রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

ডেঙ্গু : আতঙ্ক এবং কিছু ভুল ধারণা

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০১ আগস্ট ২০১৯, বৃহস্পতিবার ০২:১৭ পিএম

ডেঙ্গু : আতঙ্ক এবং কিছু ভুল ধারণা

ঢাকা : চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিন প্রচুর রোগী আসছে। কারো কারো ভর্তিও লাগছে। রোগীর চাপ এত বেশি যে, হাসপাতালগুলোতে জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইতোমধ্যে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। রক্ত ও প্লাটিনামের সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ ভর্তি রোগীদের বেশির ভাগই খুব দ্রুত খারাপ হয়ে যাচ্ছেন। মোটামুটি সবাই জানেন এডিস মশার মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়।  

ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো রোগীকে এডিস মশা কামড়ালে তিনি নিজেও ডেঙ্গু  ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যান। এই মশা যখন আরেকজন সু্‌স্থ ব্যক্তিকে পুনরায় কামড়ায় তখন সু্‌স্থ মানুষটিও ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হন। তাই ডেঙ্গুরোগ বাহিত মশার কামড় থেকে দূরে থাকলেই শুধু ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব। কারণ এ রোগের কোনো টিকা এখনো চালু হয়নি। তবে চেষ্টা চলছে। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো পাওয়া যাবে।

প্রতিরোধ : সাধারণত বর্ষার সময় দিনের বেলায় বিশেষ করে সন্ধ্যার আগে এবং ভোর বেলায় এডিস মশা কামড়ায়। তাই দিনের বেলা ঘুমাতে চাইলে মশারি টাঙিয়ে নিতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই মশারির মধ্যে রাখতে হবে যাতে পুনরায় রোগীকে কোনো মশক কামড়াতে না পারে।

নিজ দায়িত্বে বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বাড়ির আশপাশে এমন কোনো অব্যবহূত জিনিস রাখা যাবে না যাতে পানি জমতে পারে। যেমন ভাঙা ফুলের টব, অব্যবহূত কৌটা, ভাঙা ফুলদানি, ভাঙা বেসিন, অব্যবহূত টায়ার, ডাবের খোসা, মুখ খোলা পানির ট্যাঙ্ক, প্লাস্টিকের প্যাকেট, পলিথিন ইত্যাদি।

উপসর্গ : উচ্চ জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথা, চোখে, জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধিতে, মাংসপেশি অথবা হাড়ে ব্যথা। হামের মতো র্যাশ বা ফুসকুড়ি; নাক, দাঁতের মাড়ি থেকে অল্প রক্তপাত ইত্যাদি সাধারণ ডেঙ্গু  জ্বরের লক্ষণ। লক্ষণগুলো রোগীর বয়স অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। ছোট বাচ্চা ও প্রথমবার আক্রান্তদের থেকে বয়স্ক, শিশু ও দ্বিতীয়বার আক্রান্তদের মাঝে রোগের তীব্রতা বেশি হয়। সাধারণত ৩-৭ দিনের মধ্যেই জ্বরের তাপমাত্রা কমতে থাকে। তবে তীব্র পেট ব্যথা ও ক্রমাগত বমি, ত্বকে লাল দাগ, নাক ও মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়লে, বমির সঙ্গে রক্ত এলে, কালো বা আলকাতরার মতো পায়খানা হলে, ত্বক ফ্যাকাশে, ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে হলে, শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

চিকিৎসা : এই রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তাই রোগ লক্ষণগুলোর ওপর চিকিৎসা দেওয়া হয়। সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখুন। প্রচুর পানি ও তরল খাবার (খাবার স্যালাইন, ঘরে তৈরি ফ্রেশ জুস, শরবত, ডাবের পানি, চিড়ার পানি, ভাতের মাড় ইত্যাদি) দিন। স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে কাপড় ভিজিয়ে শরীর বারবার মুছে দিন। মাথায় পানি, কপালে জলপট্টি দিন। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বা সিরাপ খাওয়ানো যায় কিন্তু রোগীকে অ্যাসপিরিন, স্টেরয়েড, অ্যান্টিবায়োটিক বা এ জাতীয় ওষুধ দেবেন না।

কিছু ভুল ধারণা : ডেঙ্গু নিয়ে অনেক রকম ভুল ধারণা রয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে ভোগান্তি বাড়ায়। সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্ন তা হলো ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে কি না? তাদের ধারণা শিশুর হয়তো ডেঙ্গু জ্বর হবে।

কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। মায়ের দুধের সঙ্গে ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুর ভাইরাস শিশুর শরীরে যেতে পারে না। তবে শিশুটিকে যদি ডেঙ্গু জ্বর আক্রান্ত মশা কামড় দেয়, তাহলে শিশুটিরও ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর একটা ছোঁয়াচে রোগ, আক্রান্ত রোগীকে স্পর্শ করলে বা সঙ্গে থাকলে অথবা যত্ন করলে, একসঙ্গে খাবার খেলে তারও ডেঙ্গু  হয়ে যাবে, আক্রান্ত রোগীকে পৃথক করে রাখা উচিত।

এমন ধারণা আছে অনেকের মনে। কিন্তু প্রকৃত সত্য ঠিক উল্টো। ডেঙ্গু  জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে স্পর্শ করলে, একই বিছানায় ঘুমালে, একই তোয়ালে কিংবা একই কাপড়চোপড় ব্যবহার করলে, একই গ্লাস বা প্লেট ব্যবহার করলে অন্যদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে আক্রান্ত ব্যক্তি উপসর্গ দেখা দেওয়া থেকে শুরু করে ছ-সাত দিন পর্যন্ত মশার জন্য সংক্রমক হিসেবে কাজ করে।

অর্থাৎ এ সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো এডিস মশক কামড় দিলে সেও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহক হয়ে পড়বে। তবে আক্রান্ত ব্যক্তি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেলে তখন আর এটি হবে না। তাই এ সময়ে আক্রান্ত রোগীকে মশারির নিচে রাখা যেতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন একবার এই জ্বর হলে বাকি জীবন আর কখনো হবে না। এই ধারণাও সত্য নয়।

কারণ, ভাইরাসের যে কোনো একটি প্রজাতি দিয়ে একবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পর ভবিষ্যতে ভাইরাসের সেই প্রজাতি দ্বারা আর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই ।

কারণ, রোগীর আজীবন প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। তবে বাকি তিনটি প্রজাতির যে কোনো একটি দিয়ে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে কেউ যদি পৃথকভাবে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রজাতি দিয়ে জীবনে চারবার আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে বাকি জীবন আর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত নাও হতে পারেন,যা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

ডেঙ্গুর জীবাণু বাতাসে ছড়ায় এমনও ভাবেন অনেকে। আসলে শুধু ডেঙ্গু  ভাইরাস আক্রান্ত এডিস মশার কামড়েই কোনো ব্যক্তি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হতে পারেন। কাজেই বাতাসে ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণু উড়ে বেড়ানোর সুযোগ নেই। অনেকে আবার খাওয়ানোর ব্যাপারে ভুল জানেন। ডেঙ্গু রোগীকে শুধু স্যালাইন কিংবা শুধু তরল খাওয়ানো যাবে আর কিছু না। আসলে সবই খাওয়ানো যাবে, তবে তরল খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে।

লেখক :  ডা. অমৃত লাল হালদার, শিশু বিশেষজ্ঞ, আবাসিক চিকিৎসক, শিশু ও নবজাতক বিভাগ,
বারডেম জেনারেল হাসপাতাল-২ (মহিলা ও শিশু হাসপাতাল), সেগুনবাগিচা, ঢাকা। ফোন : ০১৬৩৬৬৯২২৯৮