বলছেন, এরপরও তারা সন্তান নেবেন এবং পরিবার চালু রাখবেন।

নারীদের এমন উদ্বেগ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জনসংখ্যার সম্পর্ক নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে আনছে। কেউ কেউ দুটোকে সম্পর্কিত করার চেষ্টা করলেও অনেকে আবার থোড়াই কেয়ার করছেন৷ কম-সন্তান জন্মদানকে উন্নত বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে একটি সফল উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল ২০১৭ সালের এক গবেষণায়| ওই গবেষণায় দেখানো হয়, একটি সন্তান কম জন্ম দিলে, ভবিষ্যতে তিনি এবং তার পরবর্তী প্রজন্মের হাত থেকে বিশ্ব প্রতিবছর ৫৮ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড রক্ষা পাবে।

তবে বিষয়টি ভীতিকর বিষয় বলে মনে করেন টেকসই উন্নয়নবিষয়ক পরামর্শক ক্যারেন হার্ডি। তিনি বলেন, ‘অনেকে বলতে চান, জনসংখ্যা আর জলবায়ু পরিবর্তনকে’ মেলানোর কিছু নেই। কিন্তু আমার মনে হয়, এমনটা বলা বালির মধ্যে মাথা লুকানোর মতো আমি দেখেছি, তরুণরা এমন কুসংস্কার ভাঙতে চাইছেন। তবে তিনি আরো বলেন, জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক বোঝা খুব সহজ নয়। কারণ, কার্বন নিঃসরণের হিসাব বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হয়।

আফ্রিকার দেশ নাইজার পৃথিবীর শীর্ষ জন্মহারের দেশ। ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, এখানে গড়ে প্রতি নারী সাতজন সন্তানের জন্ম দিয়ে থাকেন। তবে বিশ্বব্যাংকের এক হিসাবে দেখা যায়, এই নাইজারই কার্বণ নিঃসরণে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। সেখানে প্রত্যেকে প্রতি বছর গড়ে মাত্র দশমিক ১ টন কার্বন নিঃসরণ করে থাকেন। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিজন গড়ে কার্বন নিঃসরণ করে থাকেন ১৬ দশমিক ৫ টন।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue