শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

নগদ লেনদেন সীমা নির্ধারণ করা উচিত : মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

টাকা ঘরে রাখার প্রবণতা বাড়ছে!

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০১৯, শুক্রবার ০৩:০৭ পিএম

টাকা ঘরে রাখার প্রবণতা বাড়ছে!

ফাইল ছবি

ঢাকা : টাকা ঘরে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে অবৈধভাবে আয় করা টাকা ঘরে রাখছেন দুর্নীতিবাজরা। টাকা ঘরে রাখার এই প্রবণতা দুশ্চিন্তা তৈরি করছে। অবশ্য এর পরিমাণ কত, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই সরকারের কোনো সংস্থার কাছেই।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতির এই কালো ছায়া দূর করতে নগদ লেনদেনের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। নির্ধারিত সীমার বাইরে সব লেনদেন চেকের মাধ্যমে করার বিধান চালু করতে হবে শিগগিরই।

সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সূত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঘরে রাখা নগদ টাকার পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি। সরকারের চলমান শুদ্ধি অভিযানের পর বিষয়টি উদ্বেগজনকভাবে সামনে আসতে শুরু করেছে।

সর্বশেষ ক্যাসিনো হোতা সেলিম প্রধানের বাসায় অভিযানে বিপুল পরিমাণ  টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়।  তার দুই বাসায় প্রায় ৩০ লাখ নগদ টাকা পাওয়া যায়। আর প্রায় ৭০ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে গেণ্ডারিয়া আওয়ামী লীগের দুই নেতার বাসা থেকে ৫ কোটি টাকা নগদ উদ্ধার করা হয়। যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের অফিসে তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া যায় প্রায় দুই কোটি টাকা।  

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থ হাতে রাখার প্রবণতা খুব খারাপ বার্তা দেয়। এমনটি হয় সব নেতিবাচক কারণ থেকে। প্রথমত ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রতি মানুষের অনাস্থা। দ্বিতীয়ত টাকার উৎস বেআইনি হলেও তা বৈধভাবে রাখা যায় না। এসব টাকা অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও ব্যবহার হয় সব অবৈধ কর্মকাণ্ডে।

ঘুষ, দুর্নীতিসহ কালো টাকার জোগান হিসেবে ঘরে রাখা নগদ টাকা ব্যবহার হয়ে থাকে। অপরদিকে এ কারণে ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকার টানাটানি তৈরি হচ্ছে। বড় অঙ্কের অর্থ হিসাবের বাইরে থাকায় নষ্ট হচ্ছে অর্থনৈতিক ভারসাম্য।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, নগদ টাকা লেনদেন বন্ধের দিকে যেতে হবে আমাদের। একটি নির্ধারিত অর্থের বেশি নগদ লেনদেন করা যাবে না। সেটি দশ হাজার টাকাও হতে পারে। এর বেশি পরিমাণের আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করতে হবে চেকের মাধ্যমে। এতে কালো টাকার ছায়া অর্থনীতি থেকে দূর হবে। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে।

অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, সরকারের শুদ্ধি অভিযানে যাদের নাম আসছে তাদের অনেকের ব্যাংক হিসাব তলব করছে। তবে তাদের বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

কিন্তু শঙ্কার বিষয়, ব্যাংক হিসাব তলব করে খুব বেশি কিছু পাওয়া যাবে কি-না। কারণ যেভাবে ঘরে টাকা রাখার তথ্য মিলছে তা উদ্বেগজনক। অনেকে আবার সুবিধা মোতাবেক, টাকা বাইরে সরিয়ে নিচ্ছেন।

ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযানে দিশেহারা রাঘববোয়ালরা নিজেদের বাঁচাতে টাকা লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সচিবালয়ে জানিয়েছেন, দুর্নীতিবাজদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। অপকর্মকারীদের সেই তালিকা প্রধানমন্ত্রীর হাতে। ওই তালিকায় প্রভাবশালীদের নামও এসেছে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অবৈধ পথে উপার্জিত টাকা পাচার করা হচ্ছে দেশের বাইরে। বিদেশে আখের গোছাচ্ছেন অনেকে।

২০১৮ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের আমানত দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। ঠিক এক বছর আগে যার পরিমাণ ছিল ৪ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদেশে নেওয়ার আগে টাকা ব্যাংক থেকে বের করে নিলে সমস্যা হতে পারে। সে কারণেও হাতে টাকা রাখা হয়। চলমান ঘটনায় যে অর্থ উদ্ধার হয়েছে, তার উৎস খতিয়ে দেখতে হবে। মানি আউটসাইড ব্যাংক অর্থাৎ ব্যাংক খাতের বাইরে যে টাকা আছে, সেটা উন্নত দেশে খুব কম থাকে। কারণ তাদের টাকা বাইরে রাখার দরকার নেই।

সোনালীনিউজ/এমটিআই