মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

থামছে না সড়ক দুর্ঘটনা

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার ০১:৩৬ পিএম

থামছে না সড়ক দুর্ঘটনা

ঢাকা : রাজধানীর কোনো না কোনো সড়কে প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে। আবার অনেকে আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। শিশু, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ কেউই বাদ যাচ্ছেন না সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে। সড়ক দুর্ঘটনার ফলে অনেক পরিবারে নেমে আসছে অমাবস্যার অন্ধকার। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পুরো পরিবারটিতেই অন্ধকার নেমে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অদক্ষ, অশিক্ষিত ও মাদকাসক্ত চালকরাই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। অবিলম্বে এমন চালকদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডোম সেকেন্দার আলী জানান, প্রতিদিন এই কলেজের হাসপাতালের মর্গে কমপক্ষে ৩-৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়।

মিটফোর্ড হাসপাতালের ডোম শ্যামল জানান, গড়ে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২-৩ জন ব্যক্তির লাশের ময়নাতদন্ত করা হয় এখানে।  

গত ৬ নভেম্বর মহাখালী ফ্লাইওভারে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নাসির উদ্দিন (২৩) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়।

নিহত নাসিরকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্র আবদুল আউয়াল আলী বলেন, বুধবার রাতে বনানী থেকে মহাখালী ফ্লাইওভারে ওঠার সময় নাসির নামে ওই যুবককে কয়েকজনে মিলে ধরে সিএনজিতে তোলার সময় আমিও সহযোগিতা করি। প্রথমে তাকে ঢামেক হাসপাতাল ও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবারের লোকজন পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত নাসির রাজধানীর নিউ পল্টন এলাকার মোখলেসুর রহমানের ছেলে।

গত ৭ নভেম্বর বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিপরীত পাশের ক্যাফেঝিল রেস্টুরেন্ট সংলগ্ন রাস্তায় বাসচাপায় রিনা বেগম (৬০) নামের এক নারী মারা গেছেন।

পথচারী আক্কাস আলী জানান, ক্যাফেঝিল রেস্টুরেন্টের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় পল্টনগামী বিকল্প পরিবহনের একটি বাস তার ওপর দিয়ে চলে যায়।

নিহতের ছেলে মোহাম্মদ রানা জানান, পুরান ঢাকার আগাসাদেক রোডের ১৪৩ নাম্বার বাসায় থাকেন তারা। তার বাবার নাম মৃত বাবুল মিয়া।

গত ১১ নভেম্বর রাজধানীর তুরাগে সিটি করপোরেশনের একটি ময়লার গাড়ির ধাক্কায় সঞ্জু মিয়া (৫৫) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই দিন সকাল ১১টার দিকে তুরাগে ১৫ নম্বর সেক্টরের কবরস্থান রোড এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় সিটি করপোরেশনের একটি ময়লার গাড়ি সঞ্জু মিয়াকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। নিহত সঞ্জুর গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায়। পরিবার নিয়ে তিনি তুরাগ চন্দাল ভোগ এলাকায় থাকতেন।

গত ১০ নভেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর বিআরটিএ অফিসের পাশের রাস্তায় ট্রাকের ধাক্কায় মনোয়ারা বেগম (৭০) নামে এক বৃদ্ধা গুরুতর আহত হন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত মনোয়ারা কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার কলাদিয়া গ্রামের মৃত গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী।

১২ নভেম্বর শান্তিনগরে বাস থেকে নামার সময় বাসের চাকার নিচে চাপা পড়ে আহত কানিজ ফাতেমা রুমা (৩৫) নামে এক নারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দুর্ঘটনার সময় ওই নারীর ঊরু থেকে হাঁটু পর্যন্ত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল।
নিহতের স্বামী শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি টিউশনি করান। আর তার স্ত্রী রুমা শান্তিনগর কোয়ান্টাম ব্লাড ব্যাংকে চাকরি করেন। থাকেন কদমতলী দক্ষিণ দনিয়ায় শাহি মসজিদ রোডের ৮১১ নম্বর বাসায়।

ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) বাচ্চু মিয়া জানান, বাসচাপায় ওই নারীর ডান পা গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে।

ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ কাজী জাকারিয়া ইসলাম বলেন, দেশের জনগণ সতেচন এবং তাদের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে এসব দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। শিক্ষিত চালকের চেয়ে অশিক্ষিত চালকের কাছেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, প্রতিমাসে শুধু ঢাকা সিটিতে ৫ হাজার গাড়ি নামছে, কিন্তু ৫ হাজার ড্রাইভার তৈরি হচ্ছে না। রাজধানীতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো কোনো ভালো জায়গা নেই। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো; কিন্তু সেখানে এক দুর্ঘটনার ফলে সেখানেও প্রশিক্ষণ দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রশিক্ষণের জন্য একমাত্র নিজস্ব জায়গা আছে বিআরটিসির। কিন্তু তারা যেভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সেটাও নামকাওয়াস্তে।

তিনি বলেন, বড় গাড়িগুলোতে বাসের হেলপাররা এক সময় ড্রাইভার হন। শুনেছি, সকাল বেলা সকল রাস্তা ফাঁকা থাকে। এ সময় বাসের হেলপারের হাতে গাড়ি ছেড়ে দেন চালকরা। এ সময়ই বেশি দুর্ঘটনা ঘটে।

আইন প্রয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশের আইন খুবই দুর্বল। যাত্রীদের সচেতনতার বিষয়ে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, যাত্রীরাও সচেতন না। সরকার যদি এমন আইন করত, ওভারব্রিজ ব্যবহার না করলে জেল-জরিমানা করা হবে, তাহলে মানুষ অন্তত কিছুটা হলেও ওভারব্রিজ ব্যবহার করতো।

পরিহবন মালিকদের বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবহনের মালিকদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কারণ একজন মালিক রাস্তায় লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি রাস্তায় নামিয়ে দিল সেটা দুর্ঘটনার শিকার হলো—এর জন্য তো চালক দায়ী নন, দায়ী গাড়ির মালিক।

ইলিয়াস কাঞ্চন আরো বলেন, রোড নিয়ন্ত্রণের জন্য যে সকল অথরিটি আছে, সে সকল ব্যক্তির শাস্তি হতে হবে। যে কর্মকর্তা চালকের পরীক্ষা না নিয়ে টাকার বিনিময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি বলেন, প্রতিবছর কমপক্ষে ২০ ভাগ ছেলে এসএসসি পাস করার পর অর্থনৈতিক কারণে পড়ালেখা করতে পারে না। ফলে তারা হয়ে উঠে অপরাধী।

সোনালীনিউজ/এমটিআই