শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬

থাইল্যান্ডেও একাধিক ভবন সেলিম প্রধানের

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০১৯, শুক্রবার ১১:৩১ এএম

থাইল্যান্ডেও একাধিক ভবন সেলিম প্রধানের

ঢাকা : দীর্ঘদিন থাইল্যান্ডে বসবাস করেছেন বাংলাদেশে অনলাইনে ক্যাসিনো ব্যবসার মূলহোতা সেলিম প্রধান। সেখানে রয়েছে তার একাধিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। এছাড়া পাতায়া শহরেও ‘প্রধান স্পা’ নামে একাধিক বিউটি সেন্টার রয়েছে তার।

বাংলাদেশ থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনীতিক ও আমলা থাইল্যান্ডে গেলে সেলিম তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা করতেন। এভাবেই দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। এরপর তিনি দেশে ক্যাসিনো ও স্পা ব্যবসা করার পথ সুগম করেন। শুধু ক্যাসিনো বা স্পা ব্যবসাই নয়, তার থাবা পড়েছে সড়ক ও জনপথের (সওজ) জমিতেও।

সওজ বিভাগের ১০ শতাংশ জমি দখলে রাখায় পাঁচ বছর ধরে আটকে আছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা উড়ালসেতুর মুখের সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ। এর ফলে উড়ালসেতুর অপর প্রান্তে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটি এক লেনে পরিণত হয়েছে এবং নিত্য যানজটের কারণ হয়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বিভিন্ন সভায় আলোচনা ও অনেক দেনদরবার করেও ওই জমি উদ্ধার করতে পারেনি সওজ।

বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকা মহানগর হাকিম মইনুল ইসলাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় আলোচিত বাংলাদেশে অনলাইন ক্যাসিনোর মূলহোতা সেলিম প্রধানসহ তার দুই সহযোগীকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তার অপর দুই সহযোগী হলেন আক্তারুজ্জামান ও রোকন।

আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা শেখ রকিবুর রহমান জানান, বুধবার তিন আসামিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম। ওই দিন আদালত সেলিম প্রধানসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) রিমান্ড বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য করেন। শুনানি শেষে আদালত সেলিম প্রধান ও তার দুই সহযোগীকে চার দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন।

শেখ রকিবুর রহমান জানান, সেলিম প্রধানের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মানি লন্ডারিং ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। মামলা দুটিতে আগামী ৩ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে সেলিম প্রধানের ব্যাংকক যাওয়ার কথা ছিল। টিজি ৩২২ নম্বর ফ্লাইট থেকে সেলিম প্রধানকে আটক করা হয়। আটকের পর সেলিম প্রধানের গুলশান ও বনানীর অফিস এবং বাসায় অভিযান চালিয়ে ২৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা, ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকার সমপরিমাণ ২৩টি দেশের মুদ্রা, ১২টি পাসপোর্ট, ১৩টি ব্যাংকের ৩২টি চেক, ৪৮ বোতল বিদেশি মদ, একটি বড় সার্ভার, চারটি ল্যাপটপ ও দুটি হরিণের চামড়া উদ্ধার করে র‌্যাব। হরিণের চামড়া উদ্ধারের ঘটনায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিরাপত্তা আইনে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মাদক ও অর্থ পাওয়ার কারণে সেলিম প্রধানের বিরুদ্ধে গত বুধবার গুলশান থানায় র‍্যাবের পক্ষ থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিং আইনে দুটি মামলা হয়েছে। সেলিম প্রধানের সব ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে তার নিজের ও প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে আর কোনো টাকা উত্তোলন করা যাবে না। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) গত মঙ্গলবার সব ব্যাংকের কাছে পাঠানো চিঠিতে এ নির্দেশনা দিয়েছে।

সওজ সূত্রে জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলার সাওঘাট এলাকায় জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারস নামে সেলিম প্রধানের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ভুলতা থেকে শুরু হয়ে উড়ালসড়কটি গিয়ে নেমেছে সাওঘাটে। সেখানে সড়কের জায়গা দখল করে সেলিম প্রধানের প্রতিষ্ঠান ১২০ ফুট লম্বা সীমানা দেয়াল তৈরি করেছে। ফলে নকশা অনুযায়ী উড়ালসেতুর ওই অংশে আর দুই লেন সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সড়ক বিভাগ জমি দখলমুক্ত করতে আবেদন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রভাবশালী বলে কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। দ্রুত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জায়গাটির দখল টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে সীমানা দেয়ালের ভেতর কবরস্থান ও নামাজঘর নির্মাণ করেছেন সেলিম প্রধান। বিভিন্ন সময় উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তখন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে সওজের কর্মকর্তাদের হুমকি-ধমকি দিয়েছেন তিনি।

সওজের নারায়ণগঞ্জ অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সওজের ১০ শতাংশ জমি সেলিম প্রধানের প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে, যার কারণে ভুলতা উড়ালসেতুর মুখের সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। দীর্ঘদিন পর এলাকার সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর নির্দেশে ওই জমি থেকে অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

র‌্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সেলিম প্রধানের জন্ম ঢাকায় ১৯৭৩ সালে। ১৯৮৮ সালে তার ভাইয়ের সঙ্গে জাপানে যান তিনি। সেখানে তারা গাড়ির ব্যবসা করতেন। পরে অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়ালে জাপান সরকার সেলিমকে সে দেশ থেকে বহিষ্কার করে। এরপর তিনি থাইল্যান্ডে চলে যান। সেখানে শুরু করেন শিপইয়ার্ডের ব্যবসা। থাইল্যান্ডেই তার পরিচয় হয় কোরিয়ান নাগরিক মিস্টার তু’র সঙ্গে। এরপর জড়িয়ে পড়েন আন্তর্জাতিক জুয়াড়িচক্রের সঙ্গে। শুরু করেন স্পা ও ক্যাসিনো ব্যবসা। বিভিন্ন ক্লাবে তার যাতায়াত শুরু হয়।

২০১৫ সালে সেলিম প্রধানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের তদন্ত শুরু হয়। সেলিম প্রধানের বিরুদ্ধে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে  হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য উঠে আসে। এরপরই মূলত কোণঠাসা হয়ে পড়েন থাই পাসপোর্টধারী সেলিম প্রধান।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এ পর্যন্ত সেলিম প্রধানের ছয়টি গাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। রয়েছে তিন জন ব্যক্তিগত গাড়িচালক। তার বাসার গ্যারেজে নিশান পেট্রোল কালো রঙের গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১১-২১৬৫) সংসদের স্টিকার লাগানো ছিল। জাতীয় সংসদের সদস্যরা নিজের গাড়ির জন্য একটি করে স্টিকার পেয়ে থাকেন, যা তাদের গাড়িতে লাগাতে পারেন। সেলিম প্রধান সংসদ সদস্য না হয়েও কীভাবে স্টিকার পেতেন, তা খুঁজে দেখছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

র‌্যাব জানায়, সেলিম প্রধান গাড়িতে চলাচলের সময় উচ্চশব্দে হুটার বাজানো হয়। ভিআইপি প্রটোকলের মতো তার গাড়িবহরের সামনে-পেছনে থাকত পাঁচ-ছয়টি দামি গাড়ি।

র্যাব সূত্র জানায়, তারেক রহমানের বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে সেলিম প্রধানের বন্ধুত্ব রয়েছে। বিএনপি আমলে জাপানিদের অর্থায়নে জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন সেলিম। ওই সময় এই প্রিন্টিং প্রেস থেকে প্রায় সব ব্যাংকের চেক বইসহ ব্যাংকিং দলিলপত্র ছাপানো হতো।

এই প্রিন্টিং ব্যবসার নামে তিনি রূপালী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে তিনি একটি গাড়িও উপহার দেন। এমনকি অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ লন্ডনে পাঠানো হতো বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক সারোয়ার বিন কাশেম। র‌্যাবের দাবি, সেলিম প্রধানের বিপুল অঙ্কের অর্থ রয়েছে থাইল্যান্ডে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা এলাকার সেলিম প্রধান আন্তর্জাতিক মহলে ধীরে ধীরে মাফিয়া হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ, জাপান ও রাশিয়ায় রয়েছে তার তিন স্ত্রী ও একাধিক সন্তান।

র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, অনলাইন ক্যাসিনোর মাধ্যমে মানি লন্ডারিং হয়েছে। এই ব্যবসার সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদেরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে সেলিম প্রধান তা স্বীকারও করেছেন। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। তদন্তে আরো বিস্তারিত জানা যাবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই