রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬

দালালদের টাকা না দিলে নড়ে না লাশের গাড়ি

পাবনা প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৩ জুন ২০১৯, বৃহস্পতিবার ০৪:৫৯ পিএম

দালালদের টাকা না দিলে নড়ে না লাশের গাড়ি

পাবনা: দুদকের অভিযান ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর নাটকীয় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আগে দু’একজন চিকিৎসক সঠিক সময়ে হাসপাতালে আসলেও অধিকাংশই আসতেন দেরিতে। এখন সকাল ৮টা থেকে নির্ধারিত সময়েই চিকিৎসক ও কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিত পাওয়া যায়। তবে, দালাল চক্রের দাপট ও চিকিৎসকদের আন্তরিকতার অভাবে রোগীরা কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ।

ভুক্তভোগীরা জানান, রোগী অথবা লাশ পরিবহনকে কেন্দ্র করে পাবনা সদর হাসপাতালে নির্দিষ্ট সাত থেকে আটজনের সংগঠিত দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। স্বজনরা লাশ নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার আগেই দালাল চক্রটি বিশেষ এক ধরনের রশিদ নিয়ে জোর করে টাকা আদায় করে। টাকা না দিলে অ্যাম্বুলেন্স যেতে দেয় না দালাল চক্রের সদস্যরা।

জানা গেছে, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি পাবনা জেনারেল হাসপাতালে অভিযান চালায় দুদক। সেদিন, সকাল ৯ টায় হাসপাতালে ৪৯ জন চিকিৎসকের মধ্যে মাত্র ১৪ জনকে উপস্থিত পান দুদক কর্মকর্তারা। এরপর অনুপস্থিত চিকিৎসক, কর্মচারীদের ওএসডি করার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। আর এতেই বদলে গেছে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের চিত্র।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালে প্রশাসনিক কমকর্তা-কর্মচারী এবং চিকিৎসকদের উপস্থিতির হার প্রায় শতভাগ। সকালের শিফটে হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কর্মচারী, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী মিলিয়ে ৩০১ জন অফিস স্টাফ এর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ১৬৪ জন। বাকী ১৩৭ জন ডাক্তার, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের দুপুর এবং রাতে তাদের ডিউটি রয়েছে বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা কর্মচারী উপস্থিতির হার সন্তোষজনক হলেও সেবার মান নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে রোগীদের। হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন ভূক্তভোগীরা। পাশাপাশি হাসপাতালে দালাল চক্রের তৎপরতাও দেখা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, কেবল সাধারণ এক্স-রে ছাড়া রোগ নির্ণয়ের সকল পরীক্ষার জন্যই বেসরকারী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। হাসপাতালের কর্মকর্তা কর্মচারীরা এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন পান। এজন্য নির্দিষ্ট দালালের মাধ্যমে রোগীদের বাহির থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়।

হাসপাতালের নিজস্ব সিটিস্ক্যান, ডিজিটাল এক্স-রে, ইসিজিসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি লোকবল সংকটের অযুহাতে ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয় বলে একটি সূত্র জানায়।

পাবনা সুজানগর থেকে আসা রোগী কামরুল ইসলাম বলেন, আমার শিশু কন্যাকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলাম। মাত্র একদিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখাতে পেরেছি। কেবল পাঁচ-দশ টাকা দামের সিরিঞ্জ ছাড়া সকল ওষুধই বাহির থেকে কিনতে হয়েছিল। স্যালাইন পরিবর্তন বা কোন অসুবিধায় নার্সের সহযোগিতা চাইলে তারা বিরক্ত হয়ে খারাপ ব্যবহার করেন।

শহরের কফিলউদ্দিন পাড়ার বাসিন্দা মহসিন আলী অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। এখন ডাক্তারের আনা গোনা দেখা যাচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় সেবা না পেলে উপস্থিতি কোন কাজে আসবে না। চিকিৎসকদের সদিচ্ছা ছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন সম্ভব নয়। হাসপাতালের কক্ষ এবং টয়লেট অপরিচ্ছন্ন ও ব্যবহার অনুপযোগী বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে, পাবনা সদর হাসপাতালে রোগী ও লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স থেকে জোর করে চাঁদা আদায় করাসহ দূর দুরান্ত থেকে আসা রোগীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা জানান, রোগী অথবা লাশ পরিবহনকে কেন্দ্র করে পাবনা সদর হাসপাতালে নির্দিষ্ট সাত থেকে আটজনের সংগঠিত দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। স্বজনরা লাশ নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার আগেই দালাল চক্রটি বিশেষ এক ধরনের রশিদ নিয়ে জোর করে তিনশ থেকে চারশ টাকা আদায় করে। টাকা না দিলে অ্যাম্বুলেন্স চলতে দেয় না।

জরুরি প্রয়োজনে ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে গেলে সেখানেও একই অবস্থার শিকার হতে হয় বলে ভূক্তভোগীরা জানান। প্রথমে বলা হয় নির্দিষ্ট ওই গ্রুপের রক্ত নেই, ম্যানেজ করতে হবে। পরবর্তীতে ওই চক্রটির মাধ্যমে ব্লাড ব্যাংকে জমা থাকা রক্তই দশ থেকে পনের হাজার টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করতে বাধ্য হয় রোগীর স্বজনরা।

এদিকে পাবনা সদর হাসপাতালকে ঘিরে রয়েছে ৬০ থেকে ৭০টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স। এর মধ্যে ৫০টিরও বেশী গাড়ির ফিটনেস এবং বৈধ কোন কাগজপত্র নেই। শুধু গাড়ির বডিতে অ্যাম্বুলেন্স এবং ছাদে একটি সাইরেন লাগিয়ে এসব ফিটনেসবিহীন গাড়িকে অ্যাম্বুলেন্সে রুপান্তর করা হয়েছে।

রোগীদের ওই দালাল চক্রটি সদর হাসপাতালে ভর্তি হতে না দিয়ে ফুসলিয়ে আশপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ক্লিনিকে নিয়ে ভর্তি করায়। ক্লিনিকে নিয়ে চিকিৎসার নামে চলে অপচিকিৎসা। বিনা প্রয়োজনে করা হয় অপারেশন। ক্লিনিক মালিকদের পক্ষ থেকে এ দালাল চক্রকে রোগী প্রতি দেয়া হয় দুই থেকে তিন হাজার টাকা।

উল্লেখ্য, পাবনা জেনারেল হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকদের সরকারি কাজে বাধা দান, রোগীদের হয়রানি ও জিম্মি করে টাকা আদায়, লাশ নেয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন অপকর্ম করার অভিযোগে ২০১৫ সালের ৯ জুলাই যৌথবাহিনী দালালচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল। ওই অভিযানে ৮ জন দালালকে আটক করার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে চারজনকে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরো এক মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। এছাড়া অপর চারজনকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরো এক মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। এরপর আর কোন অভিযান পরিচালিত না হওয়ায় দালালচক্রটি মাথাচারা দিয়ে উঠেছে।

সেবার মান নিয়ে রোগীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. রঞ্জন কুমার দত্ত বলেন, পাবনা জেনারেল হাসপাতাল ২৫০ শয্যার হলেও প্রতিদিন গড়ে হাজারের উপরে রোগী ভর্তি থাকেন। আমাদের যে জনবল আছে তাতে ইচ্ছে থাকা সত্বেও প্রত্যাশিত সেবা প্রদান সম্ভব হয় না। এরপরেও আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে সংশোধন হতে প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছি। আশাকরছি দ্রুততম সময়ে সেবার মানও বৃদ্ধি পাবে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য রোগী ও তাদের স্বজনদের দায়িত্বহীন আচরণকেও দায়ি করেন। এক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের দায়িত্বশীল আচরণের অনুরোধ জানান তিনি।

সোনালীনিউজ/এমএইচএম

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue