শুক্রবার, ০২ অক্টোবর, ২০২০, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭

ডিপিডিসির ‘সর্ষের মধ্যেই ভূত’

এস এম সাব্বির খান | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২০, বৃহস্পতিবার ০৪:২৯ পিএম

ডিপিডিসির ‘সর্ষের মধ্যেই ভূত’

ঢাকা : স্বাস্থ্য খাতের ডামাডোলে সাময়িকভাবে ঢাকা পড়লেও ফের আলোচনায় উঠে এসেছে বিতর্কিত ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল কাণ্ড। করোনাকালীন পরিস্থিতির মাঝে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসের সমন্বিত বিদ্যুৎ বিলের অস্বাভাবিকতার জেরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ডেসকো-ডিপিডিসিসহ দেশের চারটি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা।

বিষয়টি আমলে নিয়ে সংসদীয় অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ অন্যান্য সংস্থাগুলোকে অনতিবিলম্বে এ সমস্যা সমাধানে এবং জড়িতদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশনা প্রদান করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

এরই ধারাবাহিকতায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ডিপিডিসি (ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি)। অতিরিক্ত বিল আদায় করায় ডিপিডিসি একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত এবং সংস্থাটির ৩৬ জন নির্বাহী প্রকৌশলীকে শোকজ করে কমিটি।


এদিকে শোকজের জবাবে দিতে গিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীরা বলছেন, কর্তৃপক্ষের আদেশেই অতিরিক্ত বিল করেছিলেন তারা। এতে করে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল কাÐের দায় নির্বাহীদের কাঁধে চাপাতে গিয়ে উল্টো অভিযোগের কাঠগড়ায় এখন ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ।

ডিপিডিসি সূত্র বলছে, সরকারের নির্দেশে অতিরিক্ত বিলের জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিটি করেছিল সংস্থাটি। ওই তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (আইসিটি) এম এম শহিদুল ইসলাম।

ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলীরা শোকজের যে জবাব দিয়েছিলেন তাতে বলা হয়েছে, এই শহিদুল ইসলামই তাদের মেইল করে অতিরিক্ত বিল আদায় করার নির্দেশ দিয়েছিল। ডিপিডিসির এই নির্বাহী পরিচালক ঢাকার কোন এলাকায় কত ভাগ বাড়তি বিল করতে হবে তারও একটি তালিকা তাদের দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ীই বিল করেছেন তারা। আর এককভাবে একজন নির্বাহী পরিচালক এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায় থাকারও অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযুক্তকে দিয়েই ডিপিডিসি'র এই তদন্ত কমিটি করার বিষয়ে অভিযোগ ছিল শুরু থেকেই। তবে নির্বাহী প্রকৌশলীদের শোকজের জবাবে তা আরও স্পষ্ট হলো।

শোকজের জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, মার্চ মাসের বিল ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল কতভাগ বেশি করতে হবে তার একটি তালিকা প্রত্যেক নেটওয়ার্ক অপারেশন অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস (এনওসি)-কে পাঠানো হয়েছিল, সেটিও সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে বলা হয়েছে, মিটার না দেখে বিল করাতে যারা বাসাবাড়িতে ছিল না তাদের কাছেও অতিরিক্ত এই বিল চলে যায়। দোকানপাট এবং অফিস আদালত বন্ধ থাকলেও তারা নিয়মিত ব্যবহারের অতিরিক্ত বিল পান। তবে মে মাস থেকে আবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার রিডিং নিয়ে বিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বিলও সমন্বয় করার কথা জবাবে জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলীরা।

সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ডিপিডিসি'র যে নির্বাহী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল তার চিঠিতে অতিরিক্ত বিল করার পাশাপাশি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে বিনা অনুমতিতে কথা বলার জন্যও অভিযোগ করা হয় বলে জানা গেছে।

সংস্থার এই তদন্ত কমিটি অতিরিক্ত বিল বানানোর অভিযোগে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ চার জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ৩৬টি এনওসির নির্বাহী প্রকৌশলীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আরও ১৩ জন মিটার রিডার এবং ডাটা অ্যান্ট্রি অপারেটরসহ মোট ১৪ জনকে চুক্তিভিত্তিক কাজ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে ডিপিডিসি। তবে এজন্য যারা অতিরিক্ত বিলের আদেশ জারি করেছিল তাদের কাউকে কিছু বলা হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি প্রতিষ্ঠানের পর পর তিন মাস অতিরিক্ত বিল করা হলো, বিষয়টি শীর্ষ পর্যায়ের কেউ দেখলোই না, এই অযৌক্তিক বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিষ্ঠানটির একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে পাঁচ জন নির্বাহী পরিচালক রয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. সুলতান আহমেদের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে।

মাসের পর মাস গ্রাহক হয়রানিমূলক এসব অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে কেন পরিচালনা পর্ষদ আগেভাগে কোনও ব্যবস্থা নিলো না, সেটিকেও একটি বড় প্রশ্ন হিসেবেই এক্ষেত্রে তুলে ধরা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছাড়া অধীনস্থরা টানা তিন মাসের বিদ্যুৎ বিল তৈরিতে হিসেবের এত বড় গড়মিল করবে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

সেক্ষেত্রে, বিষয়টি সম্পর্কে এতদিন ধরে ওপর মহলের নিরবতাও ভাবনার বিষয় বলে মনে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (আইসিটি) এম এম শহিদুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান মুঠোফোনের মাধ্যমে জানান, যেসব অভিযোগ এসেছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করতে কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মো. গোলাম মোস্তফাকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তারা প্রয়োজনে অভিযুক্তদের ডাকবেন, কথা বলবেন, এরপর প্রতিবেদন দেবেন। এরপর আমরা দেখবো কী করা যায়। এখনই কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে বিতর্কিত তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব প্রদানের প্রেক্ষাপটে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল কান্ডে ডিপিডিসি কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে এবং আদৌ এই ঘটনায় সম্পৃক্তদের পাশাপাশি মূল হোতাদের সামনে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংস্থাটির একজন নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বিতর্কিত ইস্যুটিতে যাদের দায়ী সাব্যস্ত করার প্রচেষ্টা চলছে তারা সবাই নির্দেশদাতাদের অধীনস্থ। ওপর মহল যা নির্দেশ দেবে তারা মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করেন মাত্র। এত বড় একটি বিষয় তাদের দ্বারা ঘটলো আর কর্তৃপক্ষের কেউ তা জানলেনও না সেটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না বরং নির্দেশদাতাদের গা বাঁচাতে বাকিদের কাঁধে দোষ চাপিয়ে দেয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে প্রায় একই বক্তব্য তুলে ধরে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ওপরের কর্মকর্তাদের নির্দেশ ছাড়া মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কিছুই করা সম্ভব নয়। আগেই যদি ব্যবস্থা নেয়া হতো তাহলে আজকের এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।

তিনি আরও বলেন, প্রথম থেকেই মাঠের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শোকজ করা হলো আর দায়ীদের আড়ালে রেখে দেয়া হয়েছিল। এখনও সময় আছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক।

চলমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে সাধারণ ভুক্তোভুগিদের অভিমত, সাধারণের ভোগান্তি কমাতে নয় বরং নিজেদের দায় মুক্তির তাড়নায় কর্তৃপক্ষের এই তৎপরতা। নিজেদের মাঝে তাদের এমন দড়ি টানাটানি আর অভিযোগের কাদা ছোড়াছুড়িতে দীর্ঘায়িত হবে সমাধান প্রক্রিয়া। ফলে মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে।

প্রসঙ্গত, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল সরবরাহের ফলে সারা দেশের গ্রাহকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ বিভাগ একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছিল। এখনও ভুতুড়ে বিলের অভিযোগে দায়ীদের শাস্তি দেওার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও তদন্তের কাজ এখনও বাকি রয়েছে বলেও জানা গেছে। কর্মকর্তাদের শোকজের পর তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশও দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সোনালীনিউজ/এমটিআই