শনিবার, ০৬ জুন, ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

তাপমাত্রা বাড়ায় কি করোনার প্রভাব কম

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২০, রবিবার ১১:৫৩ পিএম

তাপমাত্রা বাড়ায় কি করোনার প্রভাব কম

ঢাকা : পুরো বিশ্বকে আতঙ্কিত করা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বেঁধে দেওয়া করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) রোধে পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেমন থেমে নেই, তেমনই রোগটি নিয়ে অপ্রমাণিত তথ্যকে কেন্দ্র করে বিতর্কও জোরালো হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের এক পক্ষের কোনো ব্যাখ্যা অন্য পক্ষ নাকচ করে দিচ্ছে।

নতুন এই ভাইরাসের বিষয়ে যুক্তি-পাল্টাযুক্তিসহ নানা গবেষণার মধ্য দিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রমাণিত কোনো সিদ্ধান্তে একপর্যায়ে উপনীত হবেন, এটা স্বাভাবিক সত্য হলেও ‘গণ্ডগোল’ বাঁধছে অন্য কারণে।

দায়িত্বশীল কোনো কোনো বৈশ্বিক সংস্থার যেকোনো গবেষণার একাংশের পক্ষে বিবৃতি ও প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের সেই সঙ্গে কণ্ঠ মেলানোর কারণে করোনার বিষয়ে অপ্রমাণিত ‘তথ্য’ও ছড়িয়ে পড়ছে দেশে দেশে।

গরম ও উষ্ণ আবহাওয়ার দেশে করোনা থাকবে কি না, সেটাও তেমনই একটা বিতর্ক। এ দেশে ভাইরাসটির বিস্তার, গতিপ্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে তেমন গবেষণা না থাকলেও বৈশ্বিক প্রতিবেদনের পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক ও বিতর্ক চলছে।

দেশে তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় রোগটিতে নতুন করে কেউ আক্রান্ত হয়নি, গত সপ্তাহ থেকে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কম কি না, এমন প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

অনুসন্ধান বলছে, মূলত একাধিক কারণে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে গুজব ছড়িয়ে পড়ছে যে, গরমে দেশে করোনা ভাইরাস টিকতে পারবে না। বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না পেলেও ‘যৌক্তিক’ কিছু কারণে এমন গুজব ছড়াচ্ছে বলে কারো কারো ধারণা। দক্ষিণ এশিয়ার উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোতে ভাইরাসটি ছড়ালেও এর প্রকোপ শীতপ্রধান দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।

শীতপ্রধান দেশগুলোতে প্রতিদিন যেখানে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা খুব বেশি বাড়ছে, সেখানে উষ্ণ ঋতুর দেশগুলোতে দুটিই তুলনায় বেশ কম। বাংলাদেশ উষ্ণমণ্ডলীয় দেশ হওয়ায় করোনার প্রকোপ এখানে অনেক কম হতে পারে বলে তাদের ধারণা।

তাছাড়া ২০০৩ সালে কয়েকটি দেশে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া সার্স ভাইরাসের সঙ্গে করোনার সম্পর্ক আছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ওই সময় সার্স ঠান্ডা আহাওয়ায় বেশি ছড়ায়। সার্সের মতো করোনারও উষ্ণ পরিবেশে একই দশা হতে পারে বলেও কেউ কেউ ‘আশাবাদী’।

দেশে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় ভাইরাসটির ‘ঝুঁকি কমছে’ বলে ফেসবুক, টুইটার ও ক্ষুদে বার্তার ব্লগে ছড়ানো হচ্ছে। অনেকে তাতে বিভ্রান্তও হচ্ছেন। সংক্রমণ রোধে তারা অসতর্ক ও অমনোযোগী বলেও অভিযোগ উঠেছে। আবার অনেকের প্রশ্ন, আসলেই কি উষ্ণ আবহাওয়ায় করোনা ছড়াতে পারে না? দেশের আবহাওয়া ও তাপমাত্রা কি সত্যিই করোনার বিস্তার ঠেকাবে? প্রমাণিত না হলেও গরমে করোনা কমে আসবে, এমন ‘তথ্যে’ অনেকে আস্থা রাখতে আগ্রহী। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, উষ্ণ তাপমাত্রায় করোনার সংক্রমণের ঝুঁকি না থাকার তথ্যটির বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই।

যোগাযোগ করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, শুধু ঋতু পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে করোনার মতো নতুন ভাইরাসকে নিয়ে কোনো উপসংহারে পৌঁছানো যাবে না। এ রকম সুযোগ এখনো সৃষ্টি হয়নি। উষ্ণ আবহাওয়ায় ভাইরাসটির গতিপ্রকৃতি কেমন হতে পারে, এটা বলার ঠিক সময় এখনো আসেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সব ধরনের সংক্রামক রোগের গতিপ্রকৃতি পাল্টায়, গবেষণা ও তথ্য এমনই বলছে। গত বছরের শেষ দিকে শীতে চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে শুরু হওয়া করোনা গরমে কমে যাবে কি না, দেশের আবহাওয়া বদলের সঙ্গে রোগটির বিস্তারের প্রভাব আদৌ পড়ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখছেন কেউ কেউ।

তারা বলছেন, করোনা পুরোপুরি নতুন ভাইরাস। মূলত এর গতিপ্রকৃতি এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি কেউই। এখন পর্যন্ত ভাইরাসটি ভয়াল আকারে ছড়িয়েছে শীতপ্রধান অঞ্চল ও ঠান্ডা পরিবেশে। গরমে ভাইরাসটি থাকবে কি না, সেদিকেও তারা দৃষ্টি রাখছেন আগ্রহের সঙ্গে। যদিও উষ্ণ এলাকায়ও করোনা ছড়ানোর রেকর্ড আছে আর দিনে দিনে ছড়িয়েও পড়ছে।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) ভাইরোলজি গবেষণাগারের প্রধান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তাপমাত্রা করোনার বিস্তারে এখন পর্যন্ত কোনো বিষয় নয়। কিছু কিছু প্রবণতায় মনে হচ্ছে ও বলা যাচ্ছে, যেসব অঞ্চলে ঠান্ডার প্রকোপ বেশি, সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি ছড়িয়েছে ভাইরাসটি। আমাদের দেশে তাপমাত্রা কোনো ভূমিকা রাখছে কি না, বা রাখবে কি না, তা বলা এখন পর্যন্ত একেবারে অসম্ভব।’

‘রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের’ (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর জানান, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, করোনা ভাইরাস মারা যায় বা টিকতে পারে না ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। এমনকি ৬৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও এর শতভাগ মৃত্যু নিশ্চিত হয় না বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন। গরম আবহাওয়ায় ভাইরাসটির সংক্রমণ দেশে থেমে যাবে বলে যেসব আলোচনা ও তর্ক চলছে, সেগুলো ঠিক নয়।

জানা গেছে, ‘গরমে করোনা ছড়াতে পারে না’, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো এমন অপ্রমাণিত ‘তথ্য’ দেশে ছড়ালেও এর উৎস বিদেশে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ‘চলতি বছরের এপ্রিলের মধ্যে করোনার সমস্যা নিজেই সমাধান হয়ে যাবে। তাত্ত্বিকভাবে সত্য হচ্ছে, যখন গরম পড়ে, তখন অলৌকিকভাবে এটা চলে যায়।’ তার ওই দাবির কোনো সত্যতা মেলেনি। তবে তার বক্তব্য দুনিয়াজুড়ে ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও ইউটিউবে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী করোনা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও অসত্য ‘তথ্য’ দেন। তিনি দাবি করেন, ‘৩২ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় করোনা আপনাআপনি ধ্বংস হয়ে যায়। আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে দেশের তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হবে। তাই এ নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই।’ প্রতিমন্ত্রীর ওই দাবির পর দেশে এ নিয়ে বিভ্রান্তি আরো বাড়ে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকরা।

অবশ্য কয়েক দিন আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) বিশেষজ্ঞরাও বলেন, ‘অতি গরমে করোনার বিস্তার অনেকটাই কমে যাবে বা ভাইরাসটি মরে যাবে।’ এর পরপরই নতুন একটি বৈশ্বিক সমীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে ও গরমের কারণে ভাইরাসটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, এমন ভাবনার ফাঁদে পা দেওয়া আত্মঘাতী হতে পারে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র’ (সিডিসি) সংস্থাটির ওয়েবসাইটে জানায়, ‘আবহাওয়া ও তাপমাত্রা করোনার বিস্তারকে প্রভাবিত করে কি না, তা এখনো প্রমাণ হয়নি। সাধারণ সর্দি ও ফ্লু জাতীয় কিছু ভাইরাস শীতের সময় বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এর মানে এই নয়,  উষ্ণ আবহাওয়ার মাসে কেউ করোনায় আক্রান্ত হবেন না। আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে উঠলে কোভিড-১৯-এর বিস্তার কমে আসবে কি না, তা এখনো বলা যাচ্ছে না।’

একইভাবে বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দাবিও ভুল বলে জানায় সরকারি প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর।

সম্প্রতি ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের’ এক নিবন্ধে বলা হয়, ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সর্দিজনিত করোনার জন্য দায়ী ভাইরাসগুলোর প্রকোপ গরমের সময়ে কমে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। কারণ, আবহাওয়ার সঙ্গে এ ধরনের ভাইরাসের সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকে বলেন, সিজনালিটি। তবে নতুন ভাইরাস করোনাও যে একই আচরণ করবে, তা নিশ্চিত নয়।’

স্টকহোমের ‘ক্যারোরিনসকা ইনস্টিটিউটের’ ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেন আলবার্ট আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আশা করছি, করোনা শেষ পর্যন্ত স্থানীয় একটি মহামারী হিসেবে চিহ্নিত হবে। আর এটার যদি ঋতুর সঙ্গে পরিবর্তন না হয়, তবে তা হবে বিস্ময়কর। আমরা নিশ্চিত করে এখনো জানি না, তবে এটা সম্ভব।’

ফ্রান্সের ‘ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল রিসার্চের’ পরিচালক ভিক্টোরিয়া কোলিৎজার জানান, ভিন্ন মৌসুমে ভিন্ন আচরণ করবে কোভিড-১৯, তা বলার মতো এখনো সময় আসেনি। তবে ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি মৌসুমের পরিবর্তনে পরিবর্তন হতেই পারে।

‘হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের’ গবেষক দলের দাবি, করোনা উষ্ণ অঞ্চলে ছড়াবে না বলে যে আশা করা হচ্ছে, তা আসলে ক্ষীণ। যেখান থেকে ভাইরাসটি প্রথম ছড়িয়েছে, চীনের সেই হুবেই প্রদেশের উহানের আবহাওয়া ঠান্ডা, তাতে সন্দেহ নেই।

উহান থেকে এটি জিলিন ও হেলংজিংয়ে গেছে, সেখানেও ঠান্ডা ছিল। গুয়াংজি বা সিঙ্গাপুরের মতো উষ্ণ এলাকাতেও করোনা ছড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের’ এক গবেষণা বলছে, করোনা সেসব অঞ্চলেই বেশি ছড়িয়েছে, যেসব অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা ৫ থেকে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেসব এলাকায় আর্দ্রতাও কম।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue