শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

ড্যান্ডিতে বুঁদ পথশিশুরা

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০১৯, রবিবার ০৩:৪৬ পিএম

ড্যান্ডিতে বুঁদ পথশিশুরা

ঢাকা : রাজধানীর মৌচাক-মালিবাগ ফ্লাইওভারের নিচে মালিবাগ রেললাইন অংশে জটলা করে কতক পথশিশু ঘোলাটে পলিথিনসদৃশ বস্তুতে মুখ ঢুকিয়ে কিছু শুঁকছিল। আশপাশ থেকে কথা কানে আসে— ড্যান্ডি খাচ্ছে, নেশা করছে।

এমন দৃশ্য রাজধানীসহ বিভাগীয় সব শহরে দেখা যায়। পথশিশু থেকে শুরু করে ছিন্নমূল অনেকেই এমন নেশা গ্রহণ করে।

অবশ্য তাদের আইনের আওতায় আনার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যেই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, ড্যান্ডি শিশুর শরীরে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

কষ্টের বিষয় আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টরা জানান, ড্যান্ডি এখনো নেশার বস্তু হিসেবে তালিকাবদ্ধ হয়নি। তাই তাদের কিছুই করার নেই। এটি রোধ করতে সামাজিক সচেতনতা জরুরি বলে মত তাদের।

সবিস্তার জানা যায়, নেশার এই উপকরণটির নাম ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ বা ড্যানড্রাইট আঠা, তবে ‘ড্যান্ডি’ নামেই বেশি পরিচিত। ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ নামক আঠালো বস্তুটি (গাম) দিয়ে নেশা করে অসংখ্য পথশিশু-কিশোর। টলুইন সমৃদ্ধ এই অ্যাডহেসিভ মূলত ছোটখাটো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, ডিভাইস, চামড়া ও প্লাস্টিকের পণ্য জোড়া লাগানোর কাজে ব্যবহূত হয়। মূলত ‘ড্যান্ডি’ আঠা ঘ্রাণযুক্ত এবং ঘ্রাণ থেকেই এক ধরনের আসক্তি হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতে তৈরি ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ টিউবে এবং কৌটায় দুভাবে পাওয়া যায়। প্রতিটি টিউবের দাম ১৫০-২০০ টাকা, কৌটার দাম ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা। এগুলো সাধারণত হার্ডওয়ারের দোকানে বিক্রি হয়। দাম বেশি হওয়ায় আসক্ত শিশুরা কৌটা কিংবা টিউব কেনে না। তারা যার যার প্রয়োজন অনুযায়ী ইলেকট্রনিক রিপেয়ারের দোকান বা জুতা মেরামতকারীদের (মুচি) কাছ থেকে ২০-৩০ টাকার বিনিময়ে অল্প করে সংগ্রহ করে থাকে।

মৌচাক-মালিবাগ ফ্লাইওভারের নিচের পথশিশুরা জানায়, প্রথম প্রথম ঘ্রাণটা ভালো না লাগলেও পরে ধীরে ধীরে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। একবার ড্যান্ডির ঘ্রাণ নিলে সারা দিন মাথা ঝিম ঝিম করে, কারো কথা মনে পড়ে না।

ঢাকার গুলিস্তান, খিলগাঁও, কমলাপুর, তেজগাঁও, রামপুরা এলাকা ঘুরে অনেক পথশিশুকে এভাবেই নেশা করতে দেখা যায়। পথশিশুদের কেউ কেউ দিনের বেলা নেশা করলেও বেশিরভাগই নেশা করে রাতে। কেউ একা, আবার কেউ কেউ গোল হয়ে বসে সংঘবদ্ধ হয়ে নেশা করে। পলিথিন, প্লাস্টিক ছাড়াও নিজের পরিধেয় জামায় ড্যান্ডি গাম লাগিয়ে নেশা করে তারা।

বিভিন্ন বিভাগীয় শহরেও পথশিশুদের ড্যান্ডি সেবন করতে দেখা যায়। চট্টগ্রাম মহানগরীর শিল্পাঞ্চল কালুরঘাট, ইপিজেড, ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র বহদ্দারহাট, নিউমার্কেট, চকবাজার, জিইসি, শপিং কমপ্লেক্স, আগ্রাবাদ, লালখান বাজার, রেল ও বাস স্টেশন এলাকায় ড্যান্ডিতে বুঁদ থাকতে দেখা যায় পথশিশুদের। ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সের এই পথশিশুরা পলিথিন ব্যাগে নাক-মুখ ডুবিয়ে ড্যান্ডি শোঁকে।

নগরীর নিউমার্কেট সড়কে এক পথশিশু আড়ষ্ট চোখে জানায়, এটা ড্যান্ডি, নেশা। একবার খাইলে সারা দিন মাথা ঝিম ঝিম করে, কারো কথা মনে পড়ে না। মনের দুঃখও থাকে না। পথশিশুরা বলে, ড্যান্ডি এক ধরনের নেশা। মাত্র ২০-৩০ টাকায় কেনা যায়। অনেক সময় খাবার না খেয়ে ড্যান্ডি কিনে খাই। এটি খাইলে ক্ষুধার কথাও মনে থাকে না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো উপ-অঞ্চলের উপপরিচালক শামীম আহম্মেদ বলেন, এটি প্রচলিত কোনো মাদক নয়। ড্যান্ডি বা আঠাজাতীয় দ্রব্যগুলো নিষিদ্ধ ও মাদক আইনে না পড়ায় এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম মহানগর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মহসিন বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় আমরা ব্যবস্থা নিতে পারছি না।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতলের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) ডা. একরামুল হক বলেন, নাকে-মুখে ঘনঘন এটির শ্বাস নিলে মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে। পাশাপাশি আসক্তি তৈরি হয়। তবে আঠার গ্যাস ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে। নাকের ভেতরে ঘা হয়ে যায়। এতে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ মাদকে মানসিক এবং শারীরিক উভয় ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। যেহেতু শিশুরা এটা গ্রহণ করে, ফলে এর প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ হবে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মাদকে আসক্ত। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পট রয়েছে। এসব জায়গায় ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রমণ রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের আর্থিক সহায়তায় ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত একটি সমীক্ষা চালানো হয়। দেশের সাতটি বিভাগে সাত বছরের ওপরে ১৯ হাজার ৬৬২ জনের ওপর মাদক ব্যবহারের প্রকোপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের ওপর সমীক্ষাটি পরিচালিত হয়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. ফারুক আলমের নেতৃত্বে মোট পাঁচজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বছরব্যাপী পরিচালিত এ সমীক্ষার তত্ত্বাবধান করেন।

মাদক সেবনকারীদের ওপর ওই সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৮ বছরের ওপরে বিভিন্ন মানসিক রোগের প্রকোপ থাকে। এর মধ্যে মারাত্মক অবসাদে আক্রান্ত হয় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, রোগ নিয়ে চিন্তায় থাকে ২ দশমিক ৩ শতাংশ, সব সময় চিন্তাগ্রস্ত থাকে ২ শতাংশ, সিজোফ্রেনিয়ায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ আক্রান্ত থাকে। মাদক সেবনের কারণে শিশু-কিশোরদের মধ্যে হঠাৎ করে উত্তেজিত হওয়া, রাতের বেলা বিছানায় প্রস্রাব করার মতো বিভিন্ন মানসিক রোগের প্রকোপ থাকে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে করা এই গবেষণায় পথশিশুদের বিষয়টি কম এসেছে।

আমরা সবচেয়ে বেশি গাঁজা সেবনকারী পেয়েছি, এরপর অ্যালকোহল, তারপর পেয়েছি ইয়াবা সেবনকারী। কেবল যদি পথশিশুদের মধ্যে জরিপটি করতাম, তাহলে উল্লেখযোগ্যভাবে এই ড্যান্ডি ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে তথ্য পেতাম।’

তিনি আরো বলেন, ‘শিশুরা নাক দিয়ে এই অ্যাডহেসিভ-এর ঘ্রাণ নিয়ে নেশা করে। কারণ, এর ভেতরে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ থাকে। এটা মস্তিষ্কে গিয়ে এক ধরনের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। ফলে তাদের ভেতরে এক ধরনের সুখের অনুভূতি তৈরি হয়।

এই অনুভূতি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। এই অ্যাডহেসিভের ঘ্রাণ শরীরের যেসব জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়, সেসব জায়গার কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়। আর কোষ নষ্ট হওয়ার কারণে মস্তিষ্কের কাজে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।

এ ছাড়াও নাকের ভেতরে ঘা হয়ে যায়। এ ধরনের মাদকে শারীরিক এবং মানসিক উভয় ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়। শিশুরা যেহেতু এটা গ্রহণ করে, ফলে এর প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ।’

অ্যাডহেসিভে টলুইন জাতীয় তরল পদার্থ থাকে। টলুইন মাদকের তালিকায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কিংবা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই সমস্যা রাতারাতি বন্ধ হবে না। এর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গনাইজেশনের (লিডো) নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেন বলেন, নেশাগ্রস্ত পথশিশুদের একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ফজলুর রহমান বলেন, ‘জুতার আঠা নিষিদ্ধ কোনো বস্তু নয়। এ কারণে এ বিষয়ে কিছু করতেও পারছি না। এটি একটি নতুন নেশা। অনেক পথশিশু এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। সচেতনতাই পারে তাদের ফিরিয়ে আনতে।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই