মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

প্যারোল-শপথ নিয়ে আলোচনা

তারেকের পথে খালেদা

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০১৯, শুক্রবার ০৬:৫৯ পিএম

তারেকের পথে খালেদা

ঢাকা : খালেদা জিয়া কি ছেলে তারেক রহমানের পথে হাঁটছেন? তিনি কি পছন্দসই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য প্যারোলের আবেদন করছেন? আর মুক্তি মিললে দেশেই নাকি বিদেশে চিকিৎসা নেবেন? এ জাতীয় একগুচ্ছ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপিতে।

দলের সমর্থক রাজনৈতিক বোদ্ধা ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় প্রধানের প্যারোলে মুক্তি এবং একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ৬ সদস্য শপথের বিষয়ে অনড় অবস্থান পরিবর্তনের আলোচনা শুরু করছে বিএনপি। ‘আপসহীন খালেদা জিয়া জামিনে বা আন্দোলনের মাধ্যমেই মুক্ত হবেন এবং একাদশ নির্বাচনে নির্বাচিতরা শপথ নেবেন না’ দলের এই ছিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এর কম-বেশি বলতেই সাহস করেননি নেতারা। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই দুটি বিষয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে।

২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তারেক রহমান প্যারোলে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। এখন পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। এদিকে খালেদা জিয়ার মতো তারও সাজা হয়েছে। মায়ের লাশ দেখতে ১/১১-তেও খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিলেন।

স্থায়ী কমিটির একাধিক নেতা আলাপকালে জানান, বন্দিদশার শুরু থেকেই খালেদা জিয়া সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে বা সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়ে প্যারোল নিতে চাননি। এজন্য বিষয়টি নিয়ে নেতারা কথাও বলেননি। কিন্তু এখন দলের স্বার্থে দলীয় প্রধানের শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করে প্যারোল নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিএনপির একাধিক নেতা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করছেন।

খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরাও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এমন আলোচনাও আছে। বর্তমানে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বিএনপিতে উদ্বেগ বেড়েছে। আর প্যারোলে হলেও মুক্তির পক্ষে- এমন নীতিনির্ধারকের সংখ্যা বাড়ছে বিএনপিতে।  

খালেদা জিয়ার আইনজীবী আমান ফেরদৌস বলেন, আইন অনুযায়ী প্যারোলের দুই রকম আবেদন করা যায়।

প্রথমত, সরকারের কাছে প্যারোলের আবেদন করা যায়। সরকার যদি বিবেচনা করে যে, বিশেষ বিবেচনায় তাকে প্যারোল দেওয়া দরকার, সে ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্যারোল আবেদন মঞ্জুর করতে পারে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কাজ শেষে তিনি আবার জেলে ফেরত আসবেন। সাধারণত কোনো নিকটাত্মীয় মারা গেলে বা গুরুতর কোনো অসুস্থতার কারণে প্যারোল  দেওয়ার বিধান রয়েছে। সরকার বিভিন্ন সময়ে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত কয়েদিদের এ ধরনের প্যারোল দিয়ে থাকে।

দ্বিতীয়ত, আদালত প্যারোল দিয়ে থাকেন। আদালত যদি মনে করেন যে কোনো বিশেষ ব্যবস্থায় একজন দণ্ডিত বা অভিযুক্তকে সাময়িক সময়ের জন্য প্যারোল দিতে হবে, তাহলে সর্বোচ্চ আদালত এটা বিবেচনা করতে পারেন। এ ধরনের প্যারোল দেওয়ারও একাধিক নজির রয়েছে। খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে আলোচনা আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবেদন করা হবে কি-না সেই সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।  

সূত্র মতে, খালেদা জিয়া তিন মাসের প্যারোলের জন্য আবেদন করতে পারেন। আইনজীবীরা মনে করছেন, তিন মাসের সময়সীমা শেষ হলেও খালেদা জিয়ার চিকিৎসা যদি সমাপ্ত না হয় এবং চিকিৎসকরা যদি মেডিকেল রিপোর্ট সেভাবে দেন তাহলে আদালতের বিবেচনায় প্যারোলের মেয়াদ বাড়তে পারে।

দলীয় একাধিক নেতা জানান, সমঝোতার মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় চেয়ারপারসনের মুক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার ‍অসুস্থতাকে সামনে রেখে সরকার এবং বিএনপির ভেতরে এক ধরনের ছাড় দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ কারণে কোনো কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও সক্রিয় নেই বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। একইভাবে রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবেই কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার নিয়ে যাওয়া হয়েছে খালেদা জিয়াকে। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উন্নত চিকিৎসার। সব মিলিয়ে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তির একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

দলটির একটি সূত্রের দাবি, খালেদা জিয়ার আপত্তির কারণে এতদিন বিএনপিতে প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে আলোচনা না হলেও এখন হচ্ছে। গত সোমবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আলোচনার বড় একটি অংশ ছিল খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও মুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে বিএনপির ভাবনা প্রসঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এ মুহূর্তে চেয়ারপারসনের উন্নত চিকিৎসার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। এজন্য যা যা করা প্রয়োজন দল তা করবে। প্যারোলে মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা চেয়ারপারসনের একান্ত নিজস্ব ব্যাপার।

এদিকে গত দুই দিন ধরে রাজনৈতিক মহলের অন্যতম আলোচনার বিষয় হচ্ছে, বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি মিললে শপথ নিতে পারেন বিএনপির ছয় সংসদ সদস্য। এ রকমই একটি সমঝোতার পথে হাঁটছে সরকার ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। সংসদ নির্বাচনের পরে মাত্র ছয় সদস্যের শপথের বিষয়ে দলের কেউ কথা বলতেই সাহস করেননি। কিন্তু এখন এই আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সংসদে যোগদান প্রশ্নে বিএনপির ভেতরে আলোচনা উঠেছে। দলীয় রাজনীতি গতিশীল করতে হলে সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত বলে মনে করছেন কেউ কেউ। একই পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকরাও। তবে দলের স্থায়ী কমিটির বেশিরভাগ সদস্য সংসদে যাওয়ার বিপক্ষে।

এছাড়া ২০-দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের নেতারাও শপথের বিপক্ষে। এত বিরোধিতার পরও সংসদে যাওয়ার আলোচনা শুরু হওয়ায় বিষয়টি রহস্যজনক বলে মনে করছেন অনেকে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট ৮টি আসনে জয় পায়। এরপর নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ঐক্যফ্রন্ট। দলীয় ও জোটগত সিদ্ধান্ত অমান্য করে গত ৭ মার্চ সুলতান মোহাম্মদ মনসুর এবং গত ২ এপ্রিল আরেক সংসদ সদস্য মো. মোকাব্বির খান শপথ নেন। এরপরই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়, শপথ নিতে পারেন বিএনপির সদস্যরাও।

সোনালীনিউজ/এমটিআই