বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬

দুই বছরেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি যুবদলের কমিটি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রবিবার ০৮:০৯ পিএম

দুই বছরেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি যুবদলের কমিটি

ঢাকা : বিএনপির অঙ্গ সংগঠন যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের পর ২৫ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। গঠনতান্ত্রিক নিয়মে তিন বছরের জন্য এই কমিটি করা হয়।

সংগঠনটির পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, গত কমিটির নেতাদের মতোই ‘কূট-কৌশল’ গ্রহণ করছেন বর্তমান কমিটির নেতারা। বিভিন্ন অজুহাতে গত কমিটি তিন বছরের স্থলে সাত বছর পার করেছিল। বর্তমান কমিটির নেতারাও আগের মতো নানা অজুহাতে এটিকে পূর্ণাঙ্গ না করে মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার চেষ্টায় আছেন। আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক বর্তমান কমিটির সভাপতি। ফলে সব ‘কূট-কৌশল’ তার জানা রয়েছে বলে মনে করেন পদপ্রত্যাশীরা। তবে, কমিটির দায়িত্বপাপ্ত নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ‘এতোদিনেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে না পেরে আমাদেরও খারাপ লাগছে। দেশনেত্রী দীর্ঘদিন সপ্তাহে তিন দিন করে আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। এরপর তার মুক্তি আন্দোলন হয়েছে। তারপর সংসদ নির্বাচন গেছে। এসব কারণে কমিটির বিষয়ে কিছু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সাধারণ সম্পাদক কারাগারে রয়েছেন। আশা করি তিনি কারাগার থেকে ছাড়া পেলে কমিটি হয়ে যাবে। তার সব মামলায় মোটামুটি জামিন হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কমিটির মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার জন্য পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হচ্ছে না, এটি ঠিক নয়। কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হলেও দলের হাইকমান্ড চাইলে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেই কমিটি ভেঙে দিতে পারবেন। নেতাকর্মীরা হতাশা থেকেই হয়তো এসব কথা বলছেন।’
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরবের সঙ্গে একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, ২০১০ সালের ১ মার্চ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও সাইফুল আলম নীরবকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের কমিটি হয়। সাত বছর মেয়াদি সেই কমিটি মেয়াদ পূর্ণ করে। পরে ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি গত কমিটির সাইফুল আলম নীরবকে সভাপতি এবং বিএনপির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যের নতুন কমিটি করা হয়। এই কমিটির ২৫ মাস পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি। বর্তমানে সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু কারাগারে রয়েছেন।

যুবদলের পদপ্রত্যাশী নেতারা বলছেন, ‘যত দেরিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করবে ততই লাভ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের। তাতে তারা বেশিদিন ধরে শীর্ষ পদে থাকতে পারবেন। কারণ পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেরিতে হলে তারা বলতে পারবেন কিছুদিন আগে কমিটি হয়েছে, এখন কীভাবে কমিটি ভেঙে দেবো। আরও কিছুদিন যাক, তারপর নতুন কমিটি দেবো। এছাড়া কমিটি হলে কেউ আর ভাইদের বাসা-বাড়িতে ধরনা দেবে না, এতে করে তাদের কদরও কমে যাবে।’

যুবদলের নেতাকর্মীরা দাবি করছেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ার কারণে কেউ ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে যায় না। কারণ আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হলে তার রাজনৈতিক পরিচয় কী হবে। কমিটিতে কোনও পদ থাকলে তবেই সুনির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করে মুক্তির আন্দোলন হয় এবং তখন সংগঠনের ফান্ড থেকে অর্থ ব্যয় করে জামিনেরও ব্যবস্থা করা হয়। কমিটি না থাকার কারণে আন্দোলনে নামার ভরসার জায়গা তৈরি হয় না। ফলে গ্রেফতার এড়ানোর কৌশল নিতে গিয়ে কেউ আন্দোলনের মাঠে থাকছে না।

এ বিষয়ে নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ‘এটা ঠিক, কমিটি না হওয়ার কারণে নেতাকর্মীরা কোনও পরিচয় দিতে পারছে না। তারপর আমরা চেষ্টা করি সব কর্মসূচি পালন করতে এবং সব সময় পালনও করি।’

আলাল-নীরব কমিটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা বলেন, ‘অনেক সময় বিভিন্ন দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার চাপ আসলে তখন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক “অমুক মাসে কমিটি হবে” এমন আশ্বাস দেন। পরে দেখা যায় কখনও সভাপতি, আবার কখনও সাধারণ সম্পাদক গ্রেফতার হন, কখনও বা অন্য কোনও সমস্যা দেখিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা থেকে পাশ কাটিয়ে যান। এমন করেই তিন বছরের কমিটির মেয়াদ ২৫ মাস পার করে দিয়েছে ৫ সদস্যের কমিটি।’

বর্তমানে সংগঠনটির সাংগঠনিক অবস্থা এতোই নাজুক যে কার্যালয় নিয়মিত খোলা হয় না। ফলে যুবদলসহ বিএনপির নেতাকর্মীদের তিরস্কার করে অনেকেই বলে, এটি ‘যুবদল’ নাকি ‘ডুবদল’। এই প্রতিবেদকও যুবদলের কার্যালয়ে গিয়ে বন্ধ পান।

কেন যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হচ্ছে না তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মোর্ত্তাজুল করিম বাদরু। তিনি বলেন, ‘আপনি সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তবে সংগঠনের কার্যালয় বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বাদরু বলেন, ‘কার্যালয় তো বন্ধ থাকার কথা নয়। তবে আমরা আগে সকালের দিকে বসতাম। এখন বিকালে বসি। আর সব নেতাকর্মীর নামেই মামলা রয়েছে। চাইলেও সবাই নিয়মিত অফিসে যেতে পারেন না।’

যুবদলের অপর একটি সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রদলের সভাপতি থাকা অবস্থায় সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর নিজস্ব একটি বলয় ছিল। তিনি চান সেইসব নেতাকর্মীদের যুবদলের পদ দিতে। অন্যদিকে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় সাইফুল আলম নীরবের একটি নিজস্ব বলয় ছিল। তিনি চাইছেন তার আস্থাভাজনদের কমিটিতে পদ দিতে। এই দুজনের দ্বন্দ্বের কারণে কমিটির মেয়াদ শেষের পথে থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবদলের এক নেতা বলেন, ‘যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সংগঠনের কাজের চাইতে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। দুজনেরই ঢাকা শহরে একাধিক ব্যবসা রয়েছে। তারা ঢাকা শহরে গাড়ি-বাড়ির মালিক। যে কারণে বর্তমানে যুবদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম শোচনীয়। কার্যালয় খোলার মতো লোক থাকে না।’

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলটির অঙ্গ সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে নয়টি সংগঠন। এগুলো হলো– মুক্তিযোদ্ধা দল, যুবদল, মহিলা দল, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা, কৃষক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, তাঁতী দল, ওলামা দল ও মৎস্যজীবী দল। এই সংগঠনগুলো নিজ নিজ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলবে। নিজেদের কল্যাণ সাধনের পাশাপাশি বিএনপির কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করাই হবে অঙ্গ সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য।

সোনালীনিউজ/এমটিআই