বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬

ভাঙনের সুর বাজছে জাপায়

তরি চলছে হেলেদুলে

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০১৯, বুধবার ০২:৫৯ পিএম

তরি চলছে হেলেদুলে

ঢাকা : সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট স্বামীর বদৌলতে ছিলেন দেশের ফার্স্টলেডি। চষে বেড়াতেন দেশ-দেশান্তর। সংসদে ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতার আসনেও। এশীয় সংগীত পছন্দকারী হিসেবে কমবেশি বিচরণ ছিল সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে হজ করেছেন একাধিকবার। নারী-শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় রেখেছিলেন প্রশংসনীয় ভূমিকা। স্বামীর প্রতিষ্ঠিত দল জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন। তিনি বেগম রওশন এরশাদ এমপি।

৭৮ বছর বয়সের বর্ণাঢ্য জীবনের এই নারী রাজনীতিকের গণ্ডি এখন ছোট হয়ে আসছে। নিজ দলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আর নেতৃত্বের লড়াইয়ে তিনি চলে যাচ্ছেন লো-প্রোফাইলে। শীর্ষ ও সিনিয়র নেতা হলেও হারাচ্ছেন বিভিন্ন চেয়ার। রাজনীতিবিদ হলেও বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মী থেকেও।

এরশাদের প্রতিষ্ঠিত পার্টি একে একে পাঁচ দফায় ভেঙেছে। আবারো ভাঙনের সুর বাজছে। এই সুরের বাঁশি রওশনের হাতেই বলে ঘরে-বাইরে দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ। ইতোমধ্যে দলটির সিনিয়র নেতারা দ্বিধাবিভক্তিতে জড়িয়ে পড়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা এমপি বলেন,  কারো  (রওশন) শারীরিক অসুস্থতা থাকলে তো দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না। দল তো তার কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। কিছু তো ঠেকে থাকেনি।

পার্লামেন্টারি বোর্ডে রওশন এরশাদ নেই কেন- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের বোর্ডের মিটিং হয় দোতলায়। তিনি দোতলায় উঠতে পারবেন না বলেই তাকে রাখা হয়নি।

অতীতে থাকলেও গত এক বছর ধরে জাতীয় পার্টিতে নানামুখী নাটকীয়তা চলছিল। এরশাদের জীবদ্দশায় পদ-পদবি নিয়ে ঘণ্টার ব্যবধানে চিঠি চালাচালির মতো ঘটনা দেশীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন। গত ১৪ জুলাই মারা গেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

কিন্তু দলটির তরি চলছে হেলেদুলে। কাড়াকাড়ি চলছে বৈঠা নিয়ে। প্রতিদ্বন্দ্বী দেবর গোলাম মোহাম্মদ কাদের আর ভাবি রওশন এরশাদ। দিন যত যাচ্ছে প্রকাশ্যে আসছে দেবর-ভাবির লড়াই। এখন পর্যন্ত লড়াইয়ে যোজন দূরে রওশন।

দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, এরশাদের মৃত্যুর পর দলটি যে অবস্থায় আছে তাতে মাস কয়েকের মধ্যে খণ্ডিত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে রওশন এরশাদকে ওয়ান সাইড করে ফেলেছেন দেবর জি এম কাদের। ভঙ্গ করেছেন দলীয় নীতি।

গত ২০ আগস্ট মঙ্গলবার রওশন এরশাদের গুলশানের বাসভবনে যান জি এম কাদের। সেখানে পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলের নেতা নিয়ে নিজেদের মাঝে সমঝোতা হয়।

কিন্তু এরপরই হঠাৎ করেই জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে রংপুর-৩ আসনে দলীয় প্রার্থী নির্বাচনের জন্য জাপার মনোনয়ন বোর্ড গঠন করেন জি এম কাদের। তাতে কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদকে মাইনাস করা হয়েছে।

এদিকে রওশন এরশাদ নিজেই ঠাঁই নিয়েছেন ঘরের কোনায়। এরশাদের মৃত্যুর পর তার স্মরণে গত ৪০ দিনে কোনো সভায় অংশ নেননি তিনি। রওশন সমর্থকরা তার পথ অনুসরণ করেছেন।

সম্প্রতি দলের প্রেসিডিয়াম মেম্বারদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে তাতে যোগ দেননি দলের প্রেসিডিয়াম মেম্বার রওশন এরশাদ। দলের কো-চেয়ারম্যান হলেও তিনি দলীয় কার্যালয়ে যান না। অন্যদিকে তার গুলশানের বাসাতেও নেতাকর্মীদের প্রবেশাধিকার নেই।

‘৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’- জাতীয় পার্টির এই স্লোগান থাকলেও গত ১ যুগের মধ্যে তার নিজ নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহ ছাড়া দেশের কোথাও সফর করেননি রওশন এরশাদ।

জাতীয় পার্টি ও এরশাদ পরিবারের দাবি, উত্তরবঙ্গ এরশাদের ঘাঁটি। কিন্তু এরশাদের অনুপস্থিতিতে রওশন এরশাদ তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি যে, উত্তরবঙ্গবাসী এরশাদের শূন্যস্থানে রওশনকে মেনে নেবেন। যোগাযোগ না রাখায় উল্টো রওশনবিমুখ হচ্ছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

এরশাদ মৃত্যুর আগে সর্বশেষ ৩ মার্চ রংপুরে যান। পরদিন রংপুর গ্র্যান্ড প্যালেস হোটেলে জেলা ও মহানগরীর নেতাদের যৌথ সভায় আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘এরিক আমার একমাত্র সন্তান। রংপুরের সবাই আমার সন্তান সমতুল্য। আমার মৃত্যুর পর পল্লীনিবাসে আমাকে শায়িত করবে। তোমরা আমার এরিককে দেখে রাখবে।’

এরশাদের এই বক্তব্যের পরই এরশাদ-রওশন দম্পতির ছেলে রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। ফলে রংপুরে রওশনপুত্র দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশায় হতাশার ছায়া পড়েছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই