শনিবার, ০৬ জুন, ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

তৃণমূলে বিস্তার হলে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২০, শুক্রবার ১০:৫২ পিএম

তৃণমূলে বিস্তার হলে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে

ঢাকা : করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) কোনো কারণে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি কী হতে পারে, কত মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন, চিকিৎসা ব্যবস্থার অবকাঠামোগত বাস্তবতায় তখন কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে- এসব বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের কাছে বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণাগত কোনো প্রতিবেদন নেই।

ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে শোচনীয়তম জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় আগাম পদক্ষেপ হিসেবে বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য হিসাব পেতে নানা ধারণার ভিত্তিতে এগিয়ে যাচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য ও মানুষের জীবন রক্ষায় বর্তমান পরিস্থিতিতে তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকের এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই।

জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করেন, একটা সময় পর্যন্ত নির্দিষ্ট করা গেলেও এখন সারা দেশে, বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ে করোনার বাহক ‘অনির্দিষ্ট হয়ে গেছে’ বলে আশঙ্কার কিছু কারণ বিদ্যমান। গত ২৬ মার্চ থেকে সরকার ঘোষিত ছুটি শুরুর আগেই ‘সামাজিক দূরত্ব’ (সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং) অনুসরণ না করে অসংখ্য মানুষের ঢাকা থেকে গ্রামে যাওয়া, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ ফেরত সবাই অন্তত ১৪ দিন ‘সঙ্গনিরোধ’ (কোয়ারেন্টিন) অবস্থায় না থাকা ও তাদের সংস্পর্শে আসা লোকদেরও ‘সঙ্গনিরোধ’ পালন না করার কারণে ভাইরাসটির এমন ‘ঝুঁকির শঙ্কা’ সৃষ্টি হয়েছে।

ফলে প্রবাসফেরত ও তাদের সংস্পর্শে আসা লোকদের মধ্যে ভাইরাসটির বাহন এখনো আটকে আছে কি না তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। সরকারের ‘রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ (আইইডিসিআর) গত ২৪ মার্চ প্রথমবারের মতো জানায়, ‘ঢাকায় সীমিত আকারে’ করোনার কম্যুনিটি সংক্রমণ হচ্ছে বলে তাদের সন্দেহ। যদিও কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ আগে থেকেই বলছেন, দেশে ভাইরাসটির কম্যুনিটিতে সংক্রমণ হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো পর্যন্ত দেশে করোনা এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রণে’ থাকলেও গ্রামপর্যায়ে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, তা আঁচ পর্যন্ত করা যায় না। এমনকি বর্তমানেও যে অবস্থায় আছে ভাইরাসটির বিস্তার, এর শেষ কোথায়, তাও বলা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহও মনে করেন, ‘দেশে এখন রোগী কম আছে বলে আত্মপ্রসাদের সুযোগ নেই। একবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’

অন্যদিকে গত কয়েকদিন ধরে কোভিড-১৯-এর উপসর্গ জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে অন্তত অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যাদের বেশিরভাগেরই বাস গ্রাম ও মফস্বল শহর পর্যায়ে। যদিও তাদের করোনা আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু কোনো কোনো মৃত্যুর পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বজনদের সঙ্গনিরোধ এবং মৃতের বাড়ি ও আবাসস্থল ‘লকডাউন’ করে রাখার ঘটনার মধ্য দিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। ভাইরাসটির অবস্থান এখন ‘অনির্দিষ্ট বাহকে’ হয়ে উঠছে কি না, জনমনে এ প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে।

করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার পর আইইডিসিআর যেভাবে পরীক্ষার জন্য মরদেহের নমুনা সংগ্রহ করে, তা নিয়েও কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, রোগটিতে মৃত্যু হওয়ার পর লাশের মধ্যে দীর্ঘসময় জীবাণু জীবিত থাকতে পারে না। ঠিক কতক্ষণ ভাইরাসটি লাশের মধ্যে টিকে থাকতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও দেশি ও বিদেশি অনেক গবেষকের ধারণা, কোনো মরদেহে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি জীবাণু সক্রিয় থাকতে পারে না। এ সময়ের মধ্যে মৃতদেহ থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা যুক্তিযুক্ত।

রোগটির উপসর্গ নিয়ে ইতোমধ্যে যারা মারা গেছেন, তাদের মৃত্যুর ঠিক দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে সবখানে আইইডিসিআরের নমুনা সংগ্রাহক দল পৌঁছাতে পেরেছে কি না, এমন প্রশ্নও আছে। গত সপ্তাহে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত কয়েকজনের লাশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি কারো মৃত দেহে করোনার লক্ষণ পায়নি বলে জানায়। আরো কয়েকটি নমুনার পরীক্ষা চলছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মারা যাওয়া কত মরদেহের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে আর কতজনের নমুনার পরীক্ষা চলছে, তা জানা যায়নি।

‘ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলস ল্যাবরেটরি’র ভাইরোলজিস্ট ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘করোনা ভাইরাস কোনো মৃতদেহে কতক্ষণ বেঁচে থাকবে, তা অনেক সময় নির্ভর করে তাপমাত্রা ও বিভিন্ন বিষয়ের ওপর। তবে ধরে নেওয়া যায়, মৃতদেহে দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে ভাইরাসটির পূর্বাভাস থাকে। যদিও নির্দিষ্ট করে বলা যায় না, ভাইরাসটি আসলে মৃতদেহে কত ঘণ্টা থাকবে। অনেক জায়গা থেকে বলা হয়, মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করার জন্য। আমরা তা দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে করার চেষ্টা করি।’

জানা গেছে, গত ২৩ মার্চ সরকার ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করলে মানুষের ঢাকা ছাড়ায় ‘রেকর্ড’ সৃষ্টি হয়। মানুষকে ঘরে রাখার উদ্দেশ্যে ছুটি ঘোষণা করলেও ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে একটা মুখ্য অংশ গ্রামে চলে যান। যেভাবে তারা গ্রামে গেছেন, তা কোভিড-১৯ ছড়ানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হলেও মানুষ গাদাগাদি করে বিভিন্ন পরিবহনে গ্রামে ফিরেছেন। ফলে গ্রামগুলোও করোনার সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব মানুষ গ্রামে গিয়ে ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’ মানছেন কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন ও সন্দেহ রয়েছে।

‘ন্যাশনাল টেলিকম মনিটরিং সেন্টার’ (এনটিএমসি) সূত্র বলছে, ছুটি ঘোষণার পর এক কোটি ১০ লাখ মুঠোফোন ব্যবহারকারী ঢাকা ছেড়েছেন। ফোন ব্যবহারকারীর সঙ্গে তাদের শিশুসন্তান বা যাদের ফোন নেই, তাদের সংখ্যা যুক্ত করলে এ সংখ্যা অনেক বেশি হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘করোনায় কেউ আক্রান্ত কি না নিশ্চিত হতে অবশ্যই পরীক্ষার দরকার। দেশে পরীক্ষা আরো বাড়াতে হবে। ব্যাপকভাবে পরীক্ষার পর ফলাফলের ভিত্তিতে জানা যাবে রোগটি দেশে বর্তমানে ঠিক কোন পর্যায়ে আছে। তখন ভাইরাসটির প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তা না হলে এক সময় ব্যাপকহারে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। তখন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে।’

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ সায়েন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি’র জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ম্যাট বয়েস সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নগরবাসীদের মধ্যে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি করোনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। গ্রামাঞ্চলে যারা থাকেন, তাদের এ ঝুঁকি তুলনায় কম। উপচে পড়া ভিড় ও উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব শহরগুলোতে বেশি। করোনার ছড়িয়ে পড়াতে যা ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।’

সরকারের নীতিনির্ধারক সূত্র বলছে, গত ৩১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা করোনা পরিস্থিতি নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সারা দেশের মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি রোগটি মোকাবিলা ও প্রতিরোধে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন। এরপর থেকে তৃণমূলেও করোনা মোকাবিলায় প্রশাসন আরো কঠোর হয়। প্রধানমন্ত্রী গত ২৫ মার্চও জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ভাইরাসটি প্রতিরোধে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন।

মানুষ থেকে মানুষকে দূরে রাখতে ও জনসমাগম রহিত করতে ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ছুটি ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ায় সরকার। বেশ কয়েকটি জেলায় কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা আরোপ করেছে। তা কার্যকর করতে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন তৎপর আছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ২৪ মার্চ থেকে সেনাবাহিনী নামানো হয় মাঠে। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে দেশের সব স্থানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও হোম কোয়ারেন্টাইনের বিষয়টি কঠোরভাবে নিশ্চিত করে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনী।  সরকারের নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও কঠোর ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়।

গতকাল আইইডিসিআরের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের বরাত দিয়ে বলা হয়, বৃহস্পতিবারের মধ্যে দেশের সব উপজেলা থেকে করোনা পরীক্ষায় প্রায় দুটি করে নমুনা সংগ্রহ করা হবে। গতকাল থেকে ঘরে ঘরে গিয়ে নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ পেয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। দেশের সব বিভাগসহ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভাইরাসটির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue