বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ৬ ফাল্গুন ১৪২৬

ঢাকা সিটির নির্বাচনি প্রচারে বেকায়দায় আ.লীগ

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২০, বুধবার ০২:৩৯ পিএম

ঢাকা সিটির নির্বাচনি প্রচারে বেকায়দায় আ.লীগ

ঢাকা : ঢাকার জোড়া সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটের মাঠে প্রচারের নির্ধারিত কৌশল বাস্তবায়নে শুরুতেই ‘হোঁচট’ খেল আওয়ামী লীগ।

নির্বাচনি প্রচারে যেসব কর্মসূচি ও কৌশল আগেভাগেই চূড়ান্ত করে রেখেছিল দলটি, আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পাঁচদিনেও সেসবের পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি।

সব ভোটারের ঘরে ও বাসায় উপস্থিত হয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচনি প্রচারের কৌশলে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনের আচরণবিধি।

ওই বিধি অনুযায়ী মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেকটা ‘বেকায়দায়’ পড়েছে ক্ষমতাসীন দল।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী, সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ নির্ধারিত আরো কয়েক পদে দায়িত্বরতরা নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না।

বর্তমান কমিশনের সময়ই ২০১৮ সালের চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ওই বিধি পাল্টানোর দাবি তোলে। এর আগে কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনের সময় বিধিটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলেও তা শেষ পর্যন্ত হয়নি।

ইসি তা না করায় এবারো ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারে আওয়ামী লীগকে ‘হোঁচট’ খেতে হলো। এমনকি এ নিয়ে ইসির অনেকটা বিপরীতমুখী অবস্থানে দলটিকে একপর্যায়ে চলে যেতে হয় বলে মনে করেন ক্ষমতাসীনরা। আচরণবিধি পরিবর্তনের দাবিতে এবারো আওয়ামী লীগ ইসির সঙ্গে বৈঠকে বসে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ১৪ দলের জোটও ওই আচরণবিধি বাতিলের দাবি জানায় নতুন করে।

সূত্র বলছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হলে বিএনপিসহ অন্যরা নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলবে বলে মনে করেন ক্ষমতাসীনরা।

তাই আওয়ামী লীগের নির্ধারিত কৌশল ছিল, ভোটের আগেই জনমনে এমন একটা ধারণার জন্ম দেওয়া, তারা শুরু থেকেই বেশ গোছালো হয়ে ও পরিকল্পনা নিয়ে দুই সিটির নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর দিন থেকেই আওয়ামী লীগ নিজ প্রার্থীদের বিষয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালায়। নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের সন্দেহ দূর করতে প্রচারে কোনো ঘাটতি না রাখার পরিকল্পনা নিয়েই মাঠে নামার পরিকল্পনা ছিল দলটির।

ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির নির্বাচনে কোনোভাবেই হারা যাবে না— এমন পরিকল্পনা সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে মাঠে নামতে নির্দেশ আছে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

সব ভোটারের ঘরে ঘরে নেতাদের যেতে ইতোমধ্যে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দলের দুই জ্যেষ্ঠ নেতাকে ঢাকার দুই অংশের নির্বাচন সামলানোর দায়িত্বও দেন তিনি। তার নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচনের মাঠে নেতাকর্মীদের নামানোর প্রস্তুতি নেয় দলটি।

বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর তুলনায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের প্রচার যাতে বেশি হয়, মাঠে নামার আগে তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয় আগে থেকেই। নির্বাচনি আচরণবিধি বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কারণে এখন তা পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে সংসদ সদস্য না হওয়ায় ভোটের মাঠে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রায় সব নেতা তাদের দলের প্রার্থীদের প্রচারে অংশ নিতে পারছেন। ইসির আচরণবিধির কারণে বিএনপি ‘বেশি সুবিধা’ পাচ্ছে বলেও আওয়ামী লীগের অভিযোগ।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনি প্রচারে সরকারি দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ নেতা ও নির্বাচনের সমন্বয়করা সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ায় প্রচারে অংশ নিতে পারছেন না।

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতা, দলের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড শাখার নেতাদের নিয়েই দলের মনোনীত মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদের প্রচার চালাতে হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকার বিভিন্ন সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা প্রচারে অংশ নিলে ভোটারদের মধ্যে বেশি সাড়া পড়ত বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার নির্বাচনি আইনের আচরণবিধি পরিবর্তনের দাবি জানালেও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, আইনের ওই ধারা এখন পরিবর্তনের সময় নেই।

এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই প্রণীত ওই আইনে এখন পরিবর্তন এলে সরকারকে বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনি প্রচারের কৌশলে নানা পরিবর্তনের পরিকল্পনা করে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন দুই সিটির নির্বাচন সমন্বয়ে দলের অনানুষ্ঠানিক সমন্বয়ক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু ডিএসসিসির আর উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য তোফায়েল আহমেদ ডিএনসিসির জন্য গঠিত সমন্বয় কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

কমিটির সদস্যরা প্রায় প্রতিদিনই দুই সিটির নির্বাচন সংক্রান্ত নানা কৌশল নিয়ে বৈঠক করছেন। ভোট চাওয়া ও প্রচার চালানো ছাড়া সংসদ সদস্যরা সবই করতে পারেন বলে তোফায়েল আহমেদ জানান।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মতে, সংসদ সদস্যদের ভোট চাওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকলেও দলের অবস্থান তুলে ধরা, দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি কৌশল প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে বাধা নেই। অতীতেও সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে এমনটা করেছেন। এবার অনেকটা আড়ালে থেকেই তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

নির্বাচন হচ্ছে দলীয় ভিত্তিতে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নানা ব্যবস্থাপনা থাকে। এজন্য চাইলে যে কেউ যে কোনো যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন।

আমির হোসেন আমু এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যরা সিটি নির্বাচনে প্রচার চালাতে পারবেন না, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

সাবেক সংসদ সদস্যরা প্রচার চালাতে পারলে বর্তমান সংসদ সদস্যরা পারবেন না, এটা কোনো কথা হলো না। এ বিধান নাগরিক অধিকার খর্ব করার জন্য করা হয়েছে।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই